E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

শিশু সজিব মরন নেশা গাঁজায় আসক্ত!

২০১৮ মে ৩১ ১৭:১০:৪৭
শিশু সজিব মরন নেশা গাঁজায় আসক্ত!

মোঃ আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার : সরকারের চলমান মাদক বিরোধী অভিযান চলছে, এসব অভিযানের খবর সংগ্রহে বেড়ে গেছে সংবাদকর্মীদের দৌঁড়ঝাপ । সারা দেশে প্রতিদিন মরণ নেশা ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছে অসংখ্য মাদক ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে মাদক বিক্রি ও মাদকাসক্তের সংখ্যা। এনিয়ে পরিবার, সমাজ বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রের চিন্তার শেষ নেই। এসবের মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের দেয়া নির্দেশমতে কাজ করতে গিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এপর্যন্ত মারা গেছে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী। 

একটি পরিবারের একটি নক্ষত্র মাদকাসক্ত হলে তা পরিবারের জন্য কতটা দায় এবং কষ্টের তা ভুক্তভুগী ছাড়া কেউ বুঝবেনা এটাই চরম বাস্তবতা। মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে মাদক থেকে ফিরে নিয়ে সাভাবিক জীবনে নিয়ে আসতে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরকারি-বেসরকারী পর্যায়ে অনেক মাদকাসক্ত পূর্ণবাসন কেন্দ্রই গড়ে উঠেছে।

এসব মাদকাসক্ত পূর্ণবাসন কেন্দ্রে নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ের মাধমে অনেকে আবার সাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে, আবার অনেকেই নতুনভাবে মাদকে পুর্বের ন্যায় আসক্ত হয়ে সমাজকে করছেন কলুষিত। মৌলভীবাজার জেলা সদরে এমনই একটি প্রতিষ্ঠান আদর মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্র । শহরের উপকন্ঠে সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে অবস্থিত আদর মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্র। যেখানে অতিরিক্ত মাদক সেবনের দায়ে আক্রান্তদের কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সুস্থ’ ও সাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে কাজ করেন। এই পূর্ণবাসন কেন্দ্রটিতে মৌলভীবাজার জেলা সহ অন্যান্য জেলার সর্বমোট ২২ জন মাদকাসক্ত রয়েছেন। এখানের দ্বায়িত্বরত কর্তা ব্যাক্তিরা এদেরকে নানান প্রশিক্ষন মূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে সূস্থ ও সাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে কাজ করেন ।

গত বুধবার ৩০ মে বিকালের দিকে এই পূর্ণবাসন কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে কথা হয় মাদকাসক্তে আক্রান্ত ইব্রাহীম হুসেন সজিব নামের ১৪ বছর বয়সী এক শিশুর সাথে। সজিবের পিতার নাম মোঃ সিরাজ মিয়া । গ্রামের বাড়ী হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ৭নং নুরপুর ইউনিয়নের সুরাবৈই গ্রামে । সজিব ২০১৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আফরুজ আলী জুনিয়র মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হয় ষষ্ট শ্রেণীতে। পড়ালেখায় অদম্য মেধাবী এই সজিবের ক্লাসে রোল নাম্বার ছিল ২ এ । ২০১৭ সালে সজিব সপ্তম শ্রেনীতে উঠে ধীরে ধীরে পড়াশুনায় অমনযোগ ভাব তৈরি হয়ে যায় এলাকার বখাটে ও স্কুল বাদ দেয়া অন্যান্য শিশুদের পাল্লায় পরে। সজিবের সাথে আলাপকালে এ প্রতিবেদককে তার জীবনের এই শিশু বয়সে মাদকে আসক্ত হওয়া নিয়ে গল্প বলতে থাকে অকপটে।

সজিব মাদকের সাথে যুক্ত হওয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই প্রতিবেদককে বলে , আমি যখন স্কুলে পড়তাম, তখন আমার স্কুল বন্ধুরা অনেক ভাল ছিল, মাদক সেবনে আক্রান্ত হয়ে এখানে ভর্তি হওয়ায় আগের থেকে এখন আমি অনেক ভাল আছি। আমাকে নিয়ে আমার বাবা-মা’র চিন্তার কোন শেষ ছিলনা, তারা আমার কারনে অনেক কষ্টে আছেন। তবে এখানে থাকায় এখন তারা অনেকটা চিন্তা মুক্ত। আমি যখন গাঁজায় আসক্ত ছিলাম তখন আমার বাবা-মাকে নিয়ে কোন কষ্ট অথবা কোন চিন্তা ছিলনা, কারণ আমি তখন মাদকে আসক্ত। এখানে থাকা অবস্থায় তারা যখন আমাকে দেখতে আসে তখন আমার মা আমাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ দৃশ্য দেখে আমারো চোখে জল আসে। চার বোন আর একমাত্র আমিই আদরের ভাই, এই পাঁচজনকে নিয়েই আমাদের সংসার, বাবা ব্যবসায়ী । আমি যখন পড়া বাদ দিয়ে দেই, তখন আমার মা কিস্তিতে একটি টম টম আমার জন্য ক্রয় করে। আমি কিছুদিন এই টমটম চালিয়েছি। বাবা সারাদিনে ব্যবসা করে যেটাকা প্রতিদিন কিস্তির জন্য মার কাছে রেখ দিত, সেগুলো আমি চুরি করে নিয়ে যেতাম।

