E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

করোনা ভাইরাস ও মৌলবাদ

২০২০ মার্চ ২৩ ১৫:০৮:৩৫
করোনা ভাইরাস ও মৌলবাদ

রণেশ মৈত্র


বিশ্বব্যাপী মহামারী সৃষ্টিকারী মরণব্যাধি করোনা ভাইরাস (কোভিক-১৯) বাংলাদেশেও তার করাল থাবা ফেলেছে। এমন (২০ মার্চ, ২০২০) পর্যন্ত রোগটি বাংলাদেশে কোন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেনি কিন্তু পৌঁছানোর সকল আশংকা দৃশ্যমান।

করোনা ভাইরাসের উপত্তিস্থল চীন ও বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে যে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট নয়। তা যে এখন ও হয় তার বহু প্রমাণ আছে। বিষয়টি গোপন কিছু নয়। আজও বিমানে করে প্রতিদিন ৭০০ করে মানুষ ঢাকা বিমানবন্দরে ইউরোপ আফ্রিকা-এশিয়ার দেশগুলি এসে পৌছাচ্ছে কিন্তু ঐ প্রবাসীরা কোয়ারান্টাইন আবেক জনিত কারণে পরিবারের সদস্যদের সাথে মেলামেশা করার ফলে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। কোয়ারান্টাইন হোম কোয়ারান্টিনের বানী নীরবে নিভৃতেই কেঁদে মরছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত.... বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা সকল প্রকার গণ মাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত করা হচ্ছে কিন্তু যারা সরাসরি যাবতীয় নিয়মকানুন যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্যে অমান্য করে হাজার হাজার লাখো লাখো মানুষকে বিপদে ফেলার বা হাজারে হাজারে প্রাণহানি ঘটার আশংকা তৈরী করে চলেছে- তাদেরকে তো কোন রকম শাস্তি দেওয়ার ন্যূনতম উদ্যোগ দেখি না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সকল মহলের ব্যাপক দাবী ও নিন্দা প্রকাশের পর সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কর্তৃপক্ষ ও তাবৎ ক্লাস ও আবাসিক হলগুলি বন্ধ ঘোষণা করেছে কিন্তু প্রতি সপ্তাহে জুমা’র নামায উপলক্ষেও যেখানে শত শত মানুষ প্রতিটি মসজিদে নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে সমবেত হচ্ছেন তা স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে না কেন ? হিসেব করলে দেখা যাবে সমগ্র বাংলাদেশে শুক্রবারগুলিতে সাকুল্যে কম পক্ষে এক কোটি মানুষ জুম’আর নামাজে জমায়েত হচ্ছেন এবং তার দ্বারা মারাতœক বিপদাশংকা সৃষ্টি করছেন-তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে না কেন ?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ বিপদজ্জনক পোষ্ট দিচ্ছেন। কেউ কেউ লিখছেন “মুসলমান হলে মসজিদে জুম’আর নামাজ পড়বেই। তাতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাজারে হাজারে মরলেও তাঁরা সরাসরি বেহেশতে যাবেন।” অত:পর এই জাতীয় পোস্ট দিয়ে ধর্মপ্রাণ কোমলমতি মানুষদেরকে বিপদে ফেলতে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে যারা উদ্যত হয়েছেন তাঁরা আসলে ধর্মপ্রাণ ও দেশপ্রেমিক ও নন-নন মানব প্রেমিকও।

এ কথা নিদ্বির্ধায় বলে দেওয়া যায় যে যে কোন জায়গায়, যে কোন উপলক্ষ্যে বা যে কোন মুহুর্তে এই দুর্যোগের দিনগুলিতে জমায়েত সৃষ্টি করার পরিপরিণত হতে পারে ভয়াবহ-তাই এমন জমায়েত সৃষ্টিকারীদেরকে কঠোরভাবে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরী প্রয়োজন- যদি আমরা সত্যি সত্যি করোনা ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করতে চাই।

মৌলভী বাজারে, লক্ষীপুরে, অতি সম্প্রতি যে বিশাল বিশাল সমায়েথে ওয়াজ মাহফিলের নামি বিজ্ঞান বিরোধী প্রচারণা চালানো হলো তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করাতে সকল স্তরের মানুষ হতাশা ক্ষুব্ধ। স্পষ্টত:ই বুঝা যায়, সরকার এক্ষেত্রে অনেকটা অসহায় এবং তারা মৌলবাদী না হলেও মৌলবাদীদের কাছে আত্মসর্ম্পণ করে বসে আছেন।
বড় দুটি রাজনৈতিক দল করোনা ভাইরাস এবং তা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের আগ্রহ-অনাগ্রহ নিয়ে দ্বন্দ্ব কলহে লিপ্ত। কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছেন না দলীয়ভাবে এই রোগ সংক্রমনের ব্যাপারে জন-সচেতনতা তৃণমূল পর্যন্ত সৃষ্টি করতে বা সাবান, হ্যান্ড ওয়াশ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার মাস্ক, কিটস প্রভৃতি জনগণকে বিনামূল্যে সরবরাহ করতে। যেন রাজনৈতিক অঙ্গটি নিকষকালো অন্ধকারে দিন দিন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। একদিকে দেখি আত্মতৃপ্তির ঢেকুর-অপরদিকে চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রচার। ফলে সমগ্র রাজনীতিই মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা হারাচ্ছে।

