E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

‘নীতি বর্জনে’ ড. কামালের সঙ্গ ত্যাগ এক নেতার

২০১৮ ডিসেম্বর ০৬ ১৩:০২:০৪
‘নীতি বর্জনে’ ড. কামালের সঙ্গ ত্যাগ এক নেতার

স্টাফ রিপোর্টার : ড. কামাল হোসেন তার নীতি ও আদর্শের পথে নেই জানিয়ে তার সঙ্গ ছেড়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া একজন নেতা। বিশেষ করে, বিএনপির প্রতীক ধানের শীষে ভোট করার সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের একই প্রতীকে ভোট করার সিদ্ধান্ত তিনি মানতে পারছেন না।

ড. কামাল হোসেন বরাবর ঐক্যের কথা বলেন। আর এ বিষয়ে তার একটি উদ্যোগ ছিল জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া নামে। আ ব ম মোস্তফা আমিন নামের একজন ছিলেন এর সদস্যসচিব।

মোস্তফা আমিন বলেন, ‘আমি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে আর নাই। কারণ আমি নীতি-আদর্শ বর্জন করে রাজনীতি করতে পারব না। আমি ড. কামাল হোসেনকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছি এবং সরাসরি তাকে আমার অবস্থান জানিয়েছি। আমি ওনাকে বলেছি, উনি এখন যে রাজনীতি করছেন সেই রাজনীতি আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়।’

মোস্তফা আমিন ফরোয়ার্ড পার্টি নামে একটি দলের চেয়ারম্যান। রাজনীতি করছেন মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই। তবে কখনো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। সে উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর ভেড়েন ড. কামালের সঙ্গে।

গণফোরামের সভাপতি এবং ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতার প্রতি কেন আপত্তি সেটাও মোস্তফা আমিন বলেছেন। জানান, তার আপত্তির বিষয়ে ড. কামালের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু সন্তোষজনক জবাব পাননি। এর পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার সঙ্গে আর নয়।

মোস্তফা আমিন বলেন, ‘৪৭ বছর যারা দেশ শাসন করছে তাদের বিপক্ষে আমাদের অবস্থান, এখন যদি সেই (ড. কামাল) বিএনপি-জামায়াতের ধানের শীষে উঠে যান, তাহলে জনগণকে কী জবাব দেব? এ জন্যই আমি এ প্রক্রিয়ার সাথে নাই।’

ঐক্যপ্রক্রিয়ার সাবেক সদস্যসচিব বলেন, ‘ড. কামাল যখন একটা প্রজেকশনে আসলেন, তাকে কেন্দ্র করে যখন জনগণ চিন্তা শুরু করলেন, তখন ওনাকে বললাম, ৯০ এর আদলে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য। আমাদের লক্ষ্য জনগণ যেন অবাধে ভোট দিতে পারে। আমরা কোনো অবস্থায় জোট করব না, যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলব। কিন্তু তারা সেই জোটেই গেলেন। এতে করে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। নীতি-আদর্শ বিসর্জন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

‘আমাদের কথা ছিল জনে জনে জনতার ঐক্য। এখন যে হয়েছে দলে দলে ঐক্য। দলের সাথে তারা বিলীন হয়ে গেছে।’

যাদেরকে নিয়ে ড. কামাল দেশ পাল্টানোর কথা বলছেন, সেটা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তার সাবেক সঙ্গী। বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে আগে যে কর্মকা- করেছে, তাতে তারা গ্রহণযোগ্য নয়। এখন তাদের সাথে জোট করে পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

মোস্তফা আমিন বিশেষভাবে খেপেছেন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী এবং ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের একই প্রতীকে ভোট করার সিদ্ধান্তে। বলেন, ‘কামাল হোসেন সাহেব, আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, কাদের সিদ্দিকী সব সময় বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে বলে আসছে। অথচ তাদের সাথে যোগ দিল। এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

ড. কামাল জোট করার আগে বলেছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে থাকলে বিএনপির সঙ্গে জোট করা সম্ভব নয়। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, ‘জামায়াত থাকলে আমার দল কোনো ঐক্য প্রক্রিয়ায় যাবে না। তবে অন্য দলগুলো কী করবে তা বলতে পারি না।...সারা জীবনে কখনো জামায়াতের সাথে যাইনি, শেষ জীবনে এসে সেটা করতে যাব কেন?’

