Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

বছরের পর বছর ভূয়া এতিম সাজিয়ে চলছে প্রভাবশালীদের লুটপাটের মহোৎসব

২০১৯ আগস্ট ২৫ ১৯:৫১:৪৭
বছরের পর বছর ভূয়া এতিম সাজিয়ে চলছে প্রভাবশালীদের লুটপাটের মহোৎসব

নড়াইল প্রতিনিধি: এতিমের নামে সরকারী বরাদ্দ আত্মসাৎ এর ঘটনা পুরো নড়াইল জুড়ে। বছরের পর বছর ধরে এতিমের নামে সরকারী টাকা লুটে খাওয়া এতিমখানার সংখ্যাও  কম নয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখি,অভিযোগ দাখিল করেও কোন সুরাহা হয়নি। এবার সন্ধান পাওয়া গেছে এমন  এতিমখানার যেটির সভাপতি খোদ জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসক কে পুঁজি করে বছরের পর বছর ধরে লুটপাট চললেও জেলা প্রশাসকই জানেন না যে, তিনি ঐ এতিমখানার সভাপতি। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দিনের পর দিন এতিমের টাকা লুট হলেও যেন দেখার কেউ নেই ! এ ক্ষেত্রে সবকিছুকেই নিয়মে পরিনত করা হয়েছে।

নড়াইল সদরের চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের “সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্র্ডিং”। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত জেলার প্রাচীন এতিমখানা। ১৯৮৫ সালে বেসরকারী সংস্থা কারিতাস এর সহায়তাপ্রাপ্ত এতিমখানায় জেলা পরিষদ থেকে ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯১৫-১৬ অর্থবছরে। ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে এতিম খানাটি সমাজসেবার মাধ্যমে সরকারী অনুদান প্রাপ্ত হয়।
কয়েক দফা সরেজমিন পরিদর্শন করে এতিমখানার নানা অব্যবস্থা চোখে পড়েছে। বেশিরভাগ সময়ে এতিমখানাটি বন্ধ থাকে,এখানে দুটি বড় টিনশেড ভবন থাকলেও সেখানে এতিমদের থাকার কোন পরিবেশ খুজে পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে “সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্র্ডিং” এ ১১৪ জন এতিমের নামে মাসে ১ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা আর বাৎসরিক বরাদ্দ পায় ১৩লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা। সরেজমিন এতিমখানায় প্রকৃত এতিমের কাউকেই খুজে পাওয়া যায়নি। এখানে ৪/৫ জন থাকলেও তারা নিজেদের অর্থে থাকে আবার খায়। স্থানীয় একজন স্কুল শিক্ষক বলেন,এখানে লিল্লাহ বোডিং এ পাশের মাদ্রাসার কিছু ছাত্র রোজার সময় এখানে থেকে নামাজ পড়ে,নিজেদের টাকায় খায় আবার বাড়িতে চলে যায়।
এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানান,এই এতিমখানাটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি খোদ জেলা প্রশাসক। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়,বছরের একটি নিদিষ্ট সময়ে এতিমখানা সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের এতিমখানাগুলোতে দাওয়াত করে মেজবনি দেন। সে সময় বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ছেলে-মেয়েদের এতিম সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়। জুন মাসে স্থানীয় সাংবাদিকের এতিমখানা পরিদর্শন করার পরে ৫ আগষ্ট জুলাই মাসে যথারীতি জেলা প্রশাসক,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভোজ দিয়ে এতিম দেখানো হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যানের নিজের নামে গঠিত জেলার সবচেয়ে বড় বালিকা এতিমখানা “আজিজুর রহমান ভূইয়া বালিকা সমাজসেবা এতিমখানা” টি পাশেই অবস্থিত। এই এতিমখানার সুপার রকিবুলের চাচা কাজী আব্দুল কাদের। ১২৭ জন বালিকা এতিমের জন্য এখানকার বার্ষিক বরাদ্দ ১৫ লক্ষ ২৪ হাজার। এই এতিমখানার অবস্থা প্রায় একই রকম। সরেজমিন গিয়ে ১৪ জন শিশু দেখা গেলেও তাদের সবার মুখে কর্তৃপক্ষের শেখানো মুখস্ত বুলি শোনা গেছে। শিশুদের সাথে নানা ভাবে কথা বলে জানা গেছে,আশেপাশের বিভিন্ন মেয়েরা এখানে থাকে আর মাদ্রাসায় পড়ে। বড়জোর ৪০ জন এতিমের তথ্য দিতে পারে কোমলমতি এসব শিশুরা। নামে ৪০ জন এতিম বালিকা থাকলেও তারমধ্যে মাত্র ২ জন প্রকৃত এতিমের সন্ধান পাওয়া গেছে।

চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের প্রভাবশালী চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ভূইয়া “আজিজুর রহমান ভূইয়া বালিকা সমাজসেবা এতিমখানা”র সভাপতি এবং “সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্র্ডিং” এর সহ-সভাপতি। ইউপি চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে ঐ দুই এতিমখানার সুপারসহ অন্যরা পুরোবছর ধরে এতিমের টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বালিকা এতিমখানার ব্যাপারে স্থানীয়দের বিস্তর অভিযোগ থাকলেও ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।

এতিমখানার টাকায় গড়ে ওঠা ছাগলের খামারের দেখাশুনা করে এতিম বালিকারা। সুপার কাজী আব্দুল কাদের এবং তার স্বজনদের বাড়িতে এতিমদের কাজ করানো হয়,কাদেরের নিজের কাজেই ব্যবহার করা হয় ৫ এতিম শিশুকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্বীকার করেছেন এসব কথা,তারা বলেছেন, সুপারের বাড়িতে মেহমান আসলে এতিমদের নিয়ে আপ্যায়ন করানো হয়,পাটবাছানো,জমির ফসল উঠলে গৃহস্থালীর কাজ করানো হয় এসব শিশুদের দিয়ে।


জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,সমাজসেবার তত্ত্বাবধানে ৩ উপজেলার মোট এতিমখানার সংখ্যা ৪৩ টি। ছোট বড় এসব এতিমখানায় মোট ১হাজার ২’শ ৬৪ জন এতিমের জন্য মাসে মোট বরাদ্দ দেয়া হয় ১২ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা। বাৎসরিক দেড় কোটি টাকা। ক্যাপিটেশন গ্রান্ড পাবার শর্ত অনুযায়ী প্রত্যেকটি এতিমখানা নিজস্ব অর্থে যে কয়েকজন এতিম পালন করেন তার দ্বিগুন এতিম থাকলেই কেবল অর্ধেকের জন্য অনুদান পাবেন। অনুদান প্রাপ্ত অধিকাংশ এতিমখানাতেই বছরের পর বছর এতিমদের নামে টাকা তুলে মালিক সেজে সুপার নিজের পকেট ভরছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন আলেম বলেন, যারা এতিমদের টাকা তুলে খাচ্ছেন তারা চরম গোনার কাজে লিপ্ত হচ্ছেন।সকল ভূয়া এতিখানা বন্ধের তাগিদ এইসব আলেমদের।
সীমানন্দপুর গরীবশাহ এতিমখানার সুপার কাজী রাকিবুল ইসলাম বলেন,ভাই যে সব অনিয়ম আছে সব ঠিক করা হবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই। আপনি এরপরে দেখলে আসলে সব ঠিকঠাক দেখতে পাবেন।

ভূইয়া আজিজুর রহমান বালিকা এতিমখানার সুপার কাজী আব্দুল কাদের বলেন,নিয়ম অনুযায়ী আমাদের এতিমখানা চলছে,শিশুদের বাড়িতে কাজ করানো বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান।

চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ভূইয়া’র সাথে এতিমখানা প্রসঙ্গ কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে এড়িয়ে গিয়ে দেখা করতে বলেন,পরে কিছু অনিয়ম স্বীকার করে বলেন,এগুলো সব ঠিক হয়ে যাবে,এতিম না থাকা প্রসঙ্গে তিনি প্রতিবেদককে বলেন,দুইভাই একসাথে বসলে সব ঠিক করা যাবে।


নড়াইলের জেলা প্রশাসকের কাছে এতিমখানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দুটো এতিমখানা সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না এটা স্বীকার করে বলেন, আমি নির্দেশনা দিয়েছি ক্যাপিটেশন গ্রান্ড পেতে গেলে প্রকৃতপক্ষে যে কয়জন এতিম আছে তাদের হিসাব করেই দিতে হবে।

(ওএস/পিএস/আগস্ট ২৫, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test