E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

কিশোরীগঞ্জের রাকাবে কৃষকের নামে ঋণ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ!

২০১৮ মে ২৬ ১৫:০৪:৫৬
কিশোরীগঞ্জের রাকাবে কৃষকের নামে ঋণ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ!

নীলফামারী প্রতিনিধি : রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার শাখা থেকে অসংখ্য কৃষকের নামে ঋণের হালনাগাদের (রিকভারি) নামে নতুন ঋণ গ্রহন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকটির ওই শাখার কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে।

অভিযোগ মতে, ঋণ না পেয়েও ব্যাংকের কথিত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে ঋণ গ্রহীতা সাধারন কৃষক। মজার বিষয় যাদের নামে ব্যাংক ঋণ দেখানো হয়েছে তারা কেউ জানেন না তাদের নামে ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ কত। এমনকি তাদের কাছে নেই কোনো ঋণের কাগজপত্রাদি। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। এদিকে এমন ঘটনা ধামাচাপা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাগন।

জানা গেছে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এর কিশোরীগঞ্জ উপজেলা শাখা হতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৬৯ জন ঋণ গ্রহীতার নামে ৫কোটি ১৭লাখ ৭২হাজার টাকা ঋণ বিতরণ দেখানো হয়। এর মধ্যে ১৫ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেয়া হয় ৭৪লাখ ৩০হাজার। বাকি ৪কোটি ৪৩লাখ ৪২হাজার টাকা ৭৫৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ দেখানো হয়েছে।

অপরদিকে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৯১ জন ঋণ গ্রহীতাকে ৫কোটি ৪০লাখ ৬১হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৭ জন ব্যবসায়ীকে সিসি লোন দেয়া হয় ৭২লাখ ৪০হাজার, বাকি ৪কোটি ৬৮লাখ ২১হাজার টাকা ৬৭৪ জন কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২৮১ জনের নামে ২কোটি ৯৩লাখ ১৩হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ২০ জন ব্যবসায়ীর নামে সিসি লোন ৮৭লাখ ৫০হাজার এবং ২৬১ জন কৃষকের মধ্যে ২কোটি ৫লাখ ৬৩হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।

স্থানীয়রা জানায়, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কিশোরীগঞ্জ শাখায় ৪ জন ফিল্ড অফিসার থাকার কথা থাকলেও পদগুলো শূন্য। ফলে ব্যাংক শাখাটির সিনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক একাই সব দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সেখানে যোগদানের পর ওই কর্মকর্তা প্রতিটি ইউনিয়নে দালাল নিযুক্ত করে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক সহ এসব ঋণ বিতরণ করেছিলেন। বর্তমানে তৎকালীন ব্যাংক ম্যানেজার ফিরোজ মোহাম্মদ ফারুক রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় কর্মরত রয়েছে।

কিশোরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা গ্রামের ইউছুফ আলীর ছেলে আজাহার আলী (৫২) বলেন, ২০১৬ সালে মার্চ মাসে ব্যাংকে ঋণ করতে গেলে ব্যাংকের সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক তাকে জানান, তার কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় তাকে ঋণ দেয়া যাবে না। পরবর্তিতে ব্যাংকের দালাল ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আমার নামে ৪০হাজার টাকা ঋণ করে দেয়। কিন্তু আমাকে ৪০হাজার টাকার মধ্যে প্রথম দফায় ১২হাজার ও দ্বিতীয় দফায় ৮হাজার সহ মোট ২০হাজার টাকা প্রদান করেন। আমি অনেক কান্নাকাটি করেও বাকি ২০ টাকা এখনো পাইনি।

চাঁদখানা ইউনিয়নের দণি চাঁদখানা দহবন্দ গ্রামের দেবেন্দ্র নাথ রায়ের ছেলে সেলাাই চন্দ্র রায় (৪৫) বলেন, ২০০৯ সালে ব্যাংকে আমি ১০হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। ১০হাজার টাকার মধ্যে আমি পেয়েছিলাম ৫হাজার টাকা। পরে ব্যাংকের দালাল মোস্তফা আমাকে জানান, ব্যাংকের লোন পরিশোধ না করলে মামলা হবে। তাই আবারো ২০১৭ সালে আমার নামে পূর্বের ঋণ হালনাগাদ করে ৩০হাজার টাকা ঋণ করে আমাকে শুধু তিন হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়।

ব্যাংকের দালাল ফারুক হোসেন, দুলাল হোসেন, মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, ব্যাংকের অফিসাররা সরাসরি টাকা না নিয়ে ঋণ গ্রহীতাদের আবেদনের বিভিন্ন ভুল ধরেন। পরে ঋণ নিতে আসা কৃষক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা কাজ করে দিলে তারা কিছু টাকা দেয়। এটা দোষের কি? আর সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক স্যার যে রেজওয়ান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতি হাজারে ২০ টাকা সুদ নিয়ে কৃষকদের লোন রিকভারি করে দেন।

ব্যবসায়ী রেজওয়ানের সঙ্গে কথা বললে তিনি টাকা দিয়ে মুনাফা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকে আমার সিসি লোন আছে সেই সুবাধে সুপারভাইজার আব্দুর রাজ্জাক টাকা নেয়। পরে মুনাফাসহ দিয়ে দেন।

চাঁদখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নের অনেক অসহায় দরিদ্র মানুষের নামে কৃষি ব্যাংক থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার জন্য।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কিশোরীগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক আফজালুল হক চৌধুরী সাংবাদিদের বলেন, আমি এ শাখায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে যোগদান করেছি। পূর্বে কি অনিয়ম হয়েছে বা হয়নি সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যে সমস্ত কৃষকের মধ্যে হালনাগাদ (রিকভারি) ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মধ্য থেকে কিছু কৃষকের নামে ব্যাংকের অভ্যন্তরীন নিরীক্ষা দল কর্তৃক আপত্তি এসেছে।

(এমআইএস/এসপি/মে ২৬, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test