E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

বান্দরবানে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

২০১৭ এপ্রিল ২৭ ২২:১২:৩২
বান্দরবানে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

আল ফয়সাল বিকাশ, বান্দরবান : প্রকৃতির উপর মানুষের নির্মম, নিষ্ঠুর ও নির্দয় হস্তক্ষেপ এবং বিরূপ প্রভাবের কারণে ঝিরি ঝরণার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে পার্বত্য বান্দরবানে। অপরিকল্পিত জুম চাষ, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও ঝিরি-ঝরণা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন পানি সংকটের মুল কারণ। ফলে একদিকে বির্পযস্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়ী বিশাল জনগোষ্ঠি অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অর্থবরাদ্দ না থাকার কারণে আলীকদম উপজেলা সদরসহ ৩ উপজেলার জনবহুল এলাকায় পানি সরবরাহ প্রকল্প চালুর অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

পৃথিবী সৃষ্টির আদি থেকেই মানুষের ভোগ-বিলাসিতার বলি হয়ে আসছে নির্মল সবুজ প্রকৃতি। পাহাড়ীদের বাৎসরিক খাদ্য সংস্থান করতে গিয়ে প্রতিবছর শত শত পাহাড়ে অপরিকল্পিত ভাবে জুম চাষ করা হয়। জুম চাষের ফলে একদিকে পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যায় অন্যদিকে মাটি ক্ষয় হয়। এতে ভু উপরিভাগ উষ্ণতার ফলে ভু গর্ভস্থ পানির লেয়ার নীচে নেমে যায়।

এছাড়াও মানুষের বিলাসিতার প্রয়োজনে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন এবং ঝিরি-ঝরণা থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন পানি সংকটের অন্যতম আরেকটি কারণ। ঝিরিতে পাথর না থাকায় এবং পাহাড়ে পর্যাপ্ত গাছ না থাকার কারণে পানির উৎসস্থল ধংস হয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছে পাহাড়ে বসবাসরত কয়েক লক্ষ মানুষ। পাহাড়ে ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পানি সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশী থাকে। এ সময় বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে পাহাড়ীদের জীবন যাত্রা বির্পযস্ত হয়ে পড়ে। তারা পাড়া বা মহল্লা থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঝিরি-ঝরণার পাশে ছোট ছোট পাত কুয়া সৃষ্টি করে পানি সংগ্রহ করতে হয়। রোয়াংছড়ি উপজেলার সি অং খুমি জানান, রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নে সাংকিং পাড়া, অংটং পাড়াসহ মোট ৫টি খুমি পাড়া রয়েছে। পাড়ার পাশ্ববর্তী ঝিরির পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে পড়েছেন তারা।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক সাংকিং পাড়া সফরে গেলে এলাকার শত শত মানুষ পানির দাবী তোলেন। পাহাড়ে পানি সংকটের এই চিত্র কয়েকশ পাড়ায় বিরাজমান। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে জিএফএস’র দ্বারা যেসব পাড়ায় পানি সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়েছে সেসব পাড়ায় এই প্রকল্পটি চালু রয়েছে। তবে দুর্গমত্তার কারণে জিএফএস সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে অসংখ্য পাড়ার মানুষ।

এদিকে গত ৬ বছর ধরে আলীকদম পানি শোধনাগার প্রকল্প চালু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে আলীকদম উপজেলা সদরের ৩০ হাজার মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকটে রয়েছে। পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১১ সালে কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ইতিমধ্যে ৭০ ভাগ কাজ শেষ হলেও অর্থ বরাদ্দ না থাকার কারণে পানি সরবরাহ দিতে পারেনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। ফলে উপজেলার অসংখ্য নারী-পুরুষকে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

আলীকদম প্রেস ক্লাবের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৬ বছর আগে ১ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাজ শুরু করা হয়। মাঝপথে বরাদ্দ না থাকার কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

এ প্রসঙ্গে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, আলীকদম পানি সরবরাহ প্রকল্পের জন্য ৬ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকার প্রকল্পসহ নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানছি সদরে পানি সরবরাহ প্রকল্পের জন্য মোট ২১ কোটি টাকার ৩টি প্রকল্প সরকারের উচ্চ মহলে চুড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বরাদ্দ আসলেই বাকী কাজ শুরু করা হবে। তিনি আরো জানান, ২০০৯ সালে জেলায় পানির কাভারেজ ছিল ৩১ পার্সেন্ট যা জুন ২০১৬ এসে ৪৯ পার্সেন্টে এসে দাড়িয়েছি। মাষ্টার প্ল্যান অনুযায়ী ৫শত ৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দাখিল করা হয়েছে ২০৫০ সালকে র্টার্গেট করে। যা পরিকল্পনা কমিশনে গেলে ২০২১ সালের মধ্যে সরকারের ভিশন ২০২১ সাকসেস হবে এবং শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এই প্রকৌশলী।

সম্প্রতি সরকারী এক সফরে গিয়ে আলীকদম পানি সরবরাহ প্রকল্প চালুর বিষয় নিয়ে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি বলেন, ইতিমধ্যেই অর্ধেকের মতো কাজ হয়ে গেছে, বাকী কাজ এবছরের মধ্যে শুরু হয়ে যাবে। আগামী বছরের প্রথম দিকে পানি সরবরাহ প্রকল্পটি চালু করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নির্মল প্রকৃতির উপর মানুষের নগ্ন থাবা বন্ধ করতে পারলে এবং পাহাড়ে পানির উৎসস্থল ধ্বংস যাতে না হয় সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা গেলে নতুন করে পাহাড় তার আগের প্রাণ ফিরে পাবে এমন প্রত্যাশা সকলের।

(এএফবি/এএস/এপ্রিল ২৭, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

২২ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test