E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

পর্ব-১

বাংলাদেশের বাম আন্দোলন

২০২২ জানুয়ারি ২২ ২২:২৫:৪৩
বাংলাদেশের বাম আন্দোলন

রণেশ মৈত্র


বাংলাদেশের রাজনীতির সামগ্রিক চিত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে বামপন্থী দল, সংগঠন, ব্যক্তি এবং চিন্তা-চেতনা, আদর্শিক অবস্থান সব কিছুই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। এমন একটা ধারণা আদৌ কল্পনা প্রসূত নয় বরং গভীরভাবে এক বেদনাদায়ক সত্য। যা কিছু সংগঠন নামে বা সাইনবোর্ডে দেখা যায়, তা কতটা প্রকৃত বামপন্থী আদর্শে অনুপ্রাণিত তা-ও বিশেষ করে ভাবনার দাবী রাখে।

প্রকৃত সত্য হলো এই যে, বামপন্থী হতে হলে তার তাত্ত্বিক বই পুস্তক পড়তে হবে। তার বিশ্লেষণ করতে হবে, তা থেকে সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাদেরকেও বামপন্থী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে সক্রিয় ময়দানে ভূমিকা নিতে অনুপ্রাণিত করতে হয়। এগুলি অতি পুরাতন কথা।

গভীর দেশপ্রেম হলো বামপন্থী নেতা-কর্মীদের এক অসাধারণ বৈশিষ্ট তবে তা আদৌ বিন্দুমাত্র সংকীর্ণ অর্থেনয়। দেশকে যেমন একাগ্রচিত্তে ভালবেসে তাঁরা দেশের নিপীড়িত নির্য্যাতীত মানুষকেও একইভাবে ভালবাসে বামপন্থীরা তেমনই আবার পৃথিবীর সকল দেশের নিপীড়িত নির্য্যাতীত শোষিত মানুষকেও ভালবেসে থাকেন বামপন্থীরা। এই ভালবাসা কোন কথার কথা নয়। এর বাস্তব প্রকাশ রাপথের রাজনীতিতে ফুটিয়ে তুলতে বহুদিন যাবত দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু এ-ও সত্র যে, একদিকে দেশের শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত নির্য্যাতীত মানুষকে ভালবাসা অপরদিকে পৃথিবীর সকল দেশের অনুরূপ মানুষগুলির প্রতি ভালবাসার বাস্তব রূপ দেশ-বিদেশের মানুষের সামনে ফুটিয়ে তুলতে হলে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা বহুদিন যাবত তাঁদের সেই আবার এ-ও সত্য যে, এই কাজটি মুখে বলা যতই সহজ, বাস্তবে তা সম্পাদন করা ততই কঠিন

বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের দিকে তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে তাকালে উপরের কথাগুলির যাথার্থ দিব্যি চোখে পড়ে। বুঝা যায়, যতটুকুও বা জনবল আছে তার চেতনা এবং আদর্শের ভিত সম্ভবত: ততটা মজবুত নয়। কোথাও কোন সংগঠন, কোথাও কোন শিক্ষাকেন্দ্র, কোথাও কোন আন্দোলন দেখা যাবে না। কেন? শুধুই কি লোকাভাব? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা কিন্তু একেবারেই তেমন যুক্তি সমর্থন করে না।

আমি নিজেও একজন বামপন্থী। আজকের না। পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকে। তাই জীবনভর দেশের বাম আন্দোলনের গতিধারা, তার উত্থানপতন সব কিছুরই একজন দর্শক মাত্র নই বরং তার একজন উৎসাহী কর্মীও। তাই অতীতের এভং হাল আমলের অভিজ্ঞতা থেকেই বাম আন্দোলনের ভবিষ্যত কেমন হওয়া উচিত বিশেষ করে বাংলাদেশের সেই আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছি। আশা করবো বাম সংগঠন, বাম-আন্দোলন গড়ে তোলা ও তার বিস্তার ঘটানোর পথ পদ্ধতি নির্ধারণের লক্ষ্যে এবং এই আন্দোলনকে গণ-সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সমমনা নেতা-কর্মীরাও এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে স্বত:স্ফূর্তভাপবে এগিয়ে আসবেন।

বর্তমানের ও ভবিষতের বিষয়ে আলোচনার আগে সংক্ষেপে নিকট অতীত সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন এ জন্যে নয় যে অতীতের গৗেরবের কাহিনী স্মরণ করে সেই গৌরবের অংশীদার বলে নিজেদেরকে দাবী করে এক ধরণের তৃপ্তির ঢেকুর তোলা। নিকট অতীত বলতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-উভয় আমলের কথাই সংক্ষেপে উল্লেখ করাটা প্রাসঙ্গিক মনে করি।

