E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

 

নড়াইলে ৩১ হাজার দেশি গরু ও ছাগল মোটাতাজা করতে ব্যস্ত খামারিরা

২০১৮ আগস্ট ১৫ ১৫:১৪:১২
নড়াইলে ৩১ হাজার দেশি গরু ও ছাগল মোটাতাজা করতে ব্যস্ত খামারিরা

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : নড়াইলের দেশি গরুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশিয় পদ্ধতিতে জেলার চাষিরা গরু মোটাতাজা করে, তাই এই জেলার গরুর চাহিদা বেশি। এ সকল গরুর মাংশের চাহিদাও বেশী। প্রতি বছর কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জেলার খামারীরা ও কৃষকেরা গরু মোটাতাজা করে। গত বছর কোরবানি ঈদে  জেলার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার গরু বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করেছে জেলার চাষিরা। গত বছর ভারত থেকে নড়াইলে কোরবানীর হাটে পশু কম আমদানী করায় দেশি গরুর চাহিদা ছিল বেশি। খামারিরা লাভও করেছিল ভাল। তাই এই বছরও কোরবানিকে সামনে রেখে দেশি গরু ও ছাগল মোটাতাজা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার খামারি ও কৃষকেরা। ভারতীয় গরু বাজারে না আসলে এবছরও লাভবান হবে এমনটাই আশা করছেন তারা।

জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সুত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর নড়াইলের কৃষকেরা ও খামারীরা কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে দেশিয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করে। গত বছর ৩০ হাজার গরু ও ছাগল মোটাতাজা করছে জেলার খামারি ও কৃষকেরা। যার মধ্যে প্রায় ২২ হাজার গরু ৮হাজার ৩শ ছাগল। চলতি বছরে ৩১ হাজার পশু মোটাতাজা করছেন খামারিরা। যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪শ দেশি গরু আর ৭ হাজার ৬শ ছাগল। এবছরও তিনটি উপজেলার মধ্যে নড়াইল সদরে বেশি গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবছর জেলায় অন্তত ১ হাজার পশু বেশি মোটাতাজা করছে। গত বছর ভারত গরু আমদানি কম করায় স্থানীয় গরুর চাহিদা ছিল বেশি। তাই জেলার গরু খামারীরা ভাল লাভ করেছে। চলতি বছর জেলার অনেক খামারি গত বারের তুলনায় আরও বেশি গরু মোটাতাজা করছে। অনেক নতুন খামার গড়ে উঠছে। খামারি ছাড়াও জেলার সাধারন কৃষকেরা বাড়তি ইনকামের জন্য বাড়িতে একটি দুটি করে গরু মোটাতাজা করছে। বর্তমানে জেলায় মোট রেজিস্ট্রিকৃত গরুর খামার রয়েছে ৩৯৫টি ( কোন কৃষকের তিনটি গরুর বেশি থাকলে একটি খামার ধরা হয় )।

জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সুত্রে জানাগেছে, দেশিয় পদ্ধতিতে চাষিরা গরু মোটাতাজা করেন তাই এই জেলার গরুর চাহিদা বেশি। ঈদের সময় আকার ভেদে গত বছর প্রতিটা গরু ৩৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রয় করেন এখানকার চাষিরা।

বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে নড়াইল সদরের মির্জাপুর, চাকই, সিংগাশোলপুর, গোবরা, কমখালি, শাহবাদ,সিমানন্দপুর, জুড়–লিয়া, লোহাগড়া উপজেলার শিয়েরবর, চাচই, কোলা, কুমড়ি, দিঘলিয়া, মল্লিকপুর, মাকড়াইল, লাহুড়িয়া, কালিয়া উপজেলার বড়দিয়া, মহাজন, টোনা, খাশিয়াল, বাবরা, গ্রামের কৃষক ও খামারিরা অন্যন্য এলাকা থেকে বেশি গরু মোটাতাজা করছে।

জেলায় মোট যে গরু মোটাতাজা করা হয় তার ৫৫ ভাগ গরু মোটাতাজা করছে খামারিরা আর বাকি ৪৫ ভাগ গরু মোটাতাজা করছে জেলার সাধারন কৃষকেরা। প্রতিটা কৃষকের গোয়াল ঘরে তাদের হালের গরুর পাশাপাশি একটি দুটি করে মোটাতাজা করন গরু রয়েছে। আর এসকল গরু কোরবানিকে সামনে রেখে মোটাতাজা করছে তারা।

