Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

চুয়াডাঙ্গার রাস্তায় পল্লী এ্যাম্বুলেন্স

২০১৮ নভেম্বর ১৪ ১৮:৪৬:০৬
চুয়াডাঙ্গার রাস্তায় পল্লী এ্যাম্বুলেন্স

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কোনো না কোনো গ্রামের রাস্তায় হঠাৎ চোখে পড়তে পারে কচিকলাপাতা রঙের একটি গাড়ি। গাড়ির গায়ে লাল কালিতে লেখা আছে ‘পল্লী এ্যাম্বুলেন্স’। 

সদর উপজেলায় এ ধরণের পল্লী এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে সাতটি। গ্রামের অসুস্থ মানুষদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা হাসপাতালে পৌছে দেওয়ার জন্য কাজ করছে এ এ্যাম্বুলেন্সগুলো। ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ এ এ্যাম্বুলেন্সের সেবা পেয়েছেন। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের দৌড়গোড়ায় পৌছে গেছে পল্লী এ্যাম্বুলেন্সের সেবা।

উপকারভোগীরা জানিয়েছেন, পল্লী এ্যাম্বুলেন্স গ্রামের মানুষদের উপকারে আসছে। প্রচলিত এ্যাম্বুলেন্সে যেমন লাল আলো জ্বলে-নেভে। সাইরেন বাজে। পল্লী এ্যাম্বুলেন্সেও আছে একই ব্যবস্থা। তিনচাকার ব্যাটারিচালিত এ গাড়ির চালকদের মোবাইল নম্বর অনেক গ্রামবাসি সংগ্রহে রাখেন। প্রয়োজনের সময় পল্লী এ্যাম্বুলেন্স চালকের মোবাইল ফোনে ফোন দিলেই বাড়িতে পৌছে যাবে পল্লী এ্যাম্বুলেন্স। তারপর ওই এ্যাম্বুলেন্সে রোগি এবং রোগির স্বজনদের নিয়ে যাওয়া হয় তাদের পছন্দের হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা কাছের সরকারি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে। এভাবেই চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ১৭০ গ্রামবাসি সাতটি পল্লী এ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন। রাত-দিন ২৪ ঘন্টা যেকোনো সময় পল্লী এ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত থাকে অসুস্থ্য মানুষকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌছে দেওয়ার জন্য।

যেভাবে শুরু

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াশীমুল বারী পরিকল্পনা করেনপল্লী এ্যাম্বুলেন্সের। পরিকল্পনা অনুযায়ী সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে ইজিবাইক ঘরানার ব্যাটারিচালিত সাতটিপল্লী এ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হয়। প্রতিটি পলøী এ্যাম্বুলেন্স তৈরিতে খরচ হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার টাকা। এ্যাম্বুলেন্সগুলো সাত ইউনিয়নের সাত চেয়ারম্যানের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানগণ স্ব স্ব ইউনিয়নের আগ্রহী চালকদের হাতে দিয়ে দেনপল্লী এ্যাম্বুলেন্স।

তৈরির উদ্দেশ্য :

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াশীমুল বারী জানান, এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া রোগি বহনের অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাম থেকে অসুস্থ্য রোগীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্ভোগে পড়তে হয় রোগি ও স্বজনদের। হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে খবর দিয়ে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। গ্রামের দরিদ্র অনেকের আর্থিক সঙ্গতিও অতোটা থাকে না। কম খরচে গ্রামের অসুস্থ রোগিদের হাসপাতাল কিংবা নিকটের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে পল্লী এ্যাম্বুলেন্স।

নীতিমালা :

পল্লীএ্যাম্বুলেন্স চলাচলের কিছু নীতিমালা আছে। ২৪ ঘন্টাপল্লী এ্যাম্বুলেন্স রোগির সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে। সংশিøষ্ট ইউনিয়নের গ্রামের কোনো মানুষ ফোন করলেইপল্লী এ্যাম্বুলেন্স পৌছে যাবে রোগির কাছে। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মতো সাধারণ ভাড়া নিয়ে রোগি পৌছে দেওয়া হবে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কিংবা ক্লিনিকে। প্রতিদিন রোগী পাওয়া যাবে এমন কোনো কথা নেই। এজন্যপল্লী এ্যাম্বুলেন্সগুলো সাধারণ যাত্রীও বহন করতে পারবে। যাতে চালক তার সংসার চালানোর মতো আয়পল্লী এ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে করে নিতে পারেন।

এক চালকের অভিজ্ঞতা

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের মো. নয়ন আলীপল্লী এ্যাম্বুলেন্সের চালক। তিনিপল্লী এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আলোকদিয়া ইউনিয়নের সব গ্রামে ঘোরেন। খবর পেলে ছুটে যান রোগির বাড়ি। রোগিকে পৌছে দেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল কিংবা রোগির পছন্দের কোনো হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে।

নয়ন বলেন, পল্লী এ্যাম্বুলেন্স মানুষের উপকারে আসছে। সাধারণ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের যা ভাড়া সেই ভাড়ায়পল্লী এ্যাম্বুলেন্সে রোগি নিয়ে যাওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী কিংবা তার স্বজনরা খুশি হয়ে যা দেন তা নেওয়া হয়। দরিদ্র-অসহায় রোগিদের নামমাত্র টাকায় পৌছে দেওয়া হয় হাসপাতালে। অনেকে খুশি হয়ে কিছু বেশি টাকাও দেন। ভাড়া দিতে পারেন না এমন রোগিও পাওয়া যায়, তাদেরও পৌছে দেওয়া হয় হাসপাতালে।

