E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

সংকটময় মুহূর্ত ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য 

২০২০ এপ্রিল ২৭ ২৩:১১:০০
সংকটময় মুহূর্ত ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য 

গোপাল অধিকারী


মানবজীবনে সকল সময়েই প্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রয়োজনীয়তা বা সঠিক মূল্য প্রয়োজন। তবে সংকটময় মুহূর্তে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রয়োজনীয়তা ও সঠিক মূল্য থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওই মুহূর্তে মানুষ অসহায় হয়ে পরে। কথায় বলে সময়ের এক ফোঁর আর অসময়ের দশ ফোর। ঠিক তেমনি সুসময়ে মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তেমন বাধে না। কারন আয়তো আছে কিন্তু বর্তমান যে সময় চলছে করোনার কারণে সকলে নিজ নিজ বাড়িতে। এই সময়ে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি মাথায় বাঁশ পড়ার মত ঘটনাই বলা যেতে পারে। মনে মনে ভেবে দেখেন একসময় মানুষ যে জিনিস ৩ টাকায় ক্রয় করত এখন তা ৫ টাকায় ক্রয় করছে। তেমন কিন্তু প্রভাব পড়ে নাই কারণ আয় বাড়ছে। কিন্তু সবসময় কি এভাবে চলা সম্ভব?

মানুষের মৌলিক চাহিদা ছিল ৫টি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। বর্তমানে একটি যোগ হয়েছে তা হলো নিরাপত্তা। আর এই খাদ্য তালিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। মানুষের দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের রয়েছে ভাত, মাছ, কাঁচাবাজারসহ প্রয়োজনীয় সবজি। বিভিন্ন কারনেই কিন্তু অনেক সময় মূল্য বৃদ্ধি পায় এই সকল দ্রব্যের। বিশেষ করে কোন এক অজুহাতের সুযোগ পেলেই দাম বাড়িযে দেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারপর চলে সাপ-লুডু খেলা। ক্রেতারা বলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।

দোকানদাররা বলে দ্রব্যের কেনা বেশি মূল্যে অথ্যাৎ মহাজনরা বেশি দামে বিক্রি করছে তাই মূল্য বেশি করে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর মহাজনরা অথ্যাৎ বড় বড় ব্যবসায়ীরা বলেন, সিন্ডিকেট দাম বাড়িয়েছে, বর্হিবাজারে দাম বেশি ইত্যাদি ইত্যাদি। সবদোষ এবার সিন্ডিকেটের কাঁদে। আর সিন্ডিকেটের আকার এতই বড় যে তাকে ধরতে ধরতে মৌসুম শেষ। যেমন পিয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সকলের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে এমন সবকিছু লক্ষ্য করা যায়। আর করবেই না কেন? কথায় বলে পিঠে মারলে সহ্য করা যায় কিন্তু পেটে মারলে সহ্য করা যায় না। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভঙ্গুর হলে নিরক্ষর শ্রেণির মাথা ব্যথা থাকে না। কারণ সেটা শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘন। তারা ভাবে শিক্ষিত সমাজ দেখভাল করবে।

যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান থাকে তখন রাজনৈতিক নিরপেক্ষরা ভাবে আমি দিন আনি দিন খাই রাজনীতি যা হয় হোক। ভোট আসলে পরিবেশ ভাল থাকলে ভোট দিব না থাকলে যামু না। এটা রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন। কোন শ্রমিক কোন কারখানায় বেতন বা যথার্থ পারিশ্রমিক না পেলে ওই প্রতিষ্ঠান ব্যতিত অন্য প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা ভাবে না। কারণ তারাতো ন্যায্য মজুরী পাচ্ছে। এটা অর্থনৈতিক বৈষম্য। কিন্তু খাদ্যপণ্য নিয়ে কোন রদবদল হলে সকলেই কিন্তু ম্যাথা করে বা করবে। কারণ একজন রাজনৈতিক নেতা যে খাবার কিনবে একজন শ্রমিক, একজন শিক্ষক সকলে কিন্তু একই খাদ্যপণ্য কিনবে তাহলে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিতে কেন প্রতিক্রিয়া দেখাবে না?

আমার জানা মতে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় দ্রব্যই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। তাহলে কেন মূল্য বৃদ্ধি হবে? কেন এই দেশি পণ্যের বাজার সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলো? এ দায় কার? বিশেষ করে সংকটময় সময়ে যদি কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় তবে তা হয় বেশি মন্দকর। জানি রাজনীতিতে “উদোড় বোঝা বুধোর কাঁদে” এমন পরিস্থিতি আছে। দাম নিয়ে মন্তব্য জানতে চান, সরকারি দলের নেতা বা মন্ত্রীরা বলবে, বিএনপি’র সিন্ডিকেট দাম বৃদ্ধি করেছে। বুঝলাম বিএনপি’র কেহ করেছে। আপনারা কি করছেন? বিএনপি’র নেতা কি আইনের উর্ধ্বে? আইন কি পকেটে রেখেছেন? সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেন। জনগণের সামনে হাজির করেন। মুখের কথাতো জনগণ আর মানছে না। বিএনপির কাছে মন্ত্রব্য জানতে চান, বলছে বা বলবে সরকার ব্যর্থ তাই দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। বুঝলাম সরকার ব্যর্থ তো আপনারা কিছু করেন দেখান না কি? আপনারাতো বলছেন সরকারের পক্ষে জনগণ নেই। জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সেই জনগণকে নিয়ে আপনারা কিছু করে জনগণকে দেখান না কি? এমন কোন কাজ কিন্তু আমরা রাজনীতিতে দেখি না। শুধু বক্তৃতা শুনি।

