Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

জঙ্গী ও ফেজাতজ : উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

২০২০ জানুয়ারি ১৩ ১৬:২৪:৪৮
জঙ্গী ও ফেজাতজ : উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

রণেশ মৈত্র


সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় লাল কালিতে পাঁচ কলামব্যাপী শিরোনাম দেখে আঁতকে না উঠে পারি না। শিরোনামে অত্যাধিক গুরুত্ব সহকারে লেখা আছে “দুইশ” জঙ্গী লাপাত্তা আটকদের ৭২ শতাংশই জমিনে বেরিয়ে গেছে। 

খবরটিতে বলা হয়েছে, সারাদেশে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গীদের ৭২.৪০ শতাংশই জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছে। কারাগারে আটক আছে মাত্র ২৭.৬০ শতাংশ। জামিন প্রাপ্ত অন্তত: দুই শতাধিক জঙ্গীর হদিস পাচ্ছে না আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।

২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সাল পর্য্যন্ত পৌনে তিন বছরে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক ৭৭৯ জন জঙ্গীর মধ্যে ৫৬৪ জনই জামিনে বের হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ঝুলে আছে প্রায় আট শত মামলা। আদালতে বিচারাধীন মামলা সংখ্যা ৫৫০। অজানা কারণে মন্থর গতিতে চলছে ২৫০ মামলার তদন্ত কাজ। আলোচ্য সময়ে এসব মামলায় আটক প্রায় চার হাজার জঙ্গী। এদের মধ্যে দুই শতাধিক জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। তিন শত জঙ্গী জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজির হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জঙ্গীদের জামিন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা রিপোর্টে চিহ্নিত জঙ্গীদের অকালীন জমিন পাওয়া বন্ধ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ বিষয়ে এখনই প্রশাসনিক বা আইনী ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। তদন্তে গাফিলতি ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় মূলত: এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এসব মামলা আসামীদের যথাসময়ে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত না করা হলে জঙ্গী হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গীরা জামিন নিয়ে পলাতক হলেও তাদের জামিনদারদের বিরুদ্ধে নেই কার্য্যকর যথাযথ জবাবদিহিতা। তাদের কারও বিরুদ্ধেই আজ পর্য্যন্ত কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জঙ্গীরা নির্বিশেষ জামিন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

আরও বলা হয়েছে, পলাতকদের মধ্যে অন্তত: দুই ডজন জঙ্গী রয়েছে যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরীতে পারদর্শী। দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গী সংগঠনের সাম্প্রতিক উত্থানের নেপথ্যে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গী কলকাঠি নাছে আবার কেউ কেউ কারাগারে আটক থেকেও তৎপরতা চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনী অভিযান চালিয়েও জামিনে পলাতক জঙ্গীদের চিহ্নিত করতে পারছে না আইন শৃংখলা বাহিনী। জামিনে মুক্ত এসব দুর্বৃত্ত কোথায় আছে সে বিষয়ের কোন তথ্য নেই পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে। এসব পলাতক জঙ্গীকে দ্রুত গ্রেফতার করা না গেলে দেশে নিরাপত্তা হুমকির আশংকা থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী বলেন, প্রচলিত আইনে জঙ্গীরাদের ঝুঁকির বিষয়টি সেভাবে কভার করে না। জঙ্গীদের বিরুদ্দে মামলা হয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে। এ বিষয়ে আইন সংশোধন করা জরুরী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে জঙ্গী মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। ওরা গ্রেফতার হয় জঙ্গী হিসেবে আর মামলা হয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে। এভাবে কোন জঙ্গীকে কতদিন আটকে রাখা যায়?

