E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

আওয়ামী লীগের গন্তব্য কোথায় কে জানে 

২০২০ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৪:২৪:২৮
আওয়ামী লীগের গন্তব্য কোথায় কে জানে 

আবীর আহাদ


মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্বপ্রদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ । দিন দিন দলটি যেভাবে চরম দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত হতে হতে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে তা ভাবতেই কষ্ট হয় । তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও তার সমর্থকরা ক্ষমতার রঙিন স্বপ্নে বিভোর থেকে তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বুঝতে পারছেন না । এই দলের প্রতি আমাদের সবিশেষ দুর্বলতা এই যে, এই দলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো-----আমরা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলাম । দলটির ভালো দেখলে আমরা আনন্দিত হই, খারাপ দেখলে পীড়িত হই । আহত হই । হতাশ হই ।

যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন উপমহাদেশের সবচে' সুশিক্ষিত, দূরদর্শি, অবিভক্ত বাংলাসহ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-----যার প্রাথমিক নেতৃত্বে ছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিব । সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ ও পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা । উনিশশো একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর সুমহান নেতৃত্বে, নির্দেশনায় ও আদর্শে জাতীয় নেতা তাজউদ্দিনের মুজিবনগর বিপ্লবী সরকারের পরিচালনায় ও ব্যবস্থাপনায় বীর মুক্তিবাহিনী ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন ।

উনিশশো পঁচাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অপশক্তির চক্রান্তে মোশতাক-জিয়াচক্র বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে আওয়ামী লীগের গোটা নেতৃত্বকে উৎপাটিত করে ফেলে । সময়ের পরিক্রমায় উনিশশো একাশি সনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের সার্বিক নেতৃত্ব এসে পড়ে । শেখ হাসিনার পাশে এসে দাঁড়ান আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, জোহরা তাজউদ্দিন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ একঝাঁক তরুণ মুক্তিযোদ্ধানেতা । কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরেথেকে ব্যক্তিসার্থ উদ্ধারে লিপ্ত কিছু নাবালক ও একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষীচক্রের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ফলশ্রুতিতে আবদুর রাজ্জাক, ড. কামাল হোসেন , কাদের সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের সাথে শেখ হাসিনার দূরত্ব বাড়তে বাড়তে একসময় বিভিন্নজন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন । এই সুযোগে মধুলোভী মৌমাছির মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অসৎ লুটেরা চাটুকর সুবিধাবাদীসহ বিতর্কিত লোকজন শেখ হাসিনার পাশে এসে জড়ো হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা তাঁর চারপাশে এমনসব শক্ত দেয়াল উঠিয়ে দেয় যাতে দলের সৎ ত্যাগী মেধাবী লোকজন তাঁর থেকে যোজন যোজন দূরে ছিটকে পড়ে !

ছিয়ানব্বই থেকে দু'হাজার এক এবং বিশেষ করে দু'হাজার নয় থেকে অদ্যাবধি ক্ষমতাসীন থাকাকালে এমন কিছু অপ্রয়োজনীয় লোককে দলে, মন্ত্রিসভায় ও উপদেষ্টামন্ডলিতে ঠাঁই দেয়া হয়েছে যারা সীমাহীন লুটপাট দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্যা উঠিয়ে দিয়ে দল ও দেশের অশেষ ক্ষতি করে চললেও তারা বহালতবিয়তে বিরাজ করে চলেছে ! প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সৎ ও মেধাবীদের কোণঠাসা করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপি ঘরানার অসৎ লোকদের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে বসানো হয়েছে । এতকাল একনাগাড়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন, এসময়ের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ দিলে এখন তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে অবস্থান নিতে পারতো ।

কিন্তু দু:খজনক সত্য যে, নানান মারপ্যাঁচে ফেলে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের দূরে রাখা হয়েছে । আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব একথাটা ভাবতে পারতেন যে, মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা অন্তত: আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের বাবাদের সৃষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র করতো না এবং অন্য কাউকে ষড়যন্ত্র করতেও দিতো না । আওয়ামী নেতৃত্ব একনাগাড়ে এতো বছর ক্ষমতায় আছেন-----অনেক অভিজ্ঞতায় তারা সমৃদ্ধ হওয়ার কথা, কিন্তু তারা জানেনই না যে, কোন আমলাকে কোন মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং দিতে হবে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাকে কাকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা করতে হবে । উচ্চতর আদালতে কাদের বিচারপতি করতে হবে, সরকারি ব্যাঙ্কে কাদের চেয়ারম্যান-পরিচালক করতে হবে ! আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জানেন না, কাকে কাকে তার দলের উপদেষ্টা পরিষদে, সভাপতিমন্ডলীতে, সম্পাদকমণ্ডলীতেসহ অন্যান্য সহযোগি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে কাকে কাকে কোন পদ বসাতে হবে !