পল্লীএ্যাম্বুলেন্স পেতে হলে

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে আছে একটি করেপল্লী এ্যাম্বুলেন্স। ইউনিয়নের নাম লেখা আছেপল্লী এ্যাম্বুলেন্সের গায়ে। এ্যাম্বুলেন্সগুলো নিজের ইউনিয়ন এলাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। তবে, রোগী নিয়ে ইউনিয়নের বাইরের হাসপাতালে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে পারবে। এমনকি রোগির প্রয়োজনে জেলার বাইরেও যাবেপল্লী এ্যাম্বুলেন্স।

চালকের মোবাইল ফোনে ফোন করলেইপল্লী এ্যাম্বুলেন্স পৌছে যাবে। চালকের নম্বর যদি না থাকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের কাছেও ফোন করে পল্লী এ্যাম্বুলেন্সের সেবা নেওয়া যাবে।

উপকারভোগীরা বলেন ,সদর উপজেলার আলোকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের গৃহবধু সোনিয়া খাতুনের প্রসব বেদনা ওঠে। স্বামী দিনমজুর মহিনউদ্দিন ফোন করেপল্লী এ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে আনেন। ওই এ্যাম্বুলেন্সে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি ক্লিনিকে। সেখানে কন্যা সন্তান প্রসব করেন সোনিয়া খাতুন। সোনিয়ার স্বামী মহিনউদ্দিন বলেন, চুয়াডাঙ্গা থেকে এ্যাম্বুলেন্স ডাকতে গেলে অনেক টাকা লাগতো। পল্লী এ্যাম্বুলেন্সে আমার কোনো খরচই হয়নি। চালক আমার পরিচিত। কোনো টাকা লাগেনি। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স এসে সুবিধা হয়েছে অনেক। গ্রামের অসুস্থরা সেবা পাচ্ছে।

শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামের হারেজ আলী বলেন, হঠাৎ খুব অসুুস্থ হয়ে গিয়েলাম (গিয়েছিলাম)। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স আমাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেল। আমি হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম।

আলোকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের শাহাদত আলী বলেন, ‘আমার মা নূরজাহান বেগমের বয়স ৬০ বছর। মা প্যারালাইসিস হয়ে পড়েন। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স ডেকে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। এ্যাম্বুলেন্সের চালককে খুশি হয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স মানুষের উপকারে আসছে।’

আলোকদিয়া ইউনিয়নের পল্লী এ্যাম্বুলেন্সের চালক রাজাপুর গ্রামের মো. নয়ন আলী বলেন, আগে আমি মাঠে কাজ করতাম। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স চালানো শুরু করে মনে হলো, মানুষকে সেবা করতে পারছি। কতো অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়েছি বলে শেষ করা যাবে না। অসুস্থ একজনকে ঝিনাইদহ জেলাতেও নিয়ে গিয়েছি। উনার শরীরের কিছু পরীক্ষার দরকার ছিল। চুয়াডাঙ্গায় হয় না। নিয়ে গেলাম ঝিনাইদহে।

নয়ন জানান, পল্লী এ্যাম্বুলেন্সে করে অসুস্থ মানুষদের নিয়ে যাই। যে যা দেন তাই নিই। এমনও হয়েছে, খুব গরীব মানুষ টাকা দিতে পরেনি। কেউ কেউ খুশি হয়ে দু’তিনশ টাকাও দেন।

দেখভালের দায়িত্বে যারা:

পল্লী এ্যাম্বুলেন্সগুলো দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ। আলোকদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইসলাম উদ্দিন বলেন, শহর থেকে দূরে গ্রামের পথে চলছে পল্লী এ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালে পৌছার জন্য গ্রামের মানুষরা হাতের কাছে পাচ্ছেপল্লী এ্যাম্বুলেন্সের সেবা। এতে খুশি গ্রামবাসি। আগে ভ্যানে শুইয়ে গ্রাম থেকে রোগি শহরে নিতে দেখেছি। মহিলা রোগি হলে তাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স চারদিকে ঘেরা। রোগিদের নির্বিঘ্নে নিয়ে যাওয়া যায়।

শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান বলেন, পল্লী এ্যাম্বুলেন্স ব্যাটারিতে চলে। রাস্তা ভাল হলে দ্রুত যেতে পারে। বেশিরভাগ রাস্তা এখন ভাল। পল্লী এ্যাম্বুলেন্স রোগি নিয়ে পৌছে দিচ্ছে হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে। এই সেবা গ্রহণ করছে মানুষ। তারা প্রশংসা করেছে। অনেকে উপকৃত হচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ওয়াশীমুল বারী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসুস্থ মানুষদের কথা ভেবে পল্লী এ্যাম্বুলেন্সের পরিকল্পনা করা হয়। এখন দেখা যাচ্ছে বেশ সাড়া মিলেছে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য ভাল কোনো ব্যবস্থা ছিল না। যানবাহনের কারণে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের হাসপাতালে পৌছুতে দেরি হয়ে যায়। এতে জীবনের ঝুকি দেখা দেয়। সেই অসুবিধা দূর করার জন্যই পল্লী এ্যাম্বুলেন্স ভাবনা মাথায় আসে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পল্লী এ্যাম্বুলেন্স চলছে। চালু হওয়ার পর থেকে পল্লী এ্যাম্বুলেন্স ভালই চলছে। কিছু এ্যাম্বুলেন্সের ব্যাটারি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ব্যাটারি কেনার। সেগুলোও ঠিকমতো চলবে।

(টিটি/এসপি/নভেম্বর ১৪, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

২৬ মে ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test