একটু সম্ভাবনার আলো দেখাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন শাখা। ছাত্র ইউনিয়নে ছেলেমেয়েরা এক লক্ষটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরী করে দরিদ্র পবিারগুলির মধ্যে বিতরণ করতে শুরু করেছে। ছাত্র ইউনিয়নকে অজশ্র অীভন্দন। অনুরূপ কাজে কি ছাত্রলীগ-ছাত্রদল ও অনেক বেশী সাধ্যশক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে না ? পারলো না তেমন কিছু করতে-পারছেও না দশকের পর দশক যাবত। তারা এখন রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কামাই-রুজি গাড়ী-বাড়ির স্বপ্নে বিভোর। আর্ত জনগণের কথা ভাবার সময় তাদের নেই।

ডা. জাফরুল্লার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি কাজ করে ধ্যবাদই হয়েছেন। তাঁরা সম্প্রতি সন্তা দামে করোনা ভাইরাস চিহ্নিতকরণে যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন মাত্র ২০০ টাকা খরচ পড়বে ঐ কিটস তৈরীতে আর তার মধ্যে রোগ সনাক্ত করতে মাত্র ৩৫০ টাকা লাগবে প্রতিটি ব্যক্তির চেষ্ট করা বাবদে। উল্লেখ্য এখন ঐ কাজে ৫০০০ টাকা জনপ্রতি লিখে যাচ্ছে যার ফলে দরিদ্র সন্দেহভাজনরা রোগ চিহ্নিত করতেও ব্যর্থ হচ্ছেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, ঐ কিটস তৈরীর কাঁচামাল ইংল্যান্ড থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এসে পৌঁছাবে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাঁরা তার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করবেন-দ্রুতই কিটস বাজারজাত ও করবেন। সরকারের উচিত সকল প্রকার রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উর্ধে উঠে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই উদ্যোগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের শুভ পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানানো এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়ানো।

চীন থেকে উৎপত্তি হওয়া এই ভয়াবহ রোগ সংক্রমিত হয়েছে চীন থেকে ইউরোপে, মধ্যপ্রাচ্যে, আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ায়। গোটা বিশ্ব আজ গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা ধর্মের নামে যে সর্ব আয়োজন পরিচালনা করছে তা ভয়াবহ পনিণতি ডেকে আনতে পারে।

চীনে ধর্মের বাড়াবাড়ি নেই-তারা কিছুদিনের মধ্যেই বিজ্ঞানের সাহায্যে দেশটাকে করোনামুক্ত বলে ঘোষণা করেছে। অবশ্য তিন সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে এবং লক্ষাধিক মানুষ চীনদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল।

আবার গভীরভাবে ধর্মাশ্রয়ী দুটি দেশ সৌদি আরব ও ইরান দোয় দরুদ বা ধর্মীয় মাহফিলের পথে না হেঁটে প্রায় সবগুলি মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে এবং শুক্রবারের জামায়ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নিজ নিজ বাড়িতে নামাজ আদায়ের। আর আমরা ? ধর্মের নামে মানবতা হত্যায় আমরা কুণ্ঠিত নই কেন ?

পাকিস্তানে, ইন্দোনেশিয়ায়, মালয়েশিয়ায়, ইরাকে পর্যন্ত মসজিদগুলি সরকারি নির্দেশে বন্ধ ঘোষণা এবং জুম’আর নামাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের মুসলিমানিত্ব তাতে এতটুকুও কমছে না-ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না। কিন্তু যত ধর্ম-যত ইসলাম যত মুসলমান সব যেন বাংলাদেশে। তাও আবার হাল আমলে। ঐ সব দেশের মুসলিমরা কি তবে মুসলিশ নন?
আজ আর কালবিলম্ব না করে সরকারকে কঠোর হতে বলি। রাজনীতির নামে, ধর্মের নামে বা অন্য কোন নামেই যেন কোন জমায়েত না হয় অন্তত: পক্ষে করোনা ভাইরাস যেন দেশটাকে সম্পূর্ণ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত। প্রার্থণাগুলি মন্দিরে নয়, গীর্জায় নয়, মসজিদে নয় বা মাঠেও কোন সমায়েত নয়। মানুষ বাঁচানো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ বাঁচালে ধর্ম বাঁচবে, মন্দির-মসজিদ-গীর্জা সবই বাঁচবে।

লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

পাঠকের মতামত:

০১ এপ্রিল ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test