তবে আসার আলো এই যে, বর্তমানে সরকার দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে খুবই কঠোর। লবণের দামবৃদ্ধি নিয়ে গুজবের সাথে সাথে তা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা সংক্রমনের অজুহাতে চালের মূল্য বৃদ্ধি এমন গুজব শোনার সাথে সাথেই তা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন দেশ একটি ক্রান্তিসময় অতিবাহিত করছে। উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ সকল কর্মকান্ডই বন্ধ। আর কয়েকদিন পরেই শুরু হবে মাহে রমজান। করোনার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে চাউল,ডাল, পেঁয়াজ, চিনি, আটা, আদা, রসুন, ভোজ্যতেল, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে আদা ছিল ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি বর্তমানে সেই আদা ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি। কাচা বাজার ছাড়াও বিভিন্ন মুদিপণ্য না পাওয়ার অজুহাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দাম বৃদ্ধির পেছনে ক্রেতা সাধারণও দায়ী বলে আমার মনে হয়।

করোনাভাইরাসজনিত আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে ক্রেতা সাধারণ খাদ্যপণ্য ও ওষুধ কিনে বাড়িতে মজুদ করছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে ভোক্তাদেরও। ক্রেতাদেরও আতঙ্কজনিত ক্রয় থেকে বিরত থাকতে হবে। এটা ঠিক, অনেকে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যপণ্য ক্রয় করছেন অচিরেই পণ্য মিলবে না এই ভয়ে। তবে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী উভয়েই। এ অবস্থায় খাদ্য নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বরং আতঙ্কজনিত ক্রয় থেকেই সৃষ্টি হতে পারে সংকট।

একটি বিষয় সবাইকে অনুধাবন করতে হবে- বৈশ্বিক সংকটের অংশ হিসেবে করোনাভাইরাস এখন এ দেশেও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সংকটকালীন মুহূর্তে সবার কাছ থেকেই দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা যদি বাজার থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে নেন, তাহলে বাজারে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হবে তাতে বিপাকে পড়বেন স্বল্প আয়ের মানুষ। সবচেয়ে বিপদ হবেন দিনমজুররা। কাজেই ভোক্তা হিসেবে সবারই সংযত ও যৌক্তিক আচরণ করা প্রয়োজন। এ অবস্থায় মানুষকে কেবল ব্যক্তিস্বার্থের কথা ভাবলে চলবে না। গোটা দেশবাসীর কথা কথা ভাবতে হবে। একইসঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ফায়দা লুটতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ী নেতাদের সজাগ থাকতে হবে। দায়িত্ব রয়েছে সরকারেরও। সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই আমরা এ সংকট থেকে রক্ষা পেতে পারি।

সারা দেশে অসাধু ব্যবসায়ীদের এক অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্রের শক্তির উৎস খুঁজে বের করে তা ভেঙে দিতে হবে। লক্ষ করা যায়, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বস্তিদায়ক যেসব তথ্য দেয়া হয়, অনেক সময় তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।। এর মূলে রয়েছে কিছু ব্যবসায়ীর কারসাজি। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া না হলে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা স্থায়ী সুফল বয়ে আনবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। দেশের সকল প্রশাসন যদি কঠোর আবস্থান ও মনিটরিং অব্যাহত রাখে তাহলে আমার মনে হয় কোন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যই আর বৃদ্ধি পাবে না। যেহেতু বাংলাদেশ উন্নতির পথে তাই এগুলো ঘটতেই থাকবে।

সরকারের উচিত ধান বা গমের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যপণ্যের গুদামজাত করা। যেন প্রতিবছর কোন না কোন ক্ষেত্রে জনগণের এমন নাভিশ্বাস না হয়। সেই সাথে সরকারকে হার্ড লাইনে থাকা উচিত। একটি নির্দেশনা দেওয়া উচিত নির্ধারিত টাকার বেশি দামে কেউ এই পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। সাথে সাথে সকল দোকানীরা এই নিয়ম মানছে কি না তা নজরে রাখতে হবে। তাহলে যে কিনবে সেও কিনবে না। কারণ সে বিক্রি করতে পারবে না। দোকানী না কিনলে মালিক বা সিন্ডিকেটও বিক্রি করতে পারবে না। তখন দাম বাড়ার সম্ভাবনা মনে হয় থাকবে না। সেই সাথে ক্যাসিনো অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার উর্ধ্বগতি না হয়। কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার বৃদ্ধি দেশের সকল নাগরিকের সকল সাফল্যকে ম্লান করে দিতে পারে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, “ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কখনও রাজনৈতিক উপদেষ্টা হতে পারে না”। তার সাথে আমি একমত পোষন করে বলতে চাই, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি কোন দেশের উন্নয়ন চিন্তা করা যায় না। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিজে দায়িত্ব সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

০৪ জুন ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test