Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

সীমাহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানুষের ভোগান্তি

আলোর নিচে অন্ধকারে নবীগঞ্জবাসী!

২০১৯ মে ১৫ ১৮:৩৭:০৮
আলোর নিচে অন্ধকারে নবীগঞ্জবাসী!

মতিউর রহমান মুন্না, নবীগঞ্জ : প্রদীপের আলোয় চারিদিক আলোকিত হলেও এর নিচে থাকে অন্ধকার। নবীগঞ্জবাসীর অবস্থাও আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই। দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র নবীগঞ্জের বিবিয়ানা। এটি বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার মোট ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। উত্তোলনকৃত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানিকারক হিসেবে চাহিদা মেটাচ্ছে। বিবিয়ানা গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চালু হওয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাচ্ছে। ২৯ নভম্বের ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবীগঞ্জে উদ্বোধন করেন বিবিয়ানা ১১নং গ্যাসকূপ ও পারকুলে ৯০০ মেগোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কুইক রেন্টাল। কিন্তু নবীগঞ্জবাসী পল্লীবিদ্যুতের বিভ্রাট, ঘন ঘন লোডশেডিং ও কম ভোল্টেজের কারণে অতিষ্ঠ। 

পবিত্র রমজান মাসেও সেহরী ও ইফতারের সময় নবীগঞ্জে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারণে পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৩৫৪ গ্রামের সাধারণ মানুষ অন্ধকারে প্রচ- দাবদাহে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গ্রাহকদের কোনোরকম অবগতি ও নোটিশ ছাড়াই সারা দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়। এতে রাতেও অন্ধকারে ভূতুরে পরিবেশে বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে এ উপজেলার মানুষকে।

লোডশেডিংয়ের কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই নবীগঞ্জে। এর মধ্যে সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। অনেক সময় এক রাত বিদ্যুৎ গেলে পরের রাতও অনেক এলাকায় বিদ্যুতের খোঁজ মিলে না। চলতি সপ্তাহেও ঝড়ের কারণে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন পৌর এলাকা, শহরসহ উপজেলা বিভিন্ন গ্রামে প্রায় তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ এলাকার বিভিন্ন কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতাণসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে অপারেটররা ৩/৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিজেদের ব্যবস্থায় নেটওয়ার্ক চালাতে পারে, কিন্তু এর বেশি হলে সাইট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতেও দেখা দেয় চরম ভোগান্তি।

প্রচ- দাবদাহে এমন লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগে পড়ে প্রায়ই রাস্তায় নেমে আসেন নবীগঞ্জ পৌর এলাকার বিক্ষুব্ধ জনতা। শত শত মানুষ জুতা মিছিল নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করে তালা দিয়ে রাখেন। এমন অনেক ঘটনাও ঘঠেছে।
সূত্র জানায়, হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নবীগঞ্জ জোনাল অফিসের আওতায় বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নবীগঞ্জের গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য শাহজীবাজার গ্রিড সাবস্টেশন থেকে ৫৪ কিমি. দূরে ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ উপজেলায় স্থাপিত ১৫ এমভিএ বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। একই লাইনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। আন্ডার সাইজের একই লাইনে ৪ উপজেলায় সংযোগ দেয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। ৪ উপজেলার এক লাইন হওয়ায়, যে কোনো এক উপজেলায় কোনো সমস্যা হলে একযোগে ৪ উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়। এ কারণে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ঝড়ো মৌসুম হওয়ায় এ সমস্যা বিরাট আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

পল্লী বিদ্যূৎ অফিসের তথ্যমতে, সাধারণত দুটি কারণে ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘিœত হয়। প্রথমত, জানমালের নিরাপত্তা ও নিজেদের যন্ত্রপাতির সুরার জন্য কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সরবরাহ বন্ধ রাখে। যেন ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। আবার বজ্রপাতে বা বৃষ্টির কারণে দুর্ঘটনায় যেন ট্রান্সফরমার পুড়ে না যায় সে জন্য অনেক সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। আরেকটি হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঝড়ে বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সরবরাহ বিঘিœত হয়। সূত্রমতে, বিদ্যুতের বিতরণ লাইনের এক-তৃতীয়াংশই ওভারলোডেড। সমতার চেয়ে বেশি সংযোগ প্রদান ও পুরনো লাইনের কারণে বিতরণ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই অল্প ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির সময় গাছের ডাল পড়ে শর্টসার্কিট হয়ে অনেক সময় লাইন ট্রিপ করে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া থাকলেও বজ্রপাতের সময় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়।