তারপর আসি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ে । চলতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ে এমন এক বেয়াক্কেলচক্রকে একটি অপরিপক্ক নির্দেশিকা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যারা পূর্বের প্রায় পঞ্চাশ হাজার ভূয়া তাড়ানো দূরের কথা, মোটা অর্থের বিনিময়ে তাদের বহাল রেখে আরো হাজার হাজার ভূয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর খেলায় মেতে উঠেছে ! এ প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় ও সম্মানহানি করা হয়েছে !

দেশের ব্যাঙ্ক শেয়ারবাজার ও উন্নয়নমূলক সেক্টরে লুটেরা-দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ব আজ সর্বজনবিদিত ।
দেশের মানুষের কাছে ঘৃণিত কিছু কিছু লুটেরা-দুর্নীতিবাজ যখন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঠাঁই পায় তখন দেশের মানুষ অনেককিছু ভেবে বসে । এবং একথাও দিবালোকের মতো সত্য যে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক পদে অযোগ্য এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শিবিরের লোকজনদের পোস্টিং দেয়া হয় । এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেলেঙ্কারিই সবচে' একটি বড়ো উদাহরণ । এভাবে প্রতিটি সরকারি ছোট বড় ও মেগা প্রকল্প এবং সরকারি কেনাকাটার মধ্যে সাগরসম অর্থ আত্মসাতের ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। । এসব দুর্নীতি ও লুটপাটের মধ্যে রয়েছে ভাগাভাগির কারসাজি । মাঝে মাঝে দু'চারটা দুর্নীতিবাজ লুটেরা ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে আখেরে কোনোই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না ।

পরিশেষে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী আওয়ামী লীগ কি এতোটাই আকালে ভুগছে যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানসহ লক্ষ লক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লোকজন থাকতে---- অথবা তাদের নির্দয়ভাবে দূরে রেখে বা অপমান-অপদস্ত করে তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত শিবির বিএনপি ও হেফাজতের ক্রিমিনালদের দলে ঢুকিয়ে তাদের জন্য দলের চেয়ার এগিয়ে দিতে হবে ? এটাই ঘটে চলেছে । দলের হাইকমান্ডের অনুমোদন নিয়েই ঐসব অপরাধীচক্রকে আওয়ামী লীগে নেয়া হয়েছে / হচ্ছে, এটাই সত্য ! এর পশ্চাতেও রয়েছে অর্থ ও আত্মীয়তা ।

প্রকৃত কথা হচ্ছে, ভোগ লোভ লালসা ও একচ্ছত্র ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয় । এসবের সাথে যোগ হয় আবার সংকীর্ণতা ও পরশ্রীকাতরতা । তখন সে হিতাহিতবোধশূন্য হয়ে পড়ে । চোখ বন্ধ করে সে শুধু রঙিন খোয়াব দেখে । কিন্তু অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না ।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আজ মহাপরীক্ষার সম্মুখীন । তাকে চারদিক থেকে অশণিরা ঘিরে ফেলেছে তারই ভুল ও লোভের কারণে । কোথায় তার শেষ গন্তব্য কে জানে ? তবে শেষ কথা হচ্ছে : আওয়ামী লীগকে আজ কঠিনভাবে আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম করতে হবে । তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সৎ ত্যাগী ও মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে । দলের ভেতর থেকে রাজাকার পরগাছা লুটেরা দুর্নীতিবাজ সুবিধাবাদী ও চাটুকারদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে । তবেই সে আবার মহিমায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে । অন্যথায় তার ধ্বংস অনিবার্য ।

লেখক :মুক্তিযোদ্ধা লেখক গবেষক, চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

পাঠকের মতামত:

২৮ অক্টোবর ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test