সজিব আরো বলে, আমার যখন মাদকের প্রয়োজন হত তখন আমার মায়ের ড্রয়ারে রাখা কিস্তির টাকা চুরি করে গাজা ক্রয় করে সেবন করতাম। আর এসব যখন সময়মত পেতামনা তখন কখনো কখনো মা অথবা বাবাকে মারধর করে ঢিল মেরে দৌর দিতাম, তখন আমাকে ধরে বাবা বেধরক পিটুনি দিত। আমার এরকম কর্মকান্ডে পবিবার অতিষ্ঠ হয়ে এভাবেই আমাকে নিয়ে প্রতিদিন টেনশন বেড়ে যেতে থাকলো । এবয়সে নিয়মিত গাঁজা সেবনের ফলে আমার বেশি বেশি ঘুম ধরতো আর বেশি বেশি ক্ষুধা লাগতো। আমি এখন আগের জীবনে ফিরতে চাইনা, গ্রামেও যেতে চাইনা, কারণ আমার আজকের পরিনতির জন্য দায়ী আমার গ্রামের পরিবেশ ও আশ পাশের সমবয়সী অন্যান্য শিশুরা, যাদের সাথে উঠা বসা করতে যেয়ে মাদকের পথে পা বাড়িয়েছি। আমি যখন ষষ্ট শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলাম তখন ক্লাসে পড়ালেখাতে অনেক মনযোগী ছিলাম, সপ্তম শ্রেণীতে উঠে পড়ে যাই সমবয়সী বন্ধুদের পাল্লায়, এবয়সে তাদের সিগারেট টানা দেখে আমি নিজেও সিগারেটে টান দিয়ে প্রথম নেশাগ্রস্থ হওয়া শুরু হয়।

সজিব যখন এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপ করছিল তখন তাকে অনেক সূস্থ ও সাভাবিক মনে হচ্ছিল । আলাপ করতে যেয়ে মাঝে মধ্যে লজ্ঝায় মাথা নিচের দিকে নামিয়ে ফেলতো। কথা বলতে গিয়ে কখনো কখনো সজিবের চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছিল।

আলাপের এক পর্যায়ে সজিব আরো জানান , সে এখানে আসার পূর্বে ব্রাম্মনবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সিংহগ্রাম পার হয়ে স্কুলের পাশে একটি নদী আছে, সেই নদীর পাড়ে সে তার বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত খেলাদুলা করত, খেলাদুলার পাশাপাশি সিগারেটসহ গাজা আসক্ত হয়ে যেতো। এগুলো প্রায় নিয়মিত চলতো। যখন গাজা সেবন করত তখন কেমন লাগতো এমন প্রশ্নের জবাবে সজিব বলে, মনে অনেক আনন্দ ও সুখ পাইতাম, মানে অন্য জগতে নিজেকে নিয়ে হাড়িয়ে যেতাম। এখন এখানে আসার পর নিয়মিত কাউন্সেলিং হওয়ার কারনে সাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় বুঝতে পারছি আমি আমার পরিবার ও নিজের জীবনের কত ক্ষতি করেছি। এখন আমার একটাই ভাবনা সাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয় , তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা আমার গ্রামের পরিবেশ। আমার যখন মাদকে আসক্তি আসতো তখন টাকা না পেলে বাড়ির পাশের বাজারের দোকান চুরির চেষ্টা চালাতাম।

আদর মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান মান্না ছোট্র মাদকাসক্ত শিশু ইব্রাহীম হুসেন সজিবের কাউন্সেলিংয়ের দ্বায়িত্বে রয়েছেন । এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, সজিব মাদকাসক্ত থাকা অবস্থায় আমাদের এখানে সজিবের গ্রামের আরেক মাদকাসক্তের দেয়া তত্ত্বানুযায়ী সজিবে বাবা/মা ও তার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সহ গত ৩ ফেব্র“য়ারী আমাদের এই পূর্ণবাসন কেন্দ্রে ভর্তি করান, সেই ধারাবাহিকতায় এখন উন্নত কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সজিব পুরোপুরি সুস্থ ও সাভাবিক। তিনি বলেন, সজিব তার এলাকার পরিবেশ এবং তার সমবয়সী বখাটেদের কারনে আবার যাতে পূর্বের অবস্থায় ফিরে না যায় সে কারনে এখানে ভর্তি আছে।

এ বিষয়ে কথা হয় শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মখলিছ মিয়ার সাথে । মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামেই সহজে এবং অবাধে বিক্রি হচ্ছে মাদক । গ্রামের বখাটে ও মাদকাসক্ত ছেলেদের সাথে চলতে গিয়ে মূলত সজিব দীর্ঘদিন মরন ব্যাধী গাজায় আসক্ত ছিল, তার বাবা মা তার উপর অতিষ্ঠ হয়ে আমার কাছে নিয়ে আসলে আমি তাদেরকে মৌলভীবাজার জেলা শহরে অবস্থিত আদর মাদকাসক্ত চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের নিয়ে যাই যাতে সে সুস্থ’ ও সাভাবিক জীবন ফিরে পায় সে লক্ষেই তাকে ভর্তি করে আসি।

তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অবাদে বিক্রি হচ্ছে মাদক, বিশেষ করে অলিপুর গ্রামে গড়ে উঠা শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রাণ আরএফএল গ্রুপের কারখানার সামনে ও নতুন ব্রীজ এলাকাটি মাদক বিক্রেতাদের জন্য নিরাপদ স্পট হিসেবে অনেক পরিচিত। কারন এসব স্পটে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করেন আর সেই সুযোগটা নিচ্ছে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীরা । তবে প্রশাসন ব্যবস্থা নিলে এর সমুলে উৎপাটন করা সম্ভব ।

মায়াবী ফুটফুটে চেহরার ছোট্র এই শিশু সজিবের মাদকে আসক্ত হওয়ার পেছনের কারন খুঁজতে মুঠোফোনে তার মা নুরজাহান বেগমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাতে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

(একে/এসপি/মে ৩১, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

১৮ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test