E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে এলাকায় নাশকতার পরিকল্পনা

যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামী কালিগঞ্জের আকবর মাওলানা ছেলেসহ গ্রেপ্তার

২০২৩ এপ্রিল ০১ ১৬:৪৮:২০
যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামী কালিগঞ্জের আকবর মাওলানা ছেলেসহ গ্রেপ্তার

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে এলাকায় এসে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামী সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ইন্দ্রনগর গ্রামের আকবর মাওলানা ও তার ছেলে মহিবুল্লাহকে আবারো গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাত  সাড়ে ৮টার দিকে তাদেরকে বাড়ি  থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, মাওলানা শেখ আকবর আলী(৭৫) কালিগঞ্জের নলতা ইউনিয়নের ইন্দ্রনগর গ্রামের শেখ জবেদ আলীর ছেলে। তার ছেলের নাম মহিবুল্লাহ শেখ (৪৬)।

নলতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন জানান, কালিগঞ্জের ইন্দ্রনগরের শেখ জবেদ আলীর ছেলে শেখ আকবর আলী দীর্ঘদিন ইন্দ্রনগর -হুসাইনাবাদ ছিদ্দিকিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপালনকালে তার বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম ও দূণীতির অভিযোগ ওঠে। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগে নিজেরই আত্মীয় দেবহাটার জগন্নাথপুরের রহমতুল্লাহ মোড়লকে ১৯৭১ সালের ২৫ সেপ্টেস্বর (৭ আশ্বিন, মঙ্গলবার) নলতা হাটে গুলি করেন আকবর মাওলানা। পরদিন সকালে তিনি মারা যান। কালিগঞ্জের ঈশ্বরদি গ্রামের আটা বিক্রেতা মাদার গাজীকে গুলি করে হত্য, পূর্ব নলতার খোকন মোড়লের বাবা আব্দুর রহমান ওরফে মেদু মোড়লকে গুলি করে তার হাত পঙ্গু করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে আকবর মাওলানা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

১৯৭১ সালের ৬ মে দুপুর ১২টার দিকে ইন্দ্রনগর মাদ্রাসার রাজাকার ক্যাম্প থেকে আকবর মাওলানার নেতৃত্বে জগন্নাথপুর ঘোষপাড়ায় নরেন্দ্রনাথ ঘোষকে গুলি করে লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর তারা মাধব ঘোষ, শরৎ চন্দ্র ঘোষ, গোপীনাথ ঘোষ, হেমনাথ ঘোষ ও পাশের বাড়িতে বেড়াতে আসা বৈকারীর ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস ওরফে সাবু মাষ্টারকে নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করেন আকবর আলী ও তার সহযোগীরা। লাশ ফেলে দেওয়া হয় পুকুরে। নরেন্দ্রনাথ ঘোষের অন্ত্বঃস্বত্বা স্ত্রী বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে বাধা দেওয়ায় তাকেও নির্যাতন করা হয়।

আবুল হোসেন আরো জানান, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে আকবর মাওলানা আত্মগোপন করেন। এ সময় তিনি তার বেতন যথারীতি তুলেছেন। ২০১৩ সালে জামায়াত- বিএনপি’র সরকার বিরোধী নাশকতা চালানোর সময় আকবর মাওলানা আবারো প্রকাশ্যে আসেন। নাশকতা, হত্যা ও সরকারি বিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগে আকবর মাওলানার বিরুদ্ধে ইন্দ্রনগরের সাংবাদিক আহাদ হোসেন বাদি হয়ে ১৭/১৪(কালিঃ), একই এলাকার আব্দুস সবুর বাদি হয়ে ১৮/১৪ ও সিরাজুল ইসলাম বাদি হয়ে ১৯/১৪ মামলা করে। এ ছাড়া আকবর মাওলানার বিরুদ্ধে হত্যা, নাশকতাসহ কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা সদর ও দেবহাটা থানায় কমপক্ষে ৫০টি মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি আকবর মাওলানা ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরেন। এর পর শুক্রবার সকালে জামায়াত নেতা আব্দুল্লার মালিকানাধীন নলতা হাটখোলার শাহী বস্ত্রালয়ে বসে জামায়াতের নেতা কর্মীদের সঙ্গে বিশেষ আলোচনা শেষে ইন্দ্রনগর হুসাইনাবাদ জামে মসজিদে নামাজ আদায় করেন। বাদ আছর ইন্দ্রনগর মাঠের মসজিদে যান। সেখানেও বিশেষ আলোচনা সারেন তার সতীর্থদের সাথে। তিনি বিভিন্ন হাটে ও বাজারে যেয়ে জামাতের দলীয় কার্যক্রম মজবুত করছেন।

দেবহাটা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের মৃত রহমতুল্লাহ মোড়লের ছেলে গোলাম মোস্তফা জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর (বাংলা ৭ আশ্বিন মঙ্গলবার) বিকেল চারটার দিকে তাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবা রহমতুল্লাহ মোড়ল নলতা হাটে যান। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা আনছারুল মাহমুদ নলতা হাটে সাতক্ষীরা - কালিগঞ্জ সড়কে চলমান একটি বাসে পাকিস্থানি সেনা সন্দেহে গ্রেনেড ছোঁড়েন। এতে কেউ হতাহত না হলেও আকবর মাওলানা ও আব্দুল হামিদ খানসহ কয়েকজন বিকেল ৫টার দিকে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে নলতা হাট আক্রমণ করে।

