E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

যাদের হাতে ভূমি অফিস জিম্মি: পর্ব-২

লাখ টাকা, কম্পিউটার ও টিভি দিয়েও মিলছে না সেবা!

২০২২ মে ২৫ ১৫:৫৪:১৮
লাখ টাকা, কম্পিউটার ও টিভি দিয়েও মিলছে না সেবা!

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলা ভূমি অফিস দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বলে ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেছেন। সেবাপ্রার্থীরা আরও বলেছেন, ওই অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারী ও দালালদের হাতে সেবা বন্দি। মিলেমিশেই হচ্ছে ভূমি সেবায় অনিয়ম। টাকা ছাড়া ওই অফিসে কোন কাজই হয় না। ভূমি সংক্রান্ত যেকোন সেবার বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কাড়ি কাড়ি টাকা। সকালে নতুন এসিল্যান্ড যোগদান করলেও সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো বদ্ধধারণা, ভূমি অফিসে গ্রাহকদের হয়রানি নিত্তনৈমত্তিক বিষয়।

সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি, জমাভাগ, খাজনা আদায়, জমির পর্চা (খসড়া) তুলা সহ ভূমি সংক্রান্ত সকল কাজে সরকারি নিয়মকে তোয়াক্কা না করে অনৈতিক ভাবে পদে পদে টাকা নেয়া হয়। চুক্তির টাকা ছাড়া কোন ফাইলই নড়ে না। টাকা না দিলে নির্ধারিত সময়ে কোন কাজ আদায় করা যায় না। সংশ্লিষ্ট জেলার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অগোচরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর দালালদের বিভিন্ন অনিয়ম বলে ভূক্তভোগীদের দাবি।

অনুসন্ধানে তথ্য মিলে, কর্ণফুলী ভূমি অফিসে ১১৫০ টাকার খতিয়ান করতে হাতিয়ে হচ্ছে লাখ লাখ টাকার ঘুষ। একটা নামজারি খতিয়ানের শুরুতেই ৩০০ টাকার আবেদন ফরম নিতে হয় সেবাপ্রার্থীকে। যেখান থেকে ১০০ টাকা প্রধান কর্তার নামে। আর এ কাজটি সম্পন্ন করে থাকেন কম্পিউটার অপারেটর (ক্যাজুয়াল) মোঃ শাহেদ। তিনি কোন সরকারি কর্মচারী নয়। এরপর ফাইল বিক্রি বাবদ ১০০ টাকা। বাধ্য হয়ে সবাইকে এই ফাইল কিনতেই হয়। এই ফাইল বিক্রি করেন নাজির মাহবুব ও অপারেটর শাহেদ।

এরপর যেকোন আবেদনটি চলে যায় স্ব স্ব ইউনিয়নের তহশিলদার অফিসে। পাঁচ ইউনিয়নের যার কাছে ফাইলটি যাক না কেন ‘তহশিলদালদের’ প্রতি আবেদনে দিতে হয় ২ হাজার টাকা। একই রেইট সবার। ওরা নিজেরাই বসিয়েছেন এই রেইট। তবে ফাইলে কোন দখল বেদখল ও ঝামেলা থাকলে তখন রেইট ১০ থেকে ৩০ হাজারের উপরে নিশ্চিত।

জনশ্রুতি রয়েছে, পাঁচ ইউনিয়নের তহশিলদারেরা মাস শেষে একটা ফিগার পৌঁছান উপজেলা অফিসের হর্তাকর্তাদের কাছেও। ওদিকে, আবেদিত ফাইলটি আবার আসে উপজেলা ভূমি অফিস। এখন নোটিশ বাবদ ৩০০ টাকা। নোটিশ অনুমোদনের নামে ১০০ টাকা প্রধান কর্তার নামে আদায়। এবার কানুন গো/ সার্ভেয়ারের স্বাক্ষর বাবদ ৫০০ টাকা।

