E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে শরীয়তপুরের এসডিএস

২০১৪ জুন ০২ ১৫:৩৭:৫৩
লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে শরীয়তপুরের এসডিএস

শরীয়তপুর প্রতিনিধি : শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি বা এসডিএস নামে জেলার শীর্ষ স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে অসহায় মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। দরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নামে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করে চলেছে সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্প্রতি জেলার গোসাইরহাট উপজেলায় পরিচালিত দুইটি প্রকল্পে গিয়ে দেখা গেছে অসহায় গরীব মানুষের সাথে প্রতারনার এক ভয়াবহ চিত্র।

১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠার পর বর্তমানে শরীয়তপুর জেলাসহ আরও কয়েকটি জেলায় কাজ করছে এসডিএস। বর্তমানে দেশি ও বিদেশী সহায়তায় ৮ থেকে ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এই সংস্থাটি। নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় আইসিসিডি এর অর্থায়নে গার্ল পাওয়ার প্রকল্প (জিপিপি), ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ন্যাদারল্যান্ডের সহায়তায় প্রমোটিং কমিউনিটি বেসড ওয়াটার স্যানিটেশন এন্ড হাইজিন প্রমোশন বা ওয়াটসান প্রকল্প , ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তায় ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন এন্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ এ্যাডাপটেশন (ডিআরআর এন্ড সিসিএ) প্রকল্প, অক্সফ্যাম নভিব এর সহায়তায় ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব আল্ট্রা পুওর (কাপ) প্রকল্প ও রিজল্ভ প্রকল্প, বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এর আর্থিক সহায়তায় ক্ষুদ্র ঋণ ও এনরিজ নামক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এসডিএস।
জেলার দুর্গম চরাঞ্চলেই এসডিএস এর বেশীরভাগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জেলার সর্ব দক্ষিনে অবস্থিত বরিশাল, চাঁদপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলার সীমানায় মেঘনা নদীর তীর ঘেষা গোসাইরহাটের চরাঞ্চলে অক্সফ্যাম নভিব এর আর্থিক সহায়তায় এসডিএস কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে দুইটি প্রকল্প। এর মধ্যে ২০০৭ সাল থেকে Capacity Building of Ultra Poor বা (কাপ) প্রকল্প এবং ২০১০ সাল থেকে বাস্তবায়ন করছে Regenerative Agriculture and Sustainable Livelyhood for Vulnarable Ecosystem বা রিজলভ প্রকল্প। এই প্রকল্প দুটির অধীনে অন্তত ১ হাজার ৫ শত জন দরিদ্র উপকারভোগি সদস্য রয়েছে। প্রকল্প দুটির মাধ্যমে পিছিয়ে পরা হতদরিদ জনগোষ্ঠির ভাগ্য উন্নয়নে তথাকথিত সচেতনামূলক কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে খাপ খাওয়ানো কৃষি ব্যবস্থা বাস্তবায়নে কাজ করার কথা। দরিদ্র লোকদের হাঁস, মুরগী, বকনা বাছুর, কৃষি বীজ, জেলেদের মাছধরার জাল সরবরাহ সহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে আয়বর্ধক কাজে আর্থিক সহায়তা ও ঋণ প্রদানও করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সব কিছুতেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি।
উপকারভোগী প্রতারিত লোকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর এসডিএস এর ওই দুটি প্রকল্পের কর্ম এলাকা গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর, আলাওলপুর, কুচাইপট্টি ও নলমুরি ইউনিয়নের ছৈয়াল পাড়া, মোল্যা কান্দি, ঢালী কান্দি, মৃধাপাড়া, মধ্য বসকাঠি, পাজাল কান্দি, চরজানপুর, দাইমিরচর, আবুপুর, পাঁচকাঠি, কোলচুরি, চরমনপুরা, খুনেরচর ও চরভূয়াই গ্রামে সরেজমিন পরিদর্শ করে জানা যায় এসডিএস এর দূর্নীতির সাতকাহন। বিশেষ করে রিজলভ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের আঁকাশ ছোঁয়া দূর্নীতি ধরা পরে এই পরিদর্শনে। প্রকল্প কার্যালয়ে বার বার ধর্না দিয়েও প্রকল্পের বাজেট সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে দাতা সংস্থা অক্সফ্যাম নভিবের সহায়তায় পরিচালিত রিজলভ প্রকল্পটি তার তিন বছর মেয়াদ পার করে নতুন করে লাইফ নামে একটি প্রকল্প নিয়ে পাইলটিং শুরু করেছে। আর কাপ প্রকল্প তার তৃতীয় মেয়াদ শেষ করে চতুর্থ মেয়াদের জন্য নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
উপকারভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৩ সালে রিজলভ প্রকল্প থেকে ১ শত ৮০ জন উপকারভোগিকে বসত ভিটা উঁচু করনের জন্য প্রত্যেককে ১২ হাজার করে টাকা দেয়ার কথা থাকলেও ৫-৬ হাজার টাকার বেশী টাকা কাউকেই দেয়া হয়নি। এমনকি শেষ মেয়াদে ৪০ নামে টাকা বরাদ্দ হলেও তাদের একজনকেও ভিটা উচু করে দেয়া হয়েছে বলে প্রমান পাওয়া যায়নি। বছরব্যাপী ৭০ জনকে সবজি চাষ করার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদানের কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে দেড় হাজার করে টাকা। ৬১ জনকে বীনা সুদে ঋন বিতনের কথা থাকলেও ৪০ জনের মধ্যে ঋন বিতরন করে কাগজে-কলমে ৬১ জনকেই দেখানো হয়েছে। বাকি ২১ জনের নামে ঋণ বিতরনের তালিকা থাকলেও তাদের হাতে ঋনের টাকা পৌছায়নি। অথচ প্রকল্প কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে ওই ২১ দরিদ্র নর-নারীদের ঋণ প্রদানের রেজিষ্টার হাল নাগাদ রেখেছেন। এর বাইরেও প্রতিটি বিষয়ে ধার্যকৃত অর্থের তিন চতুর্থাংশ টাকাই চুরি করে নিচ্ছে সংস্থাটি।
রিজলভ প্রকল্পের উপকারভোগী চরমনপুরা গ্রামের আক্কাস আলী বেপারী বলেন, আমাকে এসডিএস কৃষি কাজ করার জন্য ডেমো প্লট করে দিয়ে মাত্র ১ হাজার টাকা দিয়েছে। ১২ হাজার টাকার মাটি কাটার কথা বলে মাত্র ৮ হাজার টাকার মাটি দিয়েছে।
খুনের চরগ্রামের হাবিবুর রহমান সিপাহি বলেন, আমার পরিবারের ৬ সদস্যের নামে এসডিএস ৬টি কৃষি ডেমো প্লট দিয়ে মাত্র আড়াই হাজার টাকা দিয়েছে। শুনেছি একেকটা ডেমো প্লটে অনেক বেশী টাকা বরাদ্দ ছিল।
রিজলভ প্রকল্পের একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, পাঁচকাঠি গ্রামের রিনা বেগম, চরভুয়াই গ্রামের বিধবা কুলসুমা বেগম, সেলিনা আক্তার ও স্বামী পরিত্যাক্তা কামরুন্নাহার অন্তত সহ ২০ হতদরিদ্র নারীর নামে ২০১৩ সালের ৩ আগষ্ট ও ২ ডিসেম্বর তারিখে তাদের প্রত্যেকের নামে ১০ হাজার টাকা করে ঋণ দেয়া হয়েছে এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত সেই ঋনের কিছুটা পরিশোধ করা হয়েছে আবার কিছুটা স্থিতি রয়েছে। কিন্তু ওই সকল ঋণ গ্রহিতাদের সাথে কথা বললে তারা জানান, তাদেরকে ২০১৩ সালে কোন ঋণ দেয়া হয়নি। তাদের তালিকা করে সই স্বাক্ষর সব কিছুই নেয়া হয়েছে কিন্তু ঋণ সরবরাহ করা হয়নি।
কাপ প্রকল্পের কোদালপুর মৃধাপাড়া গ্রামের হাসনা হেনা দলের সভাপতি কল্পনা বেগম বলেন, আমার বাড়ির আঙ্গিনা উচু করার জন্য আমাকে ৫ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। আমি আর এক হাজার টাকা বেশী চাইলে প্রকল্পের ম্যানেজার ফেরদৌসী আপা আমাকে ধমক দিয়ে বলেন আর এক টাকাও পাবেননা। বাড়াবাড়ি করলে এই ৫ হাজার টাকাও দেয়া হবেনা।
দরিদ্র লোকদের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে রিজলভ প্রকল্পের সমন্বয়কারী নুরজাহান বেগম বলেন, আপনাদের আমি প্রকল্পের কোন হিসেব দিতে বাধ্য নই। সংস্থার নিয়মের মধ্যে থেকেই সব কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
অপরদিকে কাপ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমি মাঠ পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নে সরাসরি সম্পৃক্ত নই। কর্মীরা কোথাও ভুল করে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
কাপ প্রকল্পের সাবেক ব্যবস্থাপক তপন কান্তি দে জানান, ২০০৭ সালে কাপ প্রকল্প শুরু হলে আমি এর ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করি। ২০০৭ সালের বন্যা ও প্রলয়ংকরী ঘূর্নিঝড় সিডরে কর্ম এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য অন্তত ৬ কোটি টাকার পূনর্বাসন সহায়তা প্রদান করে অক্সফ্যাম। প্রকল্প প্রধান হিসেবে পূনর্বাসনের যাবতীয় বাজেট ও খরচ আমার করার কথা ছিল। কিন্তু আমার হাত দিয়ে একটি টাকাও আমি খরচ করার সুযোগ পাইনি। এসডিএস প্রধান কার্যালয় থেকে তাদের নিজেদের মত পরিকল্পরা করে খরচ করেছে। সংস্থার নির্দেশ মতে আমি শুধু কাজ বাস্তবায়নের প্রতিবেদন জমা দিয়েছি দাতা সংস্থার কাছে।
এসডিএস এর প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা মো. ইয়াসিন খানের কাছ থেকে উল্লেখিত দুইটি প্রকল্পের বাজেট জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। প্রকল্প দুটির অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও মন্তব্য করেন।
একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, এসডিএস শরীয়তপুর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দামী উপঢৌকন ও মোটা অংকের উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে এবং জেলার কিছু সাংবাদিকদের নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে এবং বিদেশ ভ্রমনের সুযোগ দিয়ে সকল অপকর্মকে জায়েজ করে চলেছে। অধিকতর তদন্ত করলে এসডিএস এর সকল প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য বেড়িয়ে আসবে।
(কেএনই/এএস/জুন ০২, ২০১৪)








পাঠকের মতামত:

১৭ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test