নবীগঞ্জের বিদ্যুতের পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য আউশকান্দি এলাকায় একটি উপকেন্দ্র স্থাপন, ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন যথাযথ মানের (মোটা) তার প্রতিস্থাপন ও ডাবল সার্কিট লাইন তৈরিকরণ জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে এসব বিষয়ে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে পল্লীবিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে। নানা সমস্যার বেড়াজালে নবীগঞ্জ পল্লীবিদ্যুতের জোনাল অফিসের বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। নবীগঞ্জবাসী সাবেক ডিজিএম পরিবর্তনের দাবিতে নানা আন্দোলন করে আসছেন নবীগঞ্জ। ডিজিএম বদলি হয়। নতুন ডিজিএম আসেন। কিন্তু উন্নতি হয়নি পল্লীবিদ্যুৎ গ্রাহক সেবার। এমনকি গত তিন বছর যাবৎ লাইন মেরামত করার অজুহাতে সপ্তাহে ২ দিন (শুক্রবার ও শনিবার) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু কোনো কোনো দিন রাত ১০টাও হয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে। অনেক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে লোডশেডিং হলে আমরা আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে পারি। এ অবস্থায় লোডশেডিং চলতে থাকলে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকাই ভালো। অনেকেই বলেন- আমাদের এলাকায় তো বিদ্যূৎ যায়না, তবে মাঝে মাঝে আসে। বিদ্যূৎ আসলে স্বপ্নের মতো লাগে, মনে হয় আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশেই বসবাস করছি।

সচেতন মহল মনে করেন নবীগঞ্জের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে নবীগঞ্জবাসীকে অন্ধকারে রেখে দেশের মানুষকে আলোকিত করা হচ্ছে। এসব কারণে বিবিয়ানা গ্রিড সাবস্টেশন ও আউশকান্দি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র স্থাপন জরুরি। এদিকে চলতি মাসে ডিজিএম আব্দুল বারীকেও বদলি করা হয়েছে। এখনও কোন নতুন ডিজিএম এসে যোগদান করেননি।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ পল্লীবিদ্যুৎ জোনাল অফিসের দায়ীত্বরত এজি এম মোঃ রুহুল আমিন জানান, নবীগঞ্জের গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য শাহজীবাজার গ্রিড থেকে ৫৪ কি.মি. দূরে ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ উপজেলায় স্থাপিত ২০ এমভিএ বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। একই লাইনের মাধ্যমে নবীগঞ্জ, শায়েস্থাগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং সাব-স্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। আন্ডার সাইজের একই লাইনে ৪ উপজেলায় সংযোগ দেয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। ৪ উপজেলার এক লাইন হওয়ায় যে কোনো এক উপজেলায় কোনো সমস্যা হলে একযোগে ৪ উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ মিলাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা দেশে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। নবীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। শতভাগ বিদ্যুতায়নের পথে নবীগঞ্জ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটে খুব সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত শনিবার রাত ৯ টা ৫০ মিনিটে বারবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করায় বিষয়টি সরাসরি মনিটরিং করতে আমি পল্লী বিদ্যূৎ অফিসে হঠাৎ গিয়ে উপস্থিত হই। এসবের কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তারা বিদ্যুতের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এছাড়া জনগণের দাবী নবীগঞ্জ পাওয়ার ষ্টেশন থেকে নবীগঞ্জে সার্বক্ষনিক বিদ্যুত সরবরাহ করা। এ বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বত্বন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে তা অভিলম্বে সমাধানের চেষ্টা আছি।

(এম/এসপি/মে ১৫, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

২৬ মে ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test