E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

মান্দায় সন্ত্রাসী সুমন ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

২০২১ এপ্রিল ০৭ ১৮:১১:৩৬
মান্দায় সন্ত্রাসী সুমন ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁর মান্দায় অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অন্যের জমি জবরদখল করে ধান রোপণ, টর্চারসেলে নির্যাতনের পর ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া, দিন-দুপুরে অন্যের হাঁস ধরে জবাই করে পিকনিক খাওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে সন্ত্রাসী সুমন ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। টর্চারসেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো বাহিনীর অন্যতম সদস্য সৌরভের গভীর নলকূপের ঘর। এ বাহিনীর তান্ডবে গত ১০ মাস ধরে এলাকাছাড়া রয়েছে একটি পরিবার। 

বাহিনীর সদস্যদের হাতে যৌন হয়রানীর ভয়ে এলাকার সুন্দরী নারী কিংবা স্কুল শিক্ষার্থীরা বাইরে যেতে পারেন না। ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ এলাকায় আগত দর্শনার্থী নারী-পুরুষদের ফাঁদে ফেলে টাকা ও মোবাইলফোন ছিনিয়ে নেয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে। ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস না পেলেও বাহিনীর প্রধান সুমন ও তার ৩ সহযোগী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে যাবার পর একে একে বেরিয়ে আসছে এসব তথ্য। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোও মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

এ বাহিনীর প্রধানের পুরো নাম মেহেফুজুল আলম সুমন (৩৫)। সে উপজেলার মান্দা সদর ইউনিয়নের বাদলঘাটা গ্রামের মৃত সোলাইমান আলী শাহের ছেলে। সুমন ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া ছিলেন। এসএসসি পাসের পর লেখাপড়া না করে জীবিকার সন্ধানে রাজধানী ঢাকায় চলে যায়। সেখানে এক সেনা কর্মকর্তার গাড়ীর চালক হিসেবে কাজ শুরু করে। এক সময় গাড়ীটি নিজের বলে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে গাড়ীসহ সুমনকে আটক করেন ওই সেনা কর্মকর্তা। পরে সুমনের ছোটভাই জমি বিক্রি করে ১০ লাখ টাকায় তাকে ছাড়িয়ে নেয়। এরপর ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরে গড়ে তোলে ক্যাডার বাহিনী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার বাদলঘাটা, হাড়কিশোর ও কুসুম্বা গ্রামের ১০-১২ জন যুবককে নিয়ে সুমন গড়ে তুলেছে ক্যাডার বাহিনী। বাহিনীর অন্যতম সদস্যরা হলো, মাইনুল ইসলাম, সোহরাব হোসেন, লালু মন্ডল, আনোয়ার হোসেন, মাসুদ রানা, সৌরভ হোসেন, সুলতান। এছাড়াও আরো কয়েকজন যুবক তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভুক্তভোগী শিক্ষক মনোরঞ্জন সাহা জানান, পাওনা পরিশোধের কথা বলে গত ১১ মার্চ বিকেলে মনোরঞ্জন ও তার কাকীমা কাজলি রানীকে নিজ এলাকায় ডেকে নেয় সুমন। বাড়িতে না নিয়ে বাদলঘাটা গ্রামের বোরো ধানের মাঠের সৌরভের গভীর নলকূপের ঘরে নিয়ে তাদের আটক করে রাখা হয়। তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ব্যাপক নির্যাতন করে সুমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা। পরে তিনটি ফাঁকা চেক, কয়েকটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরসহ তার কাছে থাকা ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি সুমনসহ বাহিনীর ৬ সদস্যের বিরুদ্ধে মান্দা থানায় মামলা দায়ের করেন।

আরেক ভুক্তভোগী নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ঈশ্বর দেবোত্তর গ্রামের মতিউর রহমান জানান, গত ৩০ মার্চ বিকেলে কালামারা ব্রিজ এলাকায় বন্ধুদের নিয়ে ঘোরাফেরার সময় সুমন তার বাহিনী নিয়ে সেখানে হানা দেয়। এসময় তাদের মারপিট করে ৩ হাজার টাকা ও একটি মোবাইলফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সুমনসহ তার বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী মতিউর রহমান।

উপজেলার জিনারপুর গ্রামের আরেক ভুক্তভোগী মিজানুর রহমান জানান, তার ব্যক্তিমালিকানার একটি ট্রাক্টর রায়হান নামে এক ব্যক্তির নিকট ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। গত ২৫ মার্চ বাদলঘাটা স্কুলবাজারে উভয়পক্ষ বসে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিনামা তৈরি করার সময় সুমন তার বাহিনীসহ সেখানে হানা দিয়ে ২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে সুমন ও তার বাহিনীর তান্ডবে বাদলঘাটা গ্রামের আব্দুল জলিলের পুরো পরিবার ১০ মাস ধরে এলাকাছাড়া রয়েছেন। লুটপাট করা হয়েছে ওই পরিবারের ধান, চাল, সরিষা, মরিচ, সোনা, নগদ টাকাসহ একটি গরু। পুরো পরিবারটি এখন কোঁচড়া দক্ষিণপাড়া গ্রামে বাবুল হোসেন সরদারের বাড়িতে অবস্থান করছেন। এ পরিবারের সদস্য শফিকুল ইসলামকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মাঠ থেকে ধরে নিয়ে সৌরভের গভীর নলকূপের ঘরে আটক রেখে ব্যাপক নির্যাতন করে। এসময় কয়েকটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নেয়া হয়। এ পরিবারের ৭ বিঘা জমি জবরদখল করে বোরো ধান রোপণ করেছে সুমন ও তার বাহিনী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সুমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা দিন-দুপুরে এলাকার লোকজনের হাঁস ধরে জবাই করে পিকনিক খায় ও উল্লাস করে। তাদের ভয়ে এলাকার সুন্দরী নারী ও স্কুল শিক্ষার্থীরা বাইরে যেতে পারেন না। সুমনসহ তার বাহিনীর ৩ সদস্য গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। অবিলম্বে অন্য সহযোগীদেরও গ্রেফতারের দাবি জানান তারা।

এ প্রসঙ্গে মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ শাহিনুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে দুটি মামলায় সুমনসহ তার ৩ সহযোগী লালু মন্ডল, সুলতান ও মাইনুলকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প। এ বাহিনীর অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

(বিএস/এসপি/এপ্রিল ০৭, ২০২১)

পাঠকের মতামত:

২০ এপ্রিল ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test