সদরের বিছালী গ্রামের কৃষক আকরাম, চুন্নু, রহমত জানান, সাধারন্ত কোরবানি ঈদের ৬-৭ মাস পূর্বে দেশি প্রজাতির প্রতিটি বাছুর ১৫-২০ হাজার টাকায় ক্রয় করে পালন করতে থাকে। সারা বছর খাবার হিসাবে কাজের ফাকে বিল থেকে কাচা ঘাস কেটে এনে খাওয়ানো হয় এবং ঈদের ২ মাস পূর্বে খড়, খৈল, কুড়া, ও ভুষি খাওয়ানো হয়। বছরে যে খাবার লাগে অধিকাংশ খাবারই বিলের কাচা ঘাষ। এই ঘাস ক্রয় করা লাগেনা তাই খরচ অনেক কম হয়। একটি বাছুর ১৫-২০ হাজার টাকায় ক্রয় করে ৬-৭ মাস পোষার পরে ঈদের সময় আকার ভেদে ৪০- ৯০ হাজার টাকায় বিক্রয় হয়। কৃষকেরা প্রতিটা গরু থেকে আকার ভেদে ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করে।

নড়াইল জেলার তিনটি উপজেলায় মোট ১১টি হাটে গরু বেচাকেনা হয়। স্থানীয় গরুর মালিকেরা এসকল হাটে নগদ টাকায় গরু বিক্রয় করেন। ১১টি হাটের মধ্যে জেলায় মোট ৪টি বড় হাট রয়েছে, মাইজপাড়া গরুর হাট, লোহাগড়া গরুরহাট, শিয়েরবর গরুরহাট, এবং পুরুলিয়া গরুরহাট। এখানে বিভিন্ন জেলার বেপারিরা এসে এখানকার গরু ক্রয় করে ট্রাকে নিয়ে ঢাকা,সিলেট, চিটাগাংসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে বিক্রয় করে। এছাড়া স্থানীয় বেপারিরা এলাকায় কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরু ক্রয় করে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রয় করে। বর্তমানে এই পেশার সাথে জড়িত রয়েছে জেলার প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ (খামারি, কৃষক ও বেপারিরা)।

লোহাগড়া উপজেলার গন্ডব গ্রামের খামারি জিল্লাল শেখ, আড়পাড়া প্রামের রিদয় শেখ জানান, বছর দশ আগে থেকে তারা গরু মোটাতাজা করে। গত বছর দেশের বাইরে থেকে বিদেশি (ভারতীয়) গরু নড়াইলে কম এসেছিল। তাই দেশি গরুর চাহিদা ছিল অনেক বেশি। তারা ভাল দামে বিক্রয় করতে পেরেছিল। লাভ খুব ভাল হয়েছিল। এবছরও খামারে গরুর সংখ্যা বাড়িয়েছে তারা। প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের খামারে পশু মোটাতাজা করা হচ্ছে।

নড়াইল সদরের মির্জাপুর এলাকার কৃষক আমানউদ্দিন শেখ জানান, প্রতি বছরই তিনি কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজা করে। ৪ মাস আগে ৮২ হাজার টাকা দিয়ে ৪ টি এড়ে বাছুর ক্রয় করে পালন করছি। গরু অনেক বড় হয়ে গেছে। আশা করছি কোরবানি সামনে রেখে ৪টি গরু ভাল দামে বিক্রয় করতে পারবো।

নড়াইল জেলা প্রানি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মারফি হাসান জানান, বছর দশেক পূর্বে নড়াইলের চাষিরা অল্প পরিসরে গরু মোটাতাজা করত। সে সময় সরকার বিদেশ থেকে ঈদের সময় গরু আমদানি করায় জেলার অনেক খামারি ও কৃষকেরা গরুর নায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ২-৩ বছর সরকার বিদেশ থেকে গরু আমদানি না করায় জেলার স্থানীয় কৃষকের গরুর চাহিদা ছিল অনেক বেশি। স্থানীয় খামারি ও কৃষকেরা লাভবান হয়েছে বেশ। তাই এবছরও অনেক কৃষক গরু মোটাতাজা করতে আগ্রহী হয়েছে। আমরা সরকারী ভাবে তাদেরকে ৪৫-৫০ ভাগ ওষুধ ফ্রী দিয়ে থাকি। কৃমির ওষুধ ও ভ্যাকসিন ফ্রি দেয়া হয়েছে। কৃষক ও খামারিদের কয়েকবার করে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। সব সময় বিভিন্ন পরামর্শসহ খোজ খবর রাখা হয়। আশা করছি এবছরও জেলার খামারি ও কৃষকেরা লাভবান হবে।

(আরএম/এসপি/আগস্ট ১৫, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test