Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

রক্ষা করা যাচ্ছেনা জাতীয় সম্পদ মা ইলিশ

২০১৯ অক্টোবর ১৮ ২৩:৫০:০৬
রক্ষা করা যাচ্ছেনা জাতীয় সম্পদ মা ইলিশ

শরীয়তপুর প্রতিনিধি: দেশের নাগরিকদের মধ্যে দেশাত্ববোধ না থাকলে সে দেশে কখনো আত্ম-নির্ভরশীলতা আসেনা।  দেশ কখনো উন্নত হতে পারেনা। সে দেশের মানুষেরা কখনোই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারেনা, তারা আইন মানেনা। নাগরিক কর্তৃক আইন না মানা দেশে আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠিত হয়না। আবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে কোন দেশে সুশাসন আসেনা এমনকি নাগরিকরা আইনও মানেনা।

যারা আইন মানেননা তারা সব কিছুই করতে পারে। তারা দেশের সম্পদ লুট, রাহাজানি, সন্ত্রাস, মাদক বিক্রি, মাদক সেবন, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রশ্ন ফাঁস, রাজ কর্তার মহলে বসে চাকুরী প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন বিক্রি, ভাই হত্যা, সন্তান হত্যা এমনকি মাকেও হত্যা করতে পারে। হ্যা, তাই-ই তো দেখছি দেশপ্রেমহীন আইন অমান্যকারি মানুষগুলো বিপুল আনন্দ আর বিকৃত উল্লাসে মেতে উঠেছে মাতৃ হত্যার উৎসবে -“মা ইলিশ” নিধন যজ্ঞে। নিজের মায়ের সাথে যখন সামান্য একটি মাছের তুলনা হয় তখন মানুষ বলতেই তার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষরূপি অমানুষগুলো রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে রাতদিন শিকার করে চলেছে কোটি কোটি টাকা মুল্যের লক্ষ লক্ষ মা ইলিশ। শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রনায়ক আর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী চাইলেই দেশের এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব না। মা ইলিশ রক্ষা করতে হলে তুণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিজন কর্মচারিকে পরিশুদ্ধ হয়ে ভূমিকা নিতে হবে সবার আগে।

সরকার এ বছরও মা ইলিশ রক্ষার জন্য ৯ থেকে ৩০ অক্টোবর মোট ২২ দিন ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ঘোষনা করে ইলিশ মাছ শিকার, বিক্রি, বিপনন, পরিবহন, মজুদ ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। এ জন্য দেশের উপকুলীয় অঞ্চল সহ ৩৬ জেলার ১৪৭টি উপজেলার মোট ৪ লক্ষাধিক প্রকৃত জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সহায়তাও প্রদান করেছেন। দেশের দক্ষিনাঞ্চলের ৯০টি নদী এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদী মিলে মোট ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় মা ইলিশ রক্ষার অভিযান চালানো হচ্ছে। চন্দ্র নির্ভর আবর্তনকে অনুসরণ করে বা চন্দ্র পক্ষের সাথে মিল রেখে আশ্বিন মাসের পূর্নিমার ৪ দিন আগে থেকে শুরু করে ১৮ দিন পর পর্যন্ত মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। ডিম দেয়ার আগে সাগর থেকে মিঠা পানিতে উঠে আসে গর্ভবতি মা ইলিশ।