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ- ট্যান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গী দমন ও এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তে পুলিশের আন্তরিকতার অভাব নেই। প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে সময় লাগার চার্জশীট দিতে কোন কোন ক্ষেত্রে দেরী হয়। তবে খুব বেশী দেরী করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক মামলার তদন্তে সময় সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ওই সময়সীমার মধ্যে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা যায় না। আবার যথাযথ তথ্য প্রমাণ ছাড়া চার্জশীট দাখিল করলে জঙ্গীদের ছাড়া পাওয়ার আশংকা থাকে। ত্রুটিহীন চার্জশীট দিতে সময় বেশী লাগলে আবার জবাবদিহিতার আওতা দিয়ে যেতে হয়।

জঙ্গীদের বিষয়ে কাজ করেন ঢাকা মহানগর আদালতের এমন একজন আইনজীবী বলেন, অনেক সময় সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। সাক্ষী হাজিরের জন্য আদালত থেকে অজামিন যোগ্য গ্রেফতারী পরোয়ানাও পাঠানো হচ্ছে। তবুও আইন শৃংখলা বাহিনী আদালতে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জঙ্গী সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন অত্যন্ত জরুরী। যেসব জঙ্গী জামিন নিয়ে পলাতক, সেসব মামলায় তাদের জামিনদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে।জামিনদারদের জবাবদিহিতার সৃষ্টি না হলে জঙ্গীদের জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থামবে না।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, জামিন নিয়ে যেসব জঙ্গী পালিয়ে গেছে তার অন্তত: দুই শতাধিক জঙ্গীর তালিকা তৈরী করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। যারা পালিয়ে গেছে তাদের মধ্যে আছে আই এস দাবীদার বৃটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান। ২০১৪ সালে ঢাকায় মুজাহিদ সংগ্রহ করতে এসে গ্রেফতার হয় সে। জামিনে ছাড়া পেয়ে সে লাপাত্তা।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে পলাতক দুর্ধর্ষ জঙ্গীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কাওছার হোসেন, কামাল উদ্দিন, আজমীর, গোলাম সরওয়ার, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, নূর ইসলাম, আমিনুল মুরমালিন, মহিবুল মুস্তাকিন, রফিকুল ইসলাম। সিরাজ ও মসিউর রহমান, তানভীর, তৌহিদুল, সাইদুল, সাইফুল, রেজাউল, নাঈম, জুম্মন, আমিনুল, জঙ্গী আবদুল আকরাম, জুনায়েদ রহমান, মানিক, মজিদ, সাজেদুর। ফারুক, শফিক, মিলন, কফিলউদ্দিন ওরফে রব মুন্সী, আজিবুল ইসলাম ওরফে আজিজুল, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ খাইরুল ইসলাম, ওয়ালিউল্লাহ, হামি, জাকেরিয়া, সবুজ, নাদিম, ময়েজউদ্দিন, মহব্বত ওরফে তিতুমীর ওরফে নাহিদ।

র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদগণমাধ্যমকে বলেছেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলার পর র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ৫১২ সন্দেহ ভাজন জঙ্গীর মধ্যে তিনশ জনই জামিন পেয়েছে। এই তিন শত জয়ের মধ্যে জামিন নিয়ে যাওয়ার অর্ধেকই এখন পলৈাতক। জঙ্গী সন্দেহে আটকের পর জামিনে থাকলে তাদের ওপর কতটা নজরদারি সম্বব হচ্ছে? জামিন পাওয়া সন্দেহ ভাজনদের উপর সার্বক্ষনিক নজরদারি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব না।

দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ, র‌্যাব প্রভৃতি আইন শৃংখলা বাহিনী ‘সন্দেহভাজন’ জঙ্গী ফারদেরকেগ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে থাকে তাদের মধ্যেকার একটি বড় অংশের জামিন পাওয়ার জঙ্গীদমনে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আবার জামিন দেওয়ার মালিক হলেও আদালতকে তো কিছু বলা যায় না-তবে গ্রেফতারেরা পর জামিন দিলে স্বভাবত:ই যাঁরা কষ্ট করে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানোর পর জামিন পেয়ে উধাও হয়ে গেল বা নতুন করে জঙ্গীপনা শুরু করলে নিশ্চিতই তা পুলিমের জঙ্গী বিরোধী অভিযানকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।

এক্ষেত্রে আদালতেরও জবাব আছে। পুলিশ যদি ‘সন্দেহভাজন’ বলে ফরোয়ার্ডিংএ লিখে ৫৪ ধারার মত ধারা দিয়ে জেলে পাঠান তাহলে সেই আসামীকে বেশী দিন আটকে রাখা আইন সিদ্ধ নয়। পুলিশের বর্ণনায়ও এ জাতীয় বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করায় বিষয়টি অস্বচ্ছ থেকে যাচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলা চলে ‘সন্দেহভাজন’ জঙ্গীকে গ্রেফতার করার সময় যদি তার হাতে অস্ত্র, গুলি, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য গুরুতর কিছু পাওয়া না যায় কোন কিছু যদি জব্দ (ঝরবমব)করা না হয় এবং ৫৪ ধারা জাতীয় ধারা উল্লেখ করা হয়-তবে জামিনের এ সমস্যা থেকেই যাবে।

