E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

দূরবীনে দূরের জানালা

২০২০ জানুয়ারি ০৭ ২১:২০:১৬
দূরবীনে দূরের জানালা

প্রবীর বিকাশ সরকার


এই এক জীবনে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা হয়েছে যাঁদের আলোয় আমি আলোকিত হয়েছি। তাঁরা ঈশ্বরতুল্য নন, আমি অভিভূত হয়েছি তাঁদের শিক্ষালব্ধ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, কর্ম এবং চারিত্রিক গুণাবলির পরিচয় পেয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও কাজে। তেমনি একজন হলেন মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। অত্যন্ত ভদ্র, অমায়িক, বিদ্বান এবং সহযোগিতামনস্ক। তাঁর আরও দুটি অসামান্য গুণ হচ্ছে, গ্রন্থপ্রিয়তা, প্রচুর বই পড়েন। তাঁর গাড়ির মধ্যেও বই দেখে আমি অবাক হয়েছি। আর হচ্ছে সাহিত্যপ্রিয়তা, দেশ-বিদেশের সাহিত্য সম্পর্কে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। অবাক হই যে, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এত ব্যস্ত কিন্তু বইপড়া, সাহিত্য নিয়ে ভাবনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই একজন সৎ, কর্মঠ ও মেধাবী মানুষকে তাঁর অফিসের একান্ত সচিব করেছেন। আনন্দের খবর যে নতুন বছরের শুরুতেই সহসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন তোফাজ্জল স্যার। আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী এই পর্যন্ত যতজনকে তাঁর কাজের সুবিধার জন্য নির্বাচন করেছেন, তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন তিনি।

সব মানুষ একরকম হওয়া সম্ভব নয়। মানুষের সঙ্গে না মিশলে মানুষকে চেনা যায় না। বাইরে থেকে বা দূর থেকে মানুষকে আমরা নানা রকম ইমেজে ভেবে থাকি। কখনো সেটা সত্যি, কখনো সেটা মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়। তোফাজ্জল স্যারকে আমি প্রথম দেখি ২০১২ সালে এবং দেখেই অত্যন্ত চৌকস এবং রুচিসম্পন্ন বলে মনে হয়েছে।

আমি তখন কুমিল্লায় মাসিক শিশুপত্রিকা ‘কিশোরচিত্র’ প্রকাশ করছি। আমাকে সহযোগিতা করছেন বাবার বন্ধু প্রাক্তন পুলিশ অফিসের রিডার ঠাকুর জিয়াউদ্দিন আহমদ তথা জিয়াকাকা। তাঁর বাবা শফিউদ্দিন ঠাকুর আমার বাবার সঙ্গে ২০ বছর এবং জিয়াকাকা ২০ বছর কাজ করেছেন পাশাপাশি কুমিল্লা পুলিশ অফিস ও পুলিশ কোর্টে। জিয়া কাকা আমার স্থানীয় অভিভাবকও হন।

‘কিশোরচিত্র’র সরকারি ডিক্লারেশন নেওয়ার জন্য আমি ও কাকা চেষ্টা করছি। কিন্তু নানা ঝামেলায় এগোচ্ছে না। বাবা থাকলে অসুবিধে হত না। কিন্তু বাবা তো ২০১২ সালেই লোকান্তরিত হল। জিয়াকাকা একদিন বললেন, চলো, ডিসি সাহেবের সঙ্গে দেখা করে কথা বলি। তুমি একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছ এটা তিনি বুঝবেন। তিনি খুব অমায়িক এবং বিদ্বান মানুষ। প্রচুর বই পড়েন। ডিসি সাহেবের পিএসের সঙ্গে কাকার দহরম-মহরম সম্পর্ক। বাবাকেও ভালো করেই চেনেন। তিনি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও ডিসি মো.তোফাজ্জল হোসেন মিয়া সময় দিলেন। আমাদের আবেদনপত্র পড়লেন। কিশোরচিত্রর দু-তিনটি পরীক্ষামূলক সংখ্যা হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টালেন। তারপর বললেন, আরে! আপনার সঙ্গে কয়েকদিন আগে দেখা হয়েছে, তাই না? আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ স্যার। চৌমহনীর কাছে একটি বাসায় একদিন সন্ধেবেলা একটি অনুষ্ঠানে। হেসে বললেন, আপনি তো জাপানে থাকেন? সেদিন বলছিলেন।

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। তিনি বললেন, খুবই ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। জেনে আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে। শিশুদের প্রতিভা বিকাশে মাতৃভাষায় তাদের লেখালেখি নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকা খুব উৎসাহব্যঞ্জক। ঠিক আছে আমি পিএসকে বলে দিচ্ছি কীভাবে কী করতে হবে। চিন্তা করবেন না। আপনাদের কাজ হবে। আমার সহযোগিতা থাকবে।