মূলত: প্রজননক্ষম স্ত্রী ইলিশকেই আমরা মা ইলিশ বলি। এ ইলিশ গুলোকে আমরা মায়ের সাথে তুলনা করেছি। সাধারণভাবে যদি বলা হয় তাহলে দেখা যাবে, আমাদের সন্তান সম্ভবা মা, বোন, স্ত্রী, কন্যাকে নিরাপদে তাদের সন্তান প্রসবের জন্য কাছের বা দুরের কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যাই। সন্তান প্রসবের কাজটিতে ঝুঁকি থাকায় আমরা তাদেরকে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে নিশ্চিন্ত হই নিরাপদে তার সন্তানটিকে পৃথিবীর আলো দেখানোয়। এমনভিাবে একটি মা ইলিশের যখন প্রসব যন্ত্রনা উঠে তখন সেও হাজার মাইল দুরের পথে পাড়ি জমিয়ে চলে আসে নদ নদীতে। বৈচিত্রময় জীবন ইলিশের। সারা বছর সমুদ্রে থাকলেও ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র্র থেকে উঠে আসে মিঠা পানির উজানে। প্রতিদিন ডিমে ভরা গর্ভবতি একটি মা ইলিশ ডিম ছাড়ার লক্ষ্যে ৭০-৮০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে ১ হাজার থেকে ১২ শত কিমি রাস্তা অতিক্রম করে মিঠা পানিতে উঠে আসে। সাগর থেকে ইলিশ যতই উজানের দিকে আসতে থাকে ততই তার শরীর থেকে লবনের মাত্রা কমে এর স্বাদ বাড়তে থাকে। মৎস ইন্সটিটিউিটের গবেষনা মতে ইলিশ মাছ সারা বছরই ডিম দেয়, তবে প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৮০ শতাংশ ইলিশ ডিম ছাড়ে। একটি মা ইলিশ ৩ লক্ষ থেকে ২১ ডিম দিতে সক্ষম হলেও গড়ে ৮ থেকে ১২ লক্ষ ডিম দেয় প্রতিটি মা ইলিশ। এসব ডিমের ৭০-৮০ শতাংশ ফুটে রেনু ইলিশ জন্ম নেয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০ শতাংশ ইলিশের রেনু বেঁচে থেকে পূর্নাঙ্গ ইলিশে রূপান্তরিত হয়। প্রজননক্ষম মা ইলিশ ও পরে জাটকা ইলিশ রক্ষা করা গেলে দেশের জলসীমায় অন্তত ২০ হাজার কোটি থেকে ২৫ হাজার কোটি পরিপক্ক ইলিশ পাওয়া যাবে মৌসুম শেষে।

বর্তমান শতাব্দির প্রথম দিকে এসে আমরা হতাশায় নিমজ্জিত হই। আশংকাজনকভাবে হ্রাস পেতে পেতে বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছিল সুস্বাদু ইলিশ মাছ। টানা এক যুগ পরে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে নজর দেন ইলিশ রক্ষা এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে। প্রথমেই প্রকৃত জেলেদের তালিকা করা হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে ইলিশ রক্ষার কর্মসুচি দিয়ে মা ইলিশ, জাটকা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা সময়ে প্রকৃত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়ার কর্মসূচিও চালু করা হয়। ২০১০-১১ অর্থ বছর থেকে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করা হয় ইলিশ রক্ষার। মা ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সাল থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল ১১ দিন। ২০১৫ সালে ছিল ১৫ দিন। ২০১৭ সাল থেকে করা হয়েছে ২২ দিন। প্রতি বছর দেশে ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশ। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর বহু দেশে। প্রতি বছর ইলিশ রপ্তানি করে সরকার আয় করছে ৩০০ কোটি টাকারও বেশী। দেশে নানা প্রজাতির মাছের মোট উৎপাদনের ১২ শতাংশই ইলিশ মাছ। সমগ্র পৃথিবীতে উৎপাদিত মোট ইলিশের ৭০ ভাগ ইলিশই উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। বহু মানুষের জীবন জীবীকা ইলিশের উপর নির্ভরশীল। ৫ লক্ষ জেলে পরিবার ইলিশ আহরণ করলেও এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে অন্তত ২০ লক্ষ মানুষ। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জি.আই পন্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

দেখে শুনে মনে হচ্ছে এ বছর ইলিশ রক্ষা অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আমি শরীয়তপুরের সন্তান। শরীয়তপুর জেলায়ও চারটি উপজেলার নৌ সীমানায় পদ্মা-মেঘনার অন্তত ৮০ কিমি এলাকা রয়েছে ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র। প্রতি বছরের মত এবছরও সরকার মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের জন্য কিছু আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য, নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, কোষ্টগার্ড ও মৎস বিভাগের লোকেদের নিযুক্ত করেছেন। যাদের ইলিশ রক্ষার এ দায়িত্ব নিয়েছেন তারা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। ফলে, নদীতে সার্বক্ষনিক শত শত ট্রলার ও স্পীডবোট দিয়ে মা ইলিশ শিকার করছে অসাধু চক্র। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এ বছর শুধু শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলাতেই মা ইলিশ নিধন কাজে অন্তত ২০ কোটি টাকা লগ্নি করেছে ইলিশ মাফিয়া চক্র।

