E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

গীতের নৌকায় আসে গল্প, ভাসে মঞ্চ

২০২০ মার্চ ১৬ ২৩:০৮:৪০
গীতের নৌকায় আসে গল্প, ভাসে মঞ্চ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘নাটকে সঙ্গীত’ শিরোনাম কোর্সের পরীক্ষা প্রযোজনা হিসেবে কোর্স শিক্ষক ড. ইউসুফ হাসান অর্কের তত্ত্বাবধানে গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ, ২০২০ইং) মঞ্চায়িত হল নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের তিনটি বিখ্যাত নাটক ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’ এবং ‘চাকা’র নির্বাচিত অংশবিশেষ। বিভাগীয় পরীক্ষা প্রযোজনা হিসেবে ৯ সদস্যে বিভক্ত দল তিনটি সেলিম আল দীনের নাট্যরসকে তাদের মননে লালন করে প্রতিস্থাপন করেছেন পাণ্ডুলিপির নিজস্বতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে।

মূলত এ কোর্সটি বাংলা নাটকের স্বরূপকে বর্তমান যুগের নাট্যধারায় নতুন করে পরিচয় করাতেই সৃষ্টি করা হয়েছে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সাবেক সভাপতি ড. ইউসুফ হাসান অর্ক এ কোর্সটিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেন। এ কোর্সটির মাধ্যমে বাংলা নাটকের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী অবস্থানে দাঁড়িয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ তাদের দৃঢ় অবস্থান প্রতিষ্ঠায় আরও এক ধাপ এগিয়েছে। পাশ্চাত্য নাট্যধারায় ‘সঙ্গীত’ নাটকে আবেগ, ভাব এবং তার আবেদনের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে যদি প্রাচ্যের নাট্য ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে বাঙালির গীতল জীবনধারাকে প্রত্যক্ষ করতে পারি। এ দেশীয় মানুষের চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে, খেতে-ঘুমাতে গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গান আমাদের কাছে ভিন্ন কোন অনুষঙ্গ নয় বরং নাট্যচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশই এটি। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গাজির গান, ভাসান গান, পালা গান, মনসা মঙ্গল গান, কবি গান ইত্যাদি পরিবেশনাগুলিতে নাট্য আঙ্গিকের পূর্ণ প্রতিফলন পেয়ে থাকি। এদিকে ইসলাম উদ্দিন পালাকার তার পালাগানে সময় এবং কাহিনির প্রয়োজনে নিজেই নানান চরিত্রে অবতীর্ণ হন, গানের সুরে এগিয়ে নিয়ে যান তার গল্পকে। সোনালী অতীত সমৃদ্ধ বঙ্গীয় ইতিহাসে আছে বিয়ের গান, গায়ে হলুদের গান, জন্মদিনের গান, প্রেমের গান, বিচ্ছেদের গান; তাই গানকে পৃথক অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস কেবলই নিজেদের ইতিহাসকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই বলা যায় না।

এ দেশীয় নাট্যাঙ্গনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউসুফ হাসান অর্ক একটি শক্তিশালী নাট্য নির্দেশকের নাম। তিনি তাঁর নাটকে কাহিনির অবতারণা করেন গানের পালকিতে, তাঁর সৃষ্ট ‘কবি’, ‘তোতাকাহিনী’, ‘চন্দ্রাবতী’, ‘দেবদাস’, ‘মাতব্রিং’ ইত্যাদি মঞ্চ নাটক গুলোতে সঙ্গীতের শক্তিশালী অবস্থান সত্যি আবেগকে নিংড়ে বের করে আনে তথাকথিত বাঙালি আনার স্বতঃস্ফূর্ত সুরে। সুরের পালকিতে তিনি আনেন কাহিনির মায়াজালকে, মূলত সে গুরুত্বকে মাথায় রেখেই ‘নাটকে সঙ্গীত’ কোর্সটি যুক্ত করা হয়। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা এ বছর সেলিম আল দীনের তিনটি নাটকের মাধ্যমে মঞ্চে সঙ্গীতের প্রয়োগ দেখানোর প্রয়াস করেছেন। প্রতিটি নাটকের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা ছিল ১৫ মিনিট।

সর্বপ্রথমে ‘প্রাচ্য’ দলটি উপস্থাপন করে তাদের নির্বাচিত অংশ বিশেষ। সেখানে স্থান পায় গল্পের নায়ক সয়ফরের বিয়ে করে নতুন বউ বাড়িতে নিয়ে আসে, আনন্দ উৎসবের মূর্ছনায় নৃত্য-গীতে বিয়ে বাড়ির আবহ সৃষ্টি করা হয়। পরে ফুলশয্যায় কামরত সয়ফর ও নোলক বিলীন হয়ে যায় আলো ও নৃত্যের চোখ ধাঁধানো ঝলকানিতে। নোলকের কাম শীৎকারে সর্প দংশনের চিৎকার মিলিয়ে যায় কামজাত প্রেমে। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে নববধূ। এভাবেই ইতি টানা হয় নাটকটির।

অপর নাটকটি ছিল ‘বনপাংশুল’। সেখানে গারো মান্দাই জাতি জাতিগোষ্ঠীর জীবনকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে কাহিনির বীজ। প্রথমে বন্দনা সঙ্গীতের মাধ্যমে হাজার বছরের নাট্য দ্যোতনার আবহ সৃষ্টি করা হয় পোশাকে এবং নৃত্যে। মাতাল মান্দাইদের মদের আসর থেকে শুরু করে বাল্য বয়সে বিধবা হওয়া ‘শুকি’র অবদমিত কাম তাড়নাজাত প্রেম, ‘শুকি’কে নিয়ে তার দাদার শিব কুচুনীর মিথ্যে রটনায় দগ্ধ এক টুকরো রক্তমাংসের তীব্র আর্তনাদ মঞ্চে উপস্থাপিত হয় সুর মিশ্রিত অভিনয়ে!

তৃতীয় এবং শেষ দলটি ছিল ‘চাকা’ নাটকের; যেখানে মানুষ তার নিজস্ব পরিচয় খুইয়ে লাশ পরিচয়ে কতটা অসহায়। সেই ভাবকে আশ্রয় করে বেওয়ারিশ একটি লাশকে কেন্দ্র করে; মঞ্চে সৃষ্টি করে হতাশা ও দুঃখের সঙ্গে জীবনের গ্লানিময় বাস্তবতাকে।

পরিবেশিত নাটক তিনটির ভিন্ন আঙ্গিক এবং সেলিম আল দীনের শক্তিশালী পাণ্ডুলিপির দৃঢ়তাকে অক্ষুণ্ণ রেখে সবার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা মঞ্চে প্রতীয়মান হয়েছে। সেই সঙ্গে অধ্যাপক ড. ইউসুফ হাসান অর্কের তত্ত্বাবধানে গীতকে অনুষঙ্গ করে নয় বরং সুরের নৌকার ঢেউ দিয়েই মঞ্চে ঝড় তোলা হয়েছে বাঙলা নাটকের শতসহস্র বছরের ঐতিহ্যকে আশ্রয় করে।

লেখক : প্রান্ত সাহা; নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মতামত:

০৬ আগস্ট ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test