এই বক্তব্যে গণমাধ্যমের শিরোনাম ছিল ‘জামায়াত সঙ্গে থাকলে বিএনপির সঙ্গে ঐক্য নয়: ড. কামাল’।

তবে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা অবস্থাতেই এই জোট করেছেন ড. কামাল আর এখন ২০ দলের সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্বাচনে যাচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট।

ফ্রন্টের সূত্রগুলো বলছে, জামায়াতকে ধানের শীষ দেওয়া নিয়ে জোটে প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কারণ, এখন ড. কামাল ধানের শীষে ভোট চাইলে সেটা জামায়াত নেতাদের পক্ষেও যাবে। এ জন্য বিএনপিকে এই সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন নেতারা। কিন্তু বিএনপি শোনেনি।

জামায়াতকে বিএনপির ধানের শীষ নেওয়া নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও ধানের শীষ পেতে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের চেষ্টার অবশ্য কমতি নেই। এরই মধ্যে আ স ম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, আবদুল কাদের সিদ্দিকী অথবা মেয়ে কুড়ি সিদ্দিকী, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, আবু সাইয়িদের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে। গণফোরাম নেতা সুব্রত চৌধুরী এবং মোস্তফা মহসিন মন্টু, আসন নিশ্চিত না হলেও তারা আশাবাদী।

বিএনপি তার দুই জোট ২০ দল এবং ঐক্যফ্রন্টকে মিলিয়ে ৬০টি আসনে ছাড় দেওয়ার কথা বলেছে। এরই মধ্যে ২০ দল ৪০টির মতো আসনের নিশ্চয়তা পেয়ে গেছে। তবে ড. কামাল হোসেন বলছেন, তাদের আশা ৩০ থেকে ৪০ আসন পাওয়ার। এটি কেবল গণফোরামের হিসাব। এর বাইরে জেএসডি ১৫টির মতো, আর নাগরিক ঐক্য অন্তত তিনটি আসন চাইছে। একাধিক আসন চাইছেন কাদের সিদ্দিকীও।

গণফোরাম নেতা সুব্রত চৌধুরী বলছেন, বিএনপি প্রয়োজনে তাদেরকে ১০০ আসন ছেড়ে দেবে। আর এই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে ৯ ডিসেম্বরের আগেই।

বিএনপির কাছে ছাড় পেতে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এই চেষ্টারও তীব্র সমালোচনা করেছেন আ ব ম মোস্তফা আমিন। বলেছেন, ‘নেতাদের এই দেখেন মনোনয়ননের জন্য কীভাবে পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে একেকজন। আমি তাদের সাথে একমত নই, আমি এর মধ্যে নাই।’

ড. কামালের ঐক্যপ্রক্রিয়ার সাবেক নেতার এসব বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে গণফোরাম নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে ঐক্যফ্রন্ট নেতার একজন ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, ‘স্যার মিটিংয়ে আছে। তাকে ফোন দেওয়া সম্ভব নয়।’

জানতে চাইলে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা এবং মৌলভীবাজার-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, ‘এই ফ্রন্টে কে আসল কে গেল, এই বিষয়টি আমি বলতে পারব না। আসন বণ্টনের বিষয়েও মোস্তফা মহসিন মন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

তবে মন্টুর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি তিনি ফোন না ধরায়। পরে ঐক্যফ্রন্টের শরিক জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘মোস্তফা আমিন কে? ফরোয়ার্ড পার্টির চেয়ারম্যান। ওনি গেলেই কী? ওনাকে কে চেনে?’

যেভাবে গঠিত হয় ঐক্যফ্রন্ট

বরাবর জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন ড. কামাল। আর ২০১৬ সালের শেষ দিকে ঐক্য করতে তিনি গঠন করেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দিয়ে গত এক বছর ধরেই বিভিন্ন দলকে ডাকছিল বিএনপি। আর এর সঙ্গে ড. কামালের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মিশেলে তৈরি হয় নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

এই জোটে যোগ দিয়েছে আ স ম আবদুর রবের জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য। পরে যোগ দেয় আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।

এর মধ্যে এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনামলে প্রধান বিরোধী দলগুলো ভোট বর্জন করলেও রবের নেতৃত্বে ৭০ দলের জোট যায় নির্বাচনে। আর সংসদে তিনি হন বিরোধীদলীয় নেতা। সে সময় রবকে গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা বলা হতো।

গত ১৩ অক্টোবর ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে বসে এই জোট। আর দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি দেয় ভোটে আসার ঘোষণা।

(ওএস/অ/ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test