২০১৮ সালে শরীয়তপুর জেলায় আইন শৃংখলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসন ২২ দিনের অভিযানে ১ হাজার ৩ শত জনকে আটক করে তাদের মধ্যে ৯২২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছিলেন। এছারাও কয়েক লক্ষ টাকা জরিমানা, বিপুল পরিমানে মা ইলিশ, জাল, নৌকা ও স্পীডবোট আটক করেছিলেন। গত বছরের পূনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে আলোকে আমরা দেখেছি মা ইলিশ রক্ষায় শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর প্রবল স্বদিচ্ছা ও দেশ প্রেমের চিত্র। তিনি আগষ্ট মাসের প্রথম দিক থেকেই টানা ৪০ দিন তার নির্বাচনী এলাকার অন্তত ২০টি স্থানে সরকারি কর্মচারি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে মা ইলিশ রক্ষার জন্য গণসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। তিনি প্রকৃত জেলে, মৌসুমি জেলে, আড়ৎ মালিক, দাদন ব্যবসায়ী, লগ্নিকারক ও এনজিও কর্মীদের নানা ভাবে বুঝিয়েছেন মা ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকতে। ৮ অক্টোবর বিকেল থেকেই সাংসদ তার দলীয় কর্মীদের সরকারি আইন শৃংখলা বাহিনীর সমন্বয়ে নদীতে টহল দিতে পাঠিয়েছেন। টানা তিন দিনের রাত-দিন টহলে পদ্মা নদীর অন্তত ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় কোন মাছ ধরার নৌকা নামতে দেখা যায়নি। সংসদ সদস্যের এ ভূমিকায় মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে লগ্নিকারিদের। তারা এ উদ্যোগকে ব্যর্থ করতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মা ইলিশ রক্ষায় সাংসদের নিয়োগকৃত প্রধান সমন্বয়ককে ফাঁসানো হয় ষড়যন্ত্রের জালে। ব্যর্থ হয় একটি মহৎ উদ্যোগ। ১১ তারিখ বিকেল থেকেই মহা উৎসব শুরু হয় পদ্মার বুক জুরে। শত শত নৌযান নিয়ে শুরু মা ইলিশ নিধন। ১৩ অক্টোবর জেলা আইন শৃংখলা সভায় সাংসদ ইকবাল হোসেন অপু ইলিশ রক্ষার জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করে একটি হৃদয়স্পর্শী ও আবেগভরা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তারপর সরকারি বাহিনীর টহল কিছুটা জোরদার হলেও থেমে নেই মা ইলিশ ধরা। রাত-দিন নির্দয়ভাবে চলছে ইলিশ হত্যার মহা যজ্ঞ। জেলার শত শত পয়েন্টে গভীর রাত পর্যন্ত বসছে ইলিশের হাট, পানির দরে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। অভিনব কায়দায় মোটর বাইকে চড়ে, স্কুলের ব্যাগে ভরে একেকজন ইলিশ কিনে ছুটছে জেলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। যাচ্ছে বাইরের জেলায়ও। গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে গিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মা ইলিশ। ছোট্ট একটি জেলা শরীয়তপুরকে নিয়ে বিচার করলে বলা চলে সারা দেশের চিত্র একই। কোথাও কেউ মানছেনা নিষেধাজ্ঞা। প্রতিদিন টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে আর পত্রিকার পাতা খুললেই নজরে পরে মা ইলিশ ধরার নির্মম দৃশ্য। এ অবস্থা থেকে জাতি হিসেবে আমরা কবে রেহাই পাবো, কবে আমাদের মধ্যে বধোদয় হবে আমাদেরই জাতীয় সম্পদ রক্ষার ?

শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বনাথ বৈরাগী জানিয়েছেন তার অসহায়ত্বের কথা। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব কোন নৌযান নেই। সীমিত খরচ। লোকবল কম। ভাড়া করা নৌযান নিয়ে অভিযানে যাই, নদীর এক দিকে গেলে অপর দিকে জাল ফেলে। এদের সাথে কুলিয়ে উঠা যায়না। তারপরেও গত ১০ দিনে ৬ শতাধিক জেলেকে আটক করে তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে ১ বছর করে সাজা দেয়া হয়েছে। মা ইলিশ পরিবহনের দায়ে জেলা পুলিশের ৩ সদস্যকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অনেক জাল, নৌকা, সী বোট ও মা ইলিশ আটক করা হয়েছে।

(ওএস/পিএস/অক্টোবর ১৮, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

২২ নভেম্বর ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test