E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

সিলেটে সিআইডির ওপর হামলা মামলা

এ কেমন চার্জশিট দিলেন জৈন্তাপুর থানা পুলিশ

২০২৪ মে ২৮ ১৭:৪৯:৪০
এ কেমন চার্জশিট দিলেন জৈন্তাপুর থানা পুলিশ

রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরে সিলেটে চোরাচালান ও মাদক বিরোধী অভিযান চলাকালীন সিআইডি পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় চোরাকারবারিদের একটি দল। ওই হামলায় সিলেট সিআইডি পুলিশের ৫ জন সদস্যকে আহত করে হাতকড়াসহ ধলাই মিয়া (১৯) নামে এক আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় ওই দুর্বৃত্তরা। ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর ভোর সাড়ে ৪টায় দিকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় এমন ঘটনা ঘটে।

ওই ঘটনায় সিআইডি পুলিশ বাদি হয়ে মোট ৭ জন চোরাকারবারি'র নাম উল্লেখ করে এবং ৮০/৯০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে জৈন্তাপুর থানায় দুটি মামলা করা হয়। যা জৈন্তাপুর থানা পুলিশ সিআইডিকে হস্তান্তর না করে নিজেরাই তদন্তের দায়িত্ব দেন।

সিআইডি পুলিশের করা ওই মামলায় ৭ জনের নাম উল্লেখ সহ প্রায় ৯০ জনকে আসামি করা হলেও চার্জশিটে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ প্রধান আসামিদের নাম বাদ দিয়ে মাত্র ৩ জন আসামির নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছেন।

এমন ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে জৈন্তাপুর সহ পুরা সিলেট জুড়ে। স্থানীয়রা মজার ছলে প্রশ্ন তুলেছেন, মাত্র ৩ জন বুঙ্গা (চোরাকারবারি) মিলে ৫/৬ জন ট্রেনিংপ্রাপ্ত সিআইডি পুলিশকে মেরে একজন আসামিকে হাতকড়া ছিনিয়ে নিতে পারে?

মামলা দুটি'র তদন্তভার গ্রহণের পর থেকে এই মামলা দুটি নিয়ে নানা তাল-বাহানা করে জৈন্তাপুর থানা পুলিশ। মামলাগুলোর তদন্তে ধীরগতি, কোন আসামিকে গ্রেফতার না করা (যদিও তদন্ত চলাকালীন জৈন্তাপুর বাজারে ওসির সাথে আসামি আবুল হোসেন সহ ৩ জনকে চা খেতে ও তাদের কথা বলতে দেখা গেছে; অথচ তখন তারা বলছিল আসামিরা সবাই পলাতক), গ্রেফতারকৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোর্টের কাছে রিমার্ড না চাওয়া, তদন্ত চলাকালীন আসামিদের সাথে সক্ষতা গড়ে তাদের একেক জনের নাম কাটাতে ৫ লক্ষ টাকা করে দাবি করা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) একজন আসামি তা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। যদিও তিনি পরে পুলিশ কোন টাকা দেননি এবং বর্তমানে চার্জশিটের তিন জনের তিনিও একজন), অবশেষে ঘটনার প্রায় ৭ মাস পর চার্জশিট দিলেও তাতে প্রধান আসামিদের নাম বাদ দিয়ে মাত্র ৩ জনের নামে আদাতলে চার্জশিট দাখিল ইত্যাদি নানা অভিযোগ উঠেছে জৈন্তাপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় এক সূত্র বলছে, শুধুমাত্র আসামি আবুল হোসেনকে চারশিট থেকে নাম কাটতে এই মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা আশরাফুল ও ওসি তাজুল ইসলাম মিলে ১০ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জৈন্তাপুর বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এই মামলা থেকে রুবেল মেম্বার ও হেলাল মিয়া'র নাম কাটতে পুলিশ নিয়েছেন ৫ লাখ টাকা।

এর আগে, এই চোরাকারবারিদের দিয়ে সিআইডি পুলিশের ওপর এমন নেক্কারজনক হামলাটি জৈন্তাপুর থানার ওসি করিয়ে থাকতে পারেন বলে ওই সময় উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারা যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, উক্ত চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের জৈন্তাপুরে এতো দৌরাত্ম্য শুধুই জৈন্তাপুর থানার সাপোর্টের কারণে। স্থানীয়রা বলেছিলেন জৈন্তাপুরের পুলিশকে ম্যানেজ করেই এরা তাদের কারবারি করে থাকেন। তাছাড়া থানাকে অবহিত না করে সিআইডি পুলিশের এমন অভিযানে ক্ষিপ্ত ছিলেন ওসি তাজুল বলেও জানিয়েছিলেন তারা। তাই, তার নির্দেশনায় এমনটি হয়েছে বলে তারা মনে করেন। যদিও জৈন্তাপুর থানার ওসি ওই সময় উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

উল্লেখ্য, সিআইডি পুলিশের উপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনাস্থল থেকে একটি ভারতীয় চা পাতা ভর্তি ডিআই পিকআপ গাড়িসহ আজগর আলী (৩৫) নামক একজনকে আটক করেছিলেন সিলেটের সিআইডি পুলিশ।

সিলেট সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে চৌকি বসিয়ে তল্লাশি চালান সিলেট সিআইডি পুলিশ।