খুব দ্রুত কাজ হয়েছিল। তাঁর নির্দেশমতো আমরা ডিক্লারেশন পেয়ে গেলাম। একদিন তাঁর বাসভবনে গিয়ে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এলাম। শুক্রবার ছিল সেদিন, দেখলাম অন্যান্য জুনিয়র ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছেন। কাজ পাগল মানুষ বুঝতে কষ্ট হল না। এরপর তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করেছিলাম কিশোরচিত্রে, নিয়েছিল কাকার মেয়ে প্রমি। এভাবেই তাঁর সঙ্গে একটা বন্ধুত্ব আমার গড়ে উঠল। আমার লিখিত বই উপহার দিলাম তাঁকে। বললেন, এসব দেখছি রেয়ার বই! অবশ্যই পড়ব। জাপানে গিয়েছি আমি কর্মসূত্রে। মুগ্ধ করার মতো একটি দেশ। আমাদের পরম বন্ধুরাষ্ট্র।

দুটো অনুষ্ঠানে তাঁর সাহিত্য বিষয়ক পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। একটি ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান, অন্যটি সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন স্মরণে আলোচনা সভা। দুটো অনুষ্ঠানেই বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে অসামান্য বক্তৃতা তিনি দিয়েছিলেন। মীর মশাররফ হোসেন সম্পর্কে কী গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা তাঁর আজও মরমে শুনতে পাই!

বাংলাদেশে আমি ফিরেছিলাম দুটি প্রকল্প নিয়ে, একটি শিশুদের জন্য সংবাদপত্র প্রকাশ ও মানচিত্র বইঘর পুনরায় চালু করা। আমার নিজের বাড়ির ছাদে দুটি কক্ষ তৈরি শুরু করেছিলাম। ১৯৯১ সালে শহরের রামঘাটে মানচিত্র বইঘর দিয়েছিলাম, দুর্ভাগ্যবশত সেটা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। আবার বহু বছরের ব্যবধানে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর তারিখে পুনরায় উদ্বোধন করা হল। উদ্বোধন করলেন ডিসি মো.তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে। প্রধান অতিথি ছিলেন বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট আহম্মদ আলী। আমাদের সকলের শ্রদ্ধাভাজন প্রিয় আহম্মদ আলী চাচা। সঙ্গে ছিলেন জিয়াকাকা। মূলত তাঁর মাধ্যমেই তোফাজ্জল স্যার আমার অনুরোধ গ্রহণ কওর আমাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। সেই মধুরতম স্মৃতি ভুলে যাওয়া অসম্ভব।

এরপর তিনি হঠাৎ করেই ঢাকায় বদলি হলেন, ঢাকার ডিসি হিসেবে। মেইলে আমাদের যোগাযোগ ছিল। একবার তাঁকে নিয়ে আমি একটি দীর্ঘ নিবন্ধ দৈনিক কুমিল্লার কাগজে লিখেছিলাম। পড়ে তিনি খুশি হয়েছিলেন।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে আমি কুমিল্লা ছেড়ে জাপানে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হই। কারণ আমার স্ত্রী যে কোম্পানির চিফ একাউনটেন্ট সেই ৫০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যায়। কথা ছিল সেই মেয়ের পড়ালেখা ও সংসার চালিয়ে নেবে। বাংলাদেশে আমাদের একটা কিছু করা জরুরি, কারণ বাংলাদেশ দ্রুত উপরের দিকে উঠছে। বাংলাদেশ যে উঠবে সেই ধারণা ছিল আমার তাই ১৯৯১ সালেই জাপানে মানচিত্র কাগজ প্রকাশ ও বাংলাদেশে মানচিত্র বইঘর করেছিলাম। একটি আধুনিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বাপ্নিক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম দুজনে। তখন হাতে প্রচুর টাকাও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার হল না। কেন হল না তা আর বলতে চাই না সঙ্গত কারণেই।

পত্রিকা ও বইঘর গুটিয়ে জাপানে চলে আসার পর তেমন যোগাযোগ ছিল না তোফাজ্জল স্যারের সঙ্গে। মাঝে মাঝে মেইলে যোগাযোগ হত। হঠাৎ করেই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি জাপানে এসেছিলেন অফিসের কাজে। আমি তখন একটি ফুডস ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। রাতে বাসায় ফিরলে পরে স্ত্রী বলল, বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে একজন ফোন করেছিলেন। তোমাকে চাইছেন। ঢাকা থেকে একজন বড় সরকারি অফিসার এসে দূতাবাসে তোমার টেলিফোন নম্বর খুঁজছেন। তুমি এই নম্বরে যোগাযোগ করো। দেখলাম একটি নম্বর, যিনি করেছিলেন তাঁর নাম সেলিম। আমি চিনি না। দূতাবাস আমাকে খুঁজছে জেনে অবাকই হলাম! কারণ দূতাবাসের কাছে আমি চিরকালই ব্রাত্যজন।