বামপন্থীদের জন্য গোটা পাকিস্তান আমল ছিলো নিষিদ্ধ যুগ কখনো ঘোষিত কখনও আবার অঘোষিত। এই অঘোষিত যুগটাই পাক আমলের ২৩ বছরের মধ্যে প্রায় ২২ বছর। ফলে এই দীর্ঘকাল ধরেই কমিউনিষ্টদেরকে আত্মগোপনে থেকে কাজ করতে হয়। তদুপরি পাকিস্তান আমলাটা ঘোর সাম্প্রদায়িক আমল হওয়ায় এবং তখন পর্য্যন্ত প্রধানত: হিন্দু পরিবার থেকেই কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগদান করায় কমিউনিষ্টদের সামনে নতুনবিপদ উপস্থিত হয়। সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র সরকারের পক্ষ থেকে নয়-তৎকালীন সমাজেও ব্যাপকভাবে বাসা বেঁধেছিল পাকিস্তান আমল ও ইংরেজ আমলে দফায় দফায় সংঘটিত রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে। এটি প্রকাশ্যে এলো যখন আত্মগোপনকারী ফরিদপুরের প্রবীন ও জনপ্রিয় নেতা প্রয়াত আশু ভরদ্বাজ ঈশ্বরদী আসেন-তখন তাঁকে চিনে ফেলা মানুষেরাই তাঁকে রাষ।ট্রদ্রোহী পাকিস্তানের দুশমন, ভারতের দালাল প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত লোকের সামনে বেদম প্রহার করে পুলিশ দিলে পুলিশ তাঁকে ঐ একই ধরণের অভিযোগে জনপিরাপত্তা আইনে আটক করে একটানা আট বছর কারাগারে আটকে রাখে। এমন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্য্যাতনের অসংখ্য কাহিনী ইতিহাসে স্থান পেতে পারে যদিও তা বই আকারে লেখার মত তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ মারাত্মকভাবে করেম গেছে। বহু পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে জমি-জমা বাড়ীঘর দখল করে নেওয়া হয়েছে শত শত কমরেডকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে অনেক কমরেড বাধ্য হয়ে দেশত্রাগী হন-বাদবাকীরা হয় আত্মগোপনে নয়তো কারাগারে স্থান পান দীর্ঘকালের জন্য।

এই অন্ধকার ভেদ করে আলোর রশ্মি দেখা দিলো ১৯৪৮ এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন কর্মচারীদের আন্দোল ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। মূলত: অবিভক্ত ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের যে নেতা-কর্মীরা পাকিস্তানে চলে এলেন ও থেকে গেলেন তাঁদের উদ্যোগে ও তাঁদের একাংশ শেখ মুজিব প্রমুখ কর্তৃক গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের জাতীয়তাবাদী অংশ মিলে ৪৮ এর ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন। পাবনাতেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। ঘটেছে সমগ্র পূর্ব-বাংলাতেই। এই আন্দোলনের মাধ্যমে কমিউনিষ্ট নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে থেকেও নড়ে চড়ে বসলেন এবং এই আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৫২ তে এসে এই আন্দোলন ব্যাপক গণ সম্পৃক্তি অর্জন করলো শেখ মুজিব জেল থেকেও সমর্থন জানালেন ভাষা আন্দোলনকে। প্রধানত: বামপন্থীরা এ আন্দোলনের বিস্তার ঘটাওেলন দেশব্যাপী। মুসলিম লীগের একাংশ, মুসলিম ছাত্র লীগের একাংশ, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যেমন মওলানা আবদুল খান ভাসানী , মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ প্রমুখ যাঁরা বইরে ছিলেন ও বামপন্থীদের উদ্যোগে গঠিত গণতান্ত্রিক যুবলীগ (বিজয়োত্তর পূর্ব বাংলায় গঠিত সর্বপ্রথম অসাম্প্রদায়িক সংগঠন) সম্মিলিতভাবে এ আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর করে নিতে গিয়ে বিস্তর জেল জুলুমের শিকার হন বটে কিন্তু এই আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁদের জনসম্পৃক্তি পুনরুদ্ধার হতে থাকে, নতুন আশাবাদেরও সৃষ্টি হয় আবার সমাজে মুসলিম লীগের কবজাও শিথিল হতে থাকে। সাম্প্রদায়িকতার হ্রাস পেতে সুরু করে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন উন্সেষের পথ প্রশস্ত হতে থাকে।

এবারে গণছাত্র সংগঠন হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয় গোপান কমিউনিষ্ট পার্টির অপ্রকাশ্য উদ্যোগে। কোন অঙ্গ সংগঠনের চরিত্র না দিয়ে সংগঠনের মেