Ena Properties
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

একজন টিটু রায়ের কথা

২০১৭ নভেম্বর ১৬ ১৫:৫৯:৪৪
একজন টিটু রায়ের কথা

শিতাংশু গুহ


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, এটা আমাদের দায়িত্ব'। রংপুর ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি। যারা বলতে পছন্দ করেন যে, দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, তারা এরপর একটু চিন্তা করবেন প্লীজ। দেশে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু আছে। রাষ্ট্রের ধর্ম থাকলে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু থাকবে। সংখ্যালঘু আছে বলেই টিটু রায়-কে পুলিশ ৪দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। কিন্তু 'নাটের গুরু' মাওলানা আসাদুল্লাহ হামিদী খোলা আকাশের নীচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? সংখ্যালঘু বলেই টিটুদের বাড়িঘর পুড়ছে, কিন্তু হেফাজত বায়তুল মোকাররমে কয়েক হাজার কোরান পোড়ালেও তাদের গায়ে আঁচড় পড়েনি? সংখ্যালঘু বলেই উত্তম দাস বা রসরাজ নিরাপরাধ হয়েও দীর্ঘদিন জেল খেটেছে আর সংখ্যাগুরু জাহাঙ্গীর আলম ফটোশপ করে দাঙ্গা ঘটিয়েও বহাল তবিয়তে আছে।

মিডিয়া জানাচ্ছে, টিটো রায় নির্দোষ, হজরত মুহম্মদকে অবমাননা করে পোস্টিং তিনি করেননি। করেছেন, মাওলানা হামিদী। হামিদী মুক্ত, জেলে যেতে হলো টিটোকে। কারণ রংপুর ঘটনার আগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিলো। মামলা আছে, পুলিশ তো ব্যবস্থা নেবেই! এরপরও কি কারো সন্দেহ থাকা উচিত যে, দেশে আইনের শাসন পুরোপুরি বিদ্যমান? টিটু রায়ের কপালটাই মন্দ, এলাকা ছাড়া বহুদিন।

মানবাধিকার কর্মী যারা রংপুর সফর করেছেন, তারা জানাচ্ছেন, টিটু রায়ের ২মেয়ে শিউলি, ১৮ ও সুচিত্রা, ১৩। সুচিত্রাকে ২০১৫ সালে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে ধর্মান্তরিত ও বিয়ে করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী। তার গৃহত্যাগের কারণ হচ্ছে, তিনি ঐ প্রভাবশালীর কাছে কিছু টাকা ধার নিয়েছিলেন, কিন্তু আর পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে মেয়ে গেছে? এবার তার বাড়ীঘর পুড়লো। রিমান্ডে জুটবে পুলিশের 'মাইর'। সবশেষে দেশান্তর। 'সুবোধ-রা' এভাবেই পালিয়ে যায়!

দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল টিটু বা সংখ্যালঘুর ঘরে পৌঁছেনি। পৌঁছেছে সংখ্যাগুরুর ঘরে, মৌলবাদীদের ঘরে! তাই এখন হেফাজতিরা গণভবনে 'চা' খায় আর শাহবাগীরা খায় 'মাইর' বা দৌড়ানী? রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদী প্রায়শ: বলতেন, 'বাংলাদেশে হিন্দুরা জামাই আদরে আছে'। এবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, হিন্দুরা ভারতের চেয়েও বেশি সুরক্ষিত বাংলাদেশে'। সাঈদী ও আইনমন্ত্রীর কথার মধ্যে তফাৎ কতটা? এরআগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন যে, 'তিনি জীবনেও মিথ্যা কথা বলেননি'। এই একটি মাত্র বাক্যের জন্যে তিনি বিখ্যাত হয়ে থাকবেন; যেমন বিএনপি'র সাবেক মন্ত্রী বাবরকে সবাই মনে রাখে তার সেই বিখ্যাত উক্তি, 'আল্লার মাল আল্লায় নিয়ে গেছে'-র জন্যে?