এ সময় কালিগঞ্জ উপজেলার ঈশ্বরদি গ্রামের আটা বিক্রেতা মাদার গাজীকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগে গুলি করে হত্যা করেন শেখ আকবর আলী । সেখান থেকে খাটিয়ায় করে বাবার লাশ বাড়িতে আনেন তিনি। সুবিধাজনক পরিবেশ না পাওয়ায় দীর্ঘ ৩৮ বছর যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি ২০০৯ সালে শেখ আকবর আলীর বিরুদ্ধে মামলা (জিআর -৯২/২০০৯ কালিঃ) দায়ের করেন। যাহা বর্তমানে আইসিটি(বিডি)০৭/১৯। ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে তদন্ত শুরু হয়ে ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর শেষ হয়। ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর যুদ্ধাপরাধী মামলায় (০৭/১৯) কলারোয়ার জামাতার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন। ওই মামলার অপর আসামী ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পূর্ব নলতা গ্রামের আব্দুল হামিদ খানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গোলাম মোস্তফা আরো বলেন, আকবর আলীর বিরুদ্ধে মামলা করায় দেবহাটা উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডার আব্দুল গণি খুশী হলেও পরবর্তীতে আকবর মাওলানার মেয়ের সঙ্গে আব্দুল গণির ছোট ছেলে কাইয়ুমের সঙ্গে বিয়ে হওয়ায় তিনি মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে চাপ দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে কৌশলে সাতক্ষীরা কোর্টে ডেকে নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য এফিডেফিটে সাক্ষর করতে বলায় তিনি পালিয়ে চলে আসেন। এ কারণে আব্দুল গণির সঙ্গে হাসনাবাদে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংএ গেলেও তার কাগজপত্র আর আলোর মুখ দেখতে দেননি আব্দুল গণি।

এদিকে সাতক্ষীরা আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর কলারোয়া উপজেলার ব্রজবক্স গ্রামের জামাতার বাড়ি থেকে শেখ আকবর আলীকে গ্রেপ্তার করে আইনপ্রয়োগকারি সংস্থার সদস্যরা। জেলখানায়(হাজতী ৭৫৫/২১) স্পন্ডিলাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ২৭ জুলাই থেকে ওই বছরের ২২ আগষ্ট সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার কাগজপত্র দেখিয়ে ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর শেখ আকবর আলীর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্রুনালে জামিন আবেদন করেন(০১/২২) আইনজীবী অ্যাড. মুজাহিদুল ইসলাম।

চলতি বছরের ২৪ মার্চ জামিন শুনানীকালে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ব্যারিষ্টার রিজিয়া সুলতানা বেগম তার জামিনের বিরোধিতা করেন। অবশেষে আকবর আলীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিচারপতি মোঃ শাহীনুর ইসলাম, বিচারপতি মোঃ আবু আহম্মেদ জমাদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল ইসলাম তাকে জামিন দেন। জামিনদার হিসেবে ভাইপো ঢাকা মীরপুরের মোঃ কাঞ্চনের বাসায় থেকে অন্যত্র যাওয়া চলবে না, আসামী বা তাদের আত্মীয় স্বজন ইলেকট্রনিকস মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে কথা বলতে পারবে না, বাদি বা কোন সাক্ষীকে প্রভাবিত করতে পারবে না, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামিনদারের সাথে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে হওয়া সহ জামিনে পাঁচটি শর্ত আরোপ করা হয়।

সূত্রটি আরো জানায়, ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর সকালে তারালী ব্রীজের পাশে রাস্তার উপর গুড়ি ফেলে ও নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে কালিগঞ্জের জাফরপুরের আনছার আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন বাদি হয়ে আকবর আলী ও তার ছেলে মামুন বিল্লাহসহ ২৯জনের নাম উল্লেখ করে ওই দিনই থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে জিআর-২৯৯/১৩ মামলা করেন। বাবা ও ছেলেসহ ৩২ জনের নামে অভিযোগপত্র দাখিলের পর যাহা বর্তমানে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-২ আদালতে বিচিারাধীন (এসটিসি-৬২/১৫)। ১৬ নভেম্বর জামিন পান আকবর আলী। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি অভিযোগ গঠণের দিন অন্য মামলায় জেলে থাকায় সময়ের আবেদন জানালে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২১ সালের ১০ এপ্রিল অ্যাড. আশরাফুজ্জামান ও অ্যাড. মিজানুর রহমান পিন্টুর জামিন আবেদন শুনানীকালে বিরোধিতা করেন অতিরিক্ত পিপি অ্যাড. ফাহিমুল হক কিসলু। ওই দিন বিকেলে আকবর আলীর চিকিৎসার কাগজপত্র ও যুদ্ধাপরাধ মামলার জামিনের কাগজপত্র যাঁচাই করার পর তাকে ধার্য দিন ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা বণ্ডে অন্তবর্তীকালিন জামিন দেন বিচারক বিশ্বনাথ মণ্ডল। ইন্দ্রনগর গ্রামের এশারত আলী শেখের ছেলে ইউনুস শেখ জামিনদার হিসেবে সাক্ষর করেন।

অপরদিকে ২০২১ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি কালিগঞ্জ থানার জিআর- ৩৩০/১৩ ও টিআর-৪৮০/১৫ নং বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় জামিন পান শেখ আকবর আলী। ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল ওই মামলায় পিডব্লিউ লাগানো হয়। ১০ এপ্রিল তা প্রত্যাহারের পরদিন জেল থেকে মুক্তি পান আকবর আলী।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুন রহমান জানান, যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী আকবর মাওলানা ও তার ছেলে মহিবুল্লাহকে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর দক্ষিশণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে উপপরিদর্শক আশিষ কুমারের দায়েরকৃত ১৪ নং নাশকতার প্রস্তুতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মোর্শেদ তাদেরকে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেন।

(আরকে/এসপি/এপ্রিল ০১, ২০২৩)

পাঠকের মতামত:

১৮ মে ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test