অভিযানকালে পুলিশ একটি ডিআই ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালালে গাড়ি চালক চোরাই মালামাল বহনের কথা স্বীকার করেন। সিআইডি মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, চালক ধলাই মিয়া (১৯)কে হাতকড়া পরিয়ে গাড়ি তল্লাশির চেষ্টাকালে কয়েকটি ডিআই পিকআপ ও একটি নোহা মাইক্রোবাসে ৮০/৯০ জনের মাদক চোরাকারবারি দলের সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কর্তব্যরত ওই সিআইডি পুলিশ সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। পরে তারা হাতকড়াসহ চালক ধলাই মিয়াকে ছিনিয়ে নেয়। তাদের হামলায় সিআইডি পুলিশের দুই কর্মকর্তা আরো ৩/৪ জন সিআইডি পুলিশ সদস্য আহত হন মর্মেও নিশ্চিত করেছিল পুলিশ।

উক্ত অভিযানে একটি ডিআই পিকআপ তল্লাশি চালিয়ে ১৪ বস্তা ভারতীয় চা-পাতা জব্দ করা হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ২ লাখ হাজার টাকা। অভিযানকালে চা পাতার বৈধ কোনো কাগজপত্র প্রদর্শন করতে না পারায় আজগর আলী (৩৫) নামে পিকআপ চালককে আটক করা হয়।

ঘটনার চার মাস পর সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি সুজ্ঞান চাকমা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানিয়েছিলেন, 'জৈন্তাপুর থানা পুলিশ কেন কোন আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। হয়তো তারা সব আসামি'র তথ্য নিতে পারেননি তাই দেরি করছেন। তবে, মামলার চার মাস পেরিয়ে গেলেও চার্জশিট না হওয়াটা অস্বাভাবিক।’

তিনি আরও বলেন, 'সিআইডি পুলিশের করা ওই মামলা দু'টির একজন গুরুত্বপূর্ণ আসামি কোর্টে আত্নসমর্পণ করে জামিন চাইলে, আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন। জৈন্তাপুর থানা পুলিশ (সিআইডি পুলিশের উপর হামলা করা) ওই গুরত্বপূর্ণ আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিলো, কিন্তু তারা তা করেননি। যা হতাশাজনক।’

এ বিষয়ে জানতে মামলা দু'টির বর্তমান তদন্ত কর্মকতা ও জৈন্তাপুর থানার উপ-পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানিয়েছিলেন, মামলাগুলোর চার্জশিট দিতে দেরি হওয়ার কারণ বলা মুশকিল! তবে, আমি মামলার পরিবর্তিত তদন্ত কর্মকতা। এর আগে মামলা দু'টি অন্য আরেকজন অফিসার দেখেছেন। এখন মামলার আসামী শনাক্ত ও ঠিকানা যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে।' এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা আশরাফুল তখন জানান, 'কখন তদন্তের কাজ শেষ হবে বা কবে চার্জশিট জমা দিতে পারবো, সেটি বলা কঠিন। তবে, আমার কাজ শেষ হলেই আমি রিপোর্ট জমা দিয়ে দিবো।'

মামলার এক আসামিকে মামলার চার্জশিট থেকে অব্যহতি দিতে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই আশরাফুল তা অস্বীকার করেন।

ঘটনার এক মাস পর সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শেখ মো. সেলিম উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানিয়েছিলেন, 'নানা ঝামেলার কারণে হয়তো সিআইডির মামলাগুলোর কোন আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি থানা পুলিশ। তবে হামলার সময় দুর্বৃত্তরা সিআইডির যে একজোড়া হাতকড়া ছিনিয়ে নিয়েছিল তা উদ্ধার করেছে পুলিশ।'

এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মো. সেলিম তখন জানান, 'এক মাসে একজোড়া হাত কড়া উদ্ধার করেছে, সেটিই বা কম কি, এটার জন্য ধন্যবাদ দেয়া উচিত পুলিশকে।' আরেক প্রশ্নের জবাবে সেলিম বলেছিলেন, 'আমরা সব মামলাই গুরুত্বের সহিত দেখি।'

ঘটনার চার মাস পরে সিআইডি পুলিশের এই মামলার অগ্রগতি বিষয়ে সিলেট সিআইডি'র সাথে কথা হয় বলেন উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের এই প্রতিবেদক।

সিআইডি পুলিশের ওপর এমন নেক্কারজনক হামলা, আসামিদের কর্তৃক হাতকড়াসহ এক আসামি ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা, সিআইডি কতৃক একাধিক মামলা হওয়ার এতো সময় পেরিয়ে গেলেও কেন জৈন্তাপুর থানা পুলিশ কোন আসামী গ্রেফতার করতে পারেনি? এমন এক প্রশ্নের জবাবে সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি সুজ্ঞান চাকমা উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানিয়েছিলেন, ‘জৈন্তাপুর থানা কেন কোন আসামী গ্রেফতার করতে পারেনি সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এতোদিনেও একটি আসামি গ্রেফতার না হওয়া দুঃখজনক ও হতাশাজনক।’ এটি সিআইডি পুলিশের জন্য দুর্ভাগ্যই বলেও মন্তব্য করেন সুজ্ঞান চাকমা।

আজ মঙ্গলবার ওই মামলার তদন্ত কারী কর্মকর্তা জৈন্তাপুর থানার উপপরিদর্শক আশরাফুল মুঠোফোনে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, ‘আমি মামলার চার্জশিট দিয়ে দিয়েছি'। উপরোক্ত বিষয় গুলো সম্পর্কে জানতে প্রশ্ন করলে, তিনি একবার বলেন আমি নির্বাচনের টিউটিতে আছি ভাই'। আরেকবার বলেন, 'আমি গাড়িতে আছি ভাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিলেট সিআইডি'র এক কর্মকর্তা দুঃখ প্রকাশ করে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, ‘আমরা এমন চার্জশিট জৈন্তাপুর থানা পুলিশ থেকে আশা করিনি।’

এদিকে, এসব বিষয়ে জানতে জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তাজুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

(আরআর/এসপি/মে ২৮, ২০২৪)

পাঠকের মতামত:

১৪ জুন ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test