আদালতে নাকি টিটুর কোন উকিল ছিলোনা? বাংলাদেশে কি সরকারি উকিল দেয়ার কোন বিধান নেই? তবে টিটোর ঘটনাটি একটু ভিন্ন। আদালতে কোন আইনজীবী টিটুর পক্ষে দাঁড়ায়নি। কেউ কেউ দাঁড়াতে চাইলেও পারেননি। কারণ, রংপুর আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ সকালেই মৌখিকভাবে আদেশ জারি করেছিলেন যে, কেউ যেন টিটুর পক্ষে ওকালতনামা সাবমিট না করে? আচ্ছা, এটা কি আইনের চোখে অপরাধ নয়? এই ফরমান কেন? টিটু সংখ্যালঘু হিন্দু, তাই? অবাক পৃথিবী, অবাক। এদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে উকিলের অভাব হয়নি, যুদ্ধাপরাধী নিজামী, সাকা বা মুজাহিদের পক্ষে অগুন্তি আইনজীবী পাওয়া যায়, কেউ কোন মৌখিক নির্দেশও দেয়না, কিন্তু সামান্য এক গরীব হিন্দু টিটুর বিরুদ্ধে সবাই একজোট?

একজন প্রশ্ন করলেন, 'আচ্ছা, রংপুরের ঘটনা ঠেকানো গেলো না কেন? উত্তরটা একেবারেই সহজ, প্রশাসন ঠেকাতে চায়নি। যাকিছু হয়েছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় হয়েছে, রীতিমত রিহার্সেল দিয়ে, পরিকল্পনা মাফিক হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন ও রংপরের দু'টি ঘটনা থেকে আমরা বুঝেছি যে, রোহিঙ্গাদের বাড়ীঘর যারা পুড়িয়েছে, তারা সন্ত্রাসী, কিন্তু রংপুরে যারা হিন্দুদের বাড়ীঘর পুড়িয়েছে, তারা নিতান্ত শান্তিপ্রিয়, রাগের মাথায় একটু-আধটু পাগলামী করেছে মাত্র। সামাজিক মাধ্যমে একটি চমৎকার থিওরী শুনলাম, রংপুরে হিন্দুরাই নাকি হিন্দুদের বাড়ীতে আগুন দিয়েছে? আমার মনে পড়লো, ২১শে আগষ্ট আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলার কথা। তখন বিএনপি বলেছিলো, 'শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন'?

তবে টিটু রায় গ্রেফতারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কৃতিত্ব যথেষ্ট। তাকে একটি জাতীয় পুরস্কার দেয়া উচিত। ক'দিন আগে তিনি বলেছিলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স'। তারপরই রংপুরে জাতি দেখলো টলারেন্স কত প্রকার ও কি কি? তবে গোপালগঞ্জে শিক্ষার্থীরা রংপুরের ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে দেখে ভালো লাগলো। বুদ্ধিজীবীরা সাদামাটা একটি বিবৃতি দিয়ে অনুযোগ করেছেন, তাও দেখলাম।

নিউইয়র্কে একটি প্রতিবাদ সভা থেকে স্পেশাল ট্রাইবুনাল গঠন করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের দাবি উঠেছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয়না কেন, এপ্রশ্নও স্বাভাবিক। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের টুইটে জাতি জেনেছে, বাংলাদেশ সরকার রংপুরে ক্ষতিপূরণ দেবে।

শৈবাল সাহা পার্থ-র কথা মনে আছে? এই সেই পার্থ, বিএনপি আমলে ই-মেইলে শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দেয়ার অভিযোগে যাকে গ্রেফতার, অকথ্য নির্যাতন, দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছিলো। পরে প্রমান হলো, পার্থ নির্দোষ। উত্তম দাস, রসরাজ বা রাকেশ, সবাই জেল খেটেছেন, মাইর খেয়েছেন, সর্বস্ব হারিয়েছেন, এবং তা বিনাদোষে? টিটোর ঘটনাও তাই।

এরা সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। কেউই ইসলামের অবমাননা করেনি। যারা করেছে তারা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের, একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তারা ধর্মের অবমাননা করেছে। অপকর্ম করবে সংখ্যাগুরুর সন্ত্রাসীরা, দোষ পড়বে সংখ্যালঘুর ওপর, বাড়িঘর পুড়বে, জেল খাটবে, মানইজ্জত লুন্ঠিত হবে হিন্দুর বা বৌদ্ধের, এ আর কতকাল? এর শেষ কোথায়? কবি কিন্তু গেয়েছেন, 'দিনে দিনে বাড়িতেছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ --'।

লেখক : কলাম লেকক, নিউইয়র্ক।

পাঠকের মতামত:

১১ ডিসেম্বর ২০১৭

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test