E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

সুনামগঞ্জ-১ : কোন্দলে হিমশিম আ.লীগ, বিএনপিতে প্রার্থী জট

২০১৮ অক্টোবর ১৫ ১৫:০৬:১৩
সুনামগঞ্জ-১ : কোন্দলে হিমশিম আ.লীগ, বিএনপিতে প্রার্থী জট

সিলেট প্রতিনিধি : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের আশায় সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-মধ্যনগর) আসনে ঘরের আগুনে পুড়ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে দলের ৭ মনোনয়ন প্রত্যাশী একাট্টা হয়েছেন। এরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এমপির বিরুদ্ধে নালিশও করেছেন। হামলা-পাল্টাহামলা ও ভাংচুরসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগে তুলকালাম সব কান্ড ঘটে গেছে। 

নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের অন্তত ১২ এবং বিএনপির অন্তত ৬ জন প্রার্থী সক্রিয়। সম্ভাব্য প্রার্থীরা শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টারে ছেয়ে ফেলেছেন এলাকা। তারা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে এলাকায় কোনো একক দলের প্রভাব নেই। গত ৬টি জাতীয় নির্বাচনে ৪ বার নৌকা ও দু’বার ধানের শীষ জয়ী হয়।

নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৭ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হন সিপিবির নজির হোসেন। শেষ দিকে দল বদল করে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা ভোটে ধানের শীষ নিয়ে বিজয়ী হন। তবে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে জয়ী হন আ’লীগের অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল।

২০০১ সালের ভোটে ফের বিজয়ী হন বিএনপির নজির হোসেন। ২০০৮ সালের ভোটে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তার নিকটতম প্রতিদ্বদ্বী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী ৯৪ হাজার ৪৫৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। সবশেষে বিএনপিবিহীন ২০১৪ সালের নির্বাচনেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ রফিকুল হক সোহেলকে হারিয়ে বিজয়ী হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের প্রার্থী।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আ’লীগের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে। কয়েক মাস ধরেই দু’বারের এমপি রতনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মাঠে সক্রিয় দলের অন্তত ৭ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী। কোন্দলের জেরে ধর্মপাশা জেলা আ’লীগ সহ-সভাপতির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাংচুর, শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে এমপির বিরুদ্ধে।

এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ছাড়াও আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- সাবেক এমপি সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রনজিত সরকার, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হায়দার চৌধুরী লিটন, সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক খন্দকার মনজুর আহমদ, আওয়ামী লীগের প্রয়াত এমপি আবদুল হেকিম চৌধুরীর ছেলে ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও যুগ্ম সচিব (অব.) বিনয় ভূষণ তালুকদার ভানু, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা আওয়ামী যুবলীগ নেতা শক্তিপদ রায়, বঙ্গবন্ধু পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক ড. রফিকুল ইসলাম তালুকদার, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান সেলিম।

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কয়েকজন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে এমপির বিরুদ্ধে নানা বিষোদগার করেন। দলের প্রার্থী বদলের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে ৭ মনোনয়ন প্রত্যাশী এক মঞ্চে সভা-সমাবেশ করছেন। তারা সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি তুলে ধরার সঙ্গে প্রকাশ্যে এমপির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও র্দুর্নীতির নানা সব অভিযোগ করে বেড়াচ্ছেন।

মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার সবার। কে পাবেন তা দলের সভানেত্রী ছাড়া আর কেউ বলতে পারবেন না। তিনি বলেন, এলাকায় গত ৪০ বছরে যে উন্নয়ন হয়নি গত ১০ বছরে তার কয়েকগুণ বেশি হয়েছে।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী রফিকুল হক সোহেল বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব।

অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার বলেন, ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করছি। সুনামগঞ্জ-১ আসনের প্রতিটি উপজেলা, থানা ও ইউনিয়ন থেকে গ্রাম পর্যায়ে নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম ও আছি। ২০০৮ সালে মনোনয়ন চেয়েও পাইনি। এবার আশাবাদী। সেই টার্গেট নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি।

অ্যাডভোকেট রনজিত সরকার বলেন, ‘আমাকে মনোনয়ন দেয়া হলে এলাকায় দলের মধ্যে কোনো গ্রুপিং-কোন্দল থাকবে না। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলের সব নেতাকর্মীদের নিয়ে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করব।’

আওয়ামী লীগের আরেক প্রার্থী রেজাউল করিম শামীম বলেন, এমপি রতন গত ১০ বছরে এলাকায় জামায়াত-বিএনপি ও স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের লোকজনকে আওয়ামী লীগে পুনর্বাসিত করেছেন। তার পরিবারের লোকজন ও অনুসারীরা দুর্নীতি-লুটপাট করে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্য করেছেন। নেতাকর্মীরা পরিবর্তন চান। আর এজন্য মনোনয়ন চাইব।

আরেক প্রার্থী খন্দকার মনজুর আহমদ দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যাকে প্রার্থী দেবেন তার পক্ষেই মাঠে নামব।

আওয়ামী লীগের আরেক প্রার্থী রফিকুল হাসান বলেছেন, এমপি সাহেব বিএনপি ও জামায়াতের ব্যবসায়ীদের আওয়ামী লীগে পুনর্বাসিত করেছেন। জলমহাল-বালু-পাথরমহাল লুটপাটসহ নানা সেক্টরে দুর্নীতির মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়েছেন। এমপির নির্দেশে তার অনুসারীরা ধর্মপাশা উপজেলা সদরে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে জাতির পিতা এবং প্রধানমন্ত্রীর ছবিও ভাংচুর করে। দু’জন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে এ আসনে নতুন প্রার্থী দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

নানামুখী চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিএনপিতে প্রার্থীর হিড়িক পড়ে গেছে। নির্বাচন সামনে রেখে এ মুহূর্তে অন্তত ছয়জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তারা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ছাড়াও লন্ডনের সঙ্গেও সংযোগ রাখছেন। বিএনপির এ মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- সাবেক এমপি নজির হোসেন, অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যারিস্টার হামিদুল হক আফিন্দি লিটন। এছাড়াও চারদলীয় জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

নজির হোসেন ও আরও দু’জন তরুণ নেতা লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন বলে বলাবলি হচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে নজির হোসেন বলেন, দলীয় মনোনয়ন দিলে আমি ফের নির্বাচনে প্রতিদ্ব্িদ্বতা করব। অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী বলেন, ২০০৮ সালে ভোটে লড়ে প্রায় এক লাখ ভোট পেয়েছিলাম। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলে এ আসনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত।

বিএনপির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আনিসুল হক বলেন, আমার বিশ্বাস দল নির্বাচনে গেলে অবশ্যই তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীর প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি মনোনয়ন পাব। তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, দল নির্বাচনে গেলে মনোনয়ন চাইব। তবে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, আমি তার পক্ষেই মাঠে নামব।

ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী বলেন, জোটগত নির্বাচন হলে ইসলামী ঐক্যজোট এ আসনটি দাবি করবে। জোটের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে আমি নির্বাচন করব। তবে সব কিছু নির্ভর করছে জোটের শীর্ষ নেতাদের ওপর।

(এইচএস/এসপি/অক্টোবর ১৫, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

২০ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test