দ্রুত আইন মন্ত্রণালয়কে জঙ্গীদের বিচারের জন্য পৃথক কঠোর আইন প্রণয়ন এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার করার ব্যবস্থা করার পক্ষে পুলিশ ও র‌্যাব কর্তৃপক্ষ যে আবেদন জানিয়েছেন তা দ্রুত আমলে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পদক্ষেপ গ্রহণও করুরী।

অপরপক্ষে র‌্যাব প্রধান যে উল্লেখ করেছেন জামিলপ্রাপ্ত জঙ্গীদের প্রতি উপযুক্ত নজরদারি তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাস্তবতায় বিবেচনায় র‌্যাব প্রদানের এই উক্তি সমর্থন যোগ্য নয়। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দেখা প্রয়োজন, র‌্যাব-পুলিশ এমন কথা কেন বলছেন এবং তাঁদের কি কি সমস্যা আছে তাও জানা দরকার। যদি জনবলের অভাব থাকে তবে সেটা দ্রুত দূর করা এবং জামিনপ্রাপ্তদের নজরদারি যথাযথভাবে যাতে করতে পারে তার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব ্যবস্থাও করতে হবে।

কারণ দেশের জনগণের নিরাপত্তা এভং রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গীদমন, জঙ্গী উৎখাত, জঙ্গী নির্মূলের অভিযানকে যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনই তার পথে সকল প্রতিবন্ধকতাকেও কার্য্যকরভাবে দ্রুত দূর করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর সম্প্রসারণ, জঙ্গী বিরোধী অভিযানের প্রশিক্ষণ প্রভৃতির ব্যবস্থাও করতে হবে।

পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার, বিরোধী রাজনীতি দমনে ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে তাদেরকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গী উত্থান বন্ধ প্রভৃতি কাজে বেশী বেশী করে নিয়োজিত করা প্রয়োজন।

জঙ্গীবাদ দেশের কোন সমস্যা নয়-এমন করা বলে আত্মতৃপ্তি বিধান সর্বদা পরিত্যজ্য। জঙ্গীবাদের প্রতি ‘নো টলারেন্স’ এর কথা বলেও আস্বস্ত থাকার কারণ নেই। প্রয়োজন তাদের সকল গোপন আস্তানা, সকল উৎসাহও প্রশ্রয়দাতা এবং তাদের সকল আর্থিক ও অস্ত্রের উৎসব খুঁজে বের করা এবং তার বিরুদ্ধে নিরস্তর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

জঙ্গী বাংলাদেশের কোথায় নেই-কোথায় আছে-তাও বুঝে ওঠা দুষ্কর কারণ পুলিশ বা র‌্যাব আজ কয়েকটি বছর যাবত বাংলাদেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ, মধ্য-যেখানেই হাত দিয়েছে-অভিযান চালিয়েছে সেখানেই জঙ্গীদের সন্ধান পেয়েছে গ্রেফতারও করেছে। তাই বিষয়গুলিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

জঙ্গীদমনে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তাদের লালিত আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই নিরন্তর লড়াই পরিচালনা করা। নইলে ঐ আদর্মের নামে তাদের রিক্রটিং, মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বাহিনী গঠন করা, গোপন আস্তানা তৈরি করা, অর্থ সংগ্রহ করা সুযোগ ও ক্ষমতা ক্রমন্বয়ে বাড়তেই থাকবে। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে তাদের আদর্শ বলে প্রচার করে, বিশেষ ধরণের পোষাক-পরিচ্ছদ ব্যবহার, বিশেষ ধরনের বই-পুস্তক লাখে লাখে ছেপে বিলি করে-কখনও গোপনে কখনও প্রকাশ্যে। মাদ্রাসা-মসজিদগুলিকেও তেমন-শিক্ষণ প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করে। এমন কি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও তাদের নজরের বাইরে নয়-তারা সর্বত্র বিরাজমান ‘জেহাদী দাওয়াত’ নিয়ে।