এরপর প্রধান কর্তার নামে আদায় করেন ১ হাজার ৬০০ টাকা। যদি হেবা বা দানপত্র হয় ২ হাজার ৬০০ টাকা। আর যদি আদালতমূলে নামজারি হয়। তবে রেইট ৩ হাজার ৬০০ টাকা। আবার যদি জমির পরিমাণ এক একরের বেশি হয় ১০ হাজারের উপরে। অথচ পটিয়া উপজেলায় আগে এসব কাজ হতো নামে মাত্র। শোনা যায়, লাখ টাকায়ও কন্টাক হয় জটিল মিছ মামলা।

৬ষ্ট ধাপে গিয়ে খতিয়ান তামিল করতে ৫০০ টাকা। যেখান থেকে ২০০ টাকা আবারও প্রধান কর্তার নামে। টাকাটা তুলেন জাহেদ নামে এক অফিস সহায়ক। জমির ডিসিআর কাটাতে এখন ১ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। সরকারি ফি নাকি ১ হাজার ১৫০ টাকা। ওখান থেকে ২৫০ টাকা নেন দেবাশীষ রুদ্র নামে আরেক নাজির। এভাবেই একটা ১১৫০ টাকার সাধারণ খতিয়ানের খরচ কর্ণফুলীতে এসে দাঁড়ায় হাজার হাজার টাকায়। এটা হলো এক খতিয়ানের আত্মকাহিনী মাত্র।

সবচেয়ে ধুর্ত বলা হয় আহমেদ নবীকে। যিনি উপজেলা ভূমি অফিসে অফিসে সহায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের বহু অভিযোগ। যদিও সবাই স্ব স্ব অভিযোগ অস্বীকার করেন। অনেকে আবার জানান, ‘১৯৭২ এর পরের দলিল হলে ঐ খতিয়ানের ফাইলে নেয়া হয় মোটা অঙ্কের সুবিধা। এছাড়াও যেকোন সই মুহুরী নকল তুলতে নির্ধারিত রেইট ১ হাজার টাকা। ঐ টাকাটাও আদায় করেন শাহেদ। যেখান থেকেও হর্তাকর্তার ভাগ ৫০০। বাকি টাকা অফিসের লোকজনের হাত খরচ বলে দাবি।

শুধু কি তাই রিভারভিউ কমিউনিটি সেন্টারের মালিক আব্দুস সালাম (ভিডিও সংরক্ষিত) বলেন, ‘আমার একটা মিছ মামলায় এক লাখ টাকা নিয়েছেন। এরপর ৭০ হাজার টাকা দামের একটি কম্পিউটার নিয়েছেন। একটি টিভি নিয়েছে ৩০ হাজার টাকা দামের। এরপর আরো এক হাজার টাকা নিল শেষে। শেষে দাবি ৫ লাখ। আমার দোষ কি জানেন, আমার মিছ মামলায় নাকি একটা আপত্তি দিয়েছে।’ তবে এত কিছু দেওয়ার পরও শেষে সেবা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে মুখ খুলেননি তিনিও।

সদ্য যোগদান করা সহকারী কমিশনার (ভূমি) পিযুষ কুমার চৌধুরী বলেন, ‘পূর্বের কথা আমি বলতে পারব না। আমি আজকে যোগদান করলাম। এখন থেকে ভূমি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিতামূলক ও সহজীকরণ সেবা নিশ্চিত করতে ডিসি স্যারের নেতৃত্বে কাজ করে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরীতে বাকলিয়া ও সদর সার্কেল ভূমি অফিসে ভূমি সেবা সপ্তাহ-২০২২ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান ভূমি সেবাগ্রহিতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘ঘরে বসেই আপনারা ভূমি সেবা পেতে পারেন। ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, ই-নামজারি শতভাগ অনলাইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়। আর কোনো দালালের দ্বারস্থ না হয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সহকারি কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে আপনার ভূমির সমস্যার বিষয়ে কথা বলবেন। তাহলেই সমাধান পাবেন।’

(চলবে..)

(জেজে/এসপি/মে ২৫, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

২৬ জুন ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test