যাহোক, ফোন করলাম সঙ্গে সঙ্গে। সেলিম সাহেব ধরলেন, বললেন, আরে দাদা আপনাকে খুঁজছি! ঢাকা থেকে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর অফিসের ডিরেক্টর জেনারেল তোফাজ্জল স্যার এসেছেন, এসেই দূতাবাসে ফোন করে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। কিন্তু আপনার ফোন নম্বর নেই আমাদের কাছে, বলতেই স্যার ভীষণ হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দিলেন! এত বড় একজন লেখক, গবেষক তাঁর ফোন নম্বর তোমাদের কাছে নেই! আশ্চর্য ব্যাপার! দূতাবাসে তাহলে কারা যায়? তারা কারা? আমরা কী জবাব দেব বলুন। পরে একজন প্রবাসী ভাইয়ের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে আপনার বাসায় কল করেছি। আপনি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন, শিনজুকু কেইও প্লাজা হোটেলে আছেন।

সেলিম সাহেব লাইন লাগিয়ে দিলেন। অমনি শুদ্ধভাষায় বললেন, আরে মশাই কোথায় আপনি! খুঁজে খুঁজে হয়রান! দূতাবাসে আপনার ফোন নম্বর নেই, ঠিকানা নেই কী তাজ্জব ব্যাপার বলুন দেখি! আচ্ছা, আজকে একটু পর জরুরি মিটিং আছে। আপনি কাল সকালে চলে আসুন।

ছুটি নিয়ে সকালে হাজির হলাম হোটেলে তাঁর রুমে। জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করলেন। আমরা নানা বিষয়ে আড্ডা দিলাম। তিনি চা তৈরি করে আমাকে আপ্যায়ন করলেন। কুমিল্লার স্মৃতিচারণ করলেন। খুব দুঃখ করলেন মানচিত্র বইঘরটি বন্ধ হয়ে গেল বলে। বললেন, এত ভালো ভালো বই তুলেছিলেন আপনি। আইডিয়া, ডেকরেশন ছিল অদ্ভুত সুন্দর। জাপানি স্টাইলের দোকানটি এখনো চোখে লেগে আছে। প্রকল্পটি করতে পারলে কুমিল্লার সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনটা নতুন রূপ পেত।

সেদিন ঘণ্টা দুই কথা বলে চলে এলাম। পরেরদিন ছিল সম্ভবত শনিবার ছিল। আমার ছুটি। ফোন দিয়ে গেলাম হোটেলে সকালবেলা। দেখা হল। বললেন, প্রবীরবাবু, খুব ব্যস্ত! আজ ও আগামী কাল কয়েকটি মিটিং জাইকার সঙ্গে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তারপর কয়েকটি প্রজেক্ট দেখতে যেতে হবে। তারপর তো ফিরে যেতে হবে ঢাকায়। এবার বেশি সময় পাচ্ছি না। বললেন, দুপুরের পর মিটিং।

আমি বললাম, তাহলে শিনজুকু শহরের কিছুটা দেখাই চলুন। তিনি বললেন, সেই ভালো। চলুন। তারপর তাঁকে শিনজুকু যে কত বড় রেল স্টেশন দেখালাম। কত দোকানপাট, ডিপার্টমেন্ট স্টোর্স। তিনি দেখে খুব আনন্দিত হলেন। এক ফাঁকে মেট্রোতে চড়ে কুদানশিতা নিয়ে গেলাম ইয়াসুকুনি জিনজা মন্দিরে। মন্দিরের প্রাঙ্গণে বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের স্মৃতিফলক দেখালাম। তিনি অবাক হলেন! এত বড় সম্মান প্রদান করেছে জাপান! অথচ আমরা তাঁকে চিনি না!

আমি তাঁকে বললাম, স্যার, দূতাবাসের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, তখন বলিনি। এবার বলি স্যার, বাঙালি বাঙালিকে চিনতে পারেনি আজও। বাঙালির মধ্যে এত স্নোবিশ আর অন্য কোনো জাতিতে খুঁজে পাবেন না! আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কিছু মনে করবেন না।

তিনি হেসে, বললেন, মনে করার কিছু নেই। দেশ-বিদেশে আমিও তো দেখে আসছি। আপনি ঠিকই বলেছেন।

শ্রদ্ধেয় তোফাজ্জল স্যার, অনেক অনেক অভিনন্দন। আপনি ভালো থাকুন, আরও সাফল্য লাভ করুন এই প্রার্থনা করি নিরন্তর।

লেখক : জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

২৭ মে ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test