বাংলাদেশ এহেন কর্মকা-ের অন্যতম উপযুক্ত ক্ষেত্রে পরিণত হতে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মারফত “বিসমিল্লাহ” সংযোজন, জামায়াতে ইসলামী হেফাজতে ইসলামী সহ সকল ধর্মাশ্রয়ী দলকে বৈধতা প্রদান এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংরক্ষণ। ভারতের সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি যেমন “হিন্দুত্ববাদ” প্রতিষ্ঠা করার কথা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত থেকে বারংবার উচ্চারণ করে থাকেন এবং ফলে সেখানে হিন্দু ধর্মীয় সন্ত্রাসী ও জঙ্গী সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ দৃশ্যমানভাবে রচিত হয়েছে।

বাংলাদেশেও তেমনি ৭২ সংবিধানের ঐ সকল প্রতিক্রিয়াশীল সংশোধনী বর্তমাত্র সরকার পাশ করায়, এখানেও ইসলামী সন্ত্রাসীও জঙ্গী তৈরীর আদর্শিক সুযোগ তৈরী হয়েছে। এবং ইসলামের প্রতি (অপরাপর ধর্মের প্রতি নয়) এক ধরণের দুর্বলতা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মহল থেকেও মাঝে মধ্যে প্রচারিত হয়। উচ্চারিত হয়। অথচ কোন ধর্মই রাষ্ট্রের ধর্ম হতে পারে না-আবার কোন রাষ্ট্রের ধর্ম আছে বলে প্রচার বা সংবিধান উল্লেখ করলে সে দেশের সমাজ মানসে সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম ও জেহাদের নামে নানাবিধ সন্ত্রাস ও জঙ্গীপনার গড়ে ওঠার সুযোগ থাকবেই। হেফাজতে ইসলাম তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এ প্রসঙ্গে “দেশ রূপান্ত’ নামক পত্রিকা গত ২ জানুয়ারি, ২০২০ এর সংখ্যায় “হেফাজতের ৬২ মামলা থেকে রেহাই চায় পুলিশ” শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা পাঠ করলে আমাদের বহু আলোচিত আইনের শাসন ও তার দাবীর অসারত্ব কতটা ব্যাপক তা অনুমান বা উপলব্ধি করা যায়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছেঃ

রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ। কারণ সাড়ে ছয় বছর আগের ঐ আলোচিত ঘটনার পর ঢাকাসহ সাতটি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। সেগুলির মধ্যে মাত্র একটির বিচার হয়েছে। তদন্ত শেষে ১৮ টি মামলায় আদালতে অবিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি দুটি মামলার ফাইন্যাল রিপোর্টও দিয়েছে পুলিশ। তবে বাকি ৬২ টি মামলার তদন্ত কার্য্যক্রম ও থমকে আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐ ৬২ মামলার কোনটিরই তদন্ত হচ্ছে না ‘রাজনৈতিক কারণে’। এ নিয়ে পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মামলাগুলোর দ্রুত সুরাহা চাচ্ছে পুলিশ। এ ধরণেরপ্রস্তুতি সেরে পুলিমের হাই কম্যা- সরকারের উ্চচ পর্য্যায়ে যোগাযোগ করেছে। তবে সেগুলোর ফাইন্যাল রিপোর্ট বা চার্জ শীট দেওয়ার গ্রীন সিগন্যাল পাওয়া যায় নি।

পুলিশ সদর সফতরের এক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, মামলাগুলোর অনেক আসামী জামিনে আছেন। তবে সেগুলির তদন্ত হচ্ছে না। এসব নিয়ে পুলিশের ভিতরে সমালোচনা হচ্ছে। পুলিশ চায় এগুলির দ্রুত সুরাহা। সুরাহার জন্য পুলিশ সদর দফতর স্বরাষ্ট্র। মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা যোগাযোগ করেছে। তারা পুলিশকে অপেক্সা করতে বলেছে।

ঐ কর্মকর্থা আরও বলেন, এমন কি ঘটনার পর পরই জুনায়েদ বাবুনাগরি (হেফাজতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা) সহ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ায় গটনায় বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ, এমন কে আনোয়ার ও রফিকুল ইসলাম মিয়াকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শান্তির দাবীতে ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক বলগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবীতে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল কওমি মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ঐ দাবী আদায়ে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকাতে নগরীর ছয়টি প্রবেশ পথ অবরোধ করে। ঢাকা ঘেরাও করে সরকারের পদত্যাগের দাবীতে। পদত্যাগ না করলে সরকার উচ্ছেদের ডাক দেবে চওলেও হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে হেফাজত।

এক পর্য্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় এবং নানাস্থানে পুলিশের সাথে সংঘাত সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়। তারা নানাস্থানে যানবাহন ভাংচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এসব ঘটনায় অনেকে হতাহতও হন। এক পর্যায়ে গভীর রাতে অবিযান চালিয়ে মতিঝিল থেকে তাদের মরিয়ে দেয় আইন শৃংখলা বাহিনী। এই

ঘটনাগুলিকেই কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৮৩ টি মামলা করে পুলিশ এবং তার মধ্যে ৬২ টি কেস এর কোন তদন্তই হয় নি গত সাড়ে ছয় বছরে।

ইতোমধ্যে কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চস্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান বলে স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার হেফাজতের দাবীর বিত্তিতে। হেফাজতের দাবীর ভিত্তিতে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনে তাকে সাম্প্রদায়িকী করণ করা হয়েছে; হাইকোর্ট প্রাঙ্গন থেকে জাষ্টিসিয়া নামক একটি শিশুকর্মকে সরিয়ে নিতে সরকার প্রদান বিচারককে পরোক্ষে বাধ্য করেছে প্রবৃতি।

শুধু তাই গত বছর ঢাকায় হেফাজতের এক বিশাল সমাবেশে খোদ প্রদানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে হেফাজতদের বিপুল করতালি দ্বারা সম্মানিত হন। তারা দাবী তোলে তাদের সর্বোচ্চ নেতা শাফি হুজুরকে “স্বাধীনতা পদক” প্রদানের।

এই বিষয়গুলি দিখার পর স্বভাবত:ই পুলিশ হেফাজতীদের বিরুদ্দে দায়ের করা মামলাগুলির চার্জশীট দিতে অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত।

তবে কি কেউ গাড়ীতে আগুন দিলে হত্যালীলা চালালে বলপূর্বক সরকার উচ্ছেদ করার ঘোষণা প্রকাশ্যে দেওয়া সত্বেও সরকার তাদেরকে নির্দোষ বানাতে তৎপর? স্বভাবত:ই প্রশ্নটি উঠবে এবং উঠেছে। অথচ অনুরুপ অবিযোগ বি এন পির নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে মোকর্দমার চার মোকর্দমা দায়ের জেল-জুলুম এবং সম্প্রতি বামমোর্চার শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশী হামলা প্রবৃতি কী নির্দেশ করে?

আইনের শাসন না থাকলে জঙ্গী নির্মূল, সন্ত্রাসী নির্মূল কোনটাই হবে না। বরং রাজনৈতিক কারণে হেফাজতের মত উগ্র সাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসী ও জঙ্গী উৎপাদনকারী সংগঠনের প্রতি দুর্বলতা দেখালে তা রাষ্ট্রের এবং সরকারি দলের চরম দুর্বলতা ও অনৈতিকতা হিসেবেই সর্বত্র বিবেচিত হবে।

মুজিব বর্ষে কামনা করবো এ সব দুর্বলতার, দোদুল্য মানতার অবসান ঘটিয়ে নিষ্ঠার সাথে একদিকে পঞ্চদল সংশোধনী বাতিল করে এবং অপরদিকে জঙ্গীদমনের পথের সকল প্রতিক’লতা এবং কঠোরভাবে আইন অনুযায়ী হেফাজতীদের বিরুদ্ধে মামলাগুলির বিচার ও সর্বোচ্চ শান্তির ব্যবস্থা করে দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে পরিণত করে এবং আইনের শাসন চালু করে বঙ্গবন্দু অনুসারে চলার দাবীকে যৌক্তিক বলে তুলে ধরা হোক।

লেখক : রণেশ মৈত্র, সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত।

পাঠকের মতামত:

২৪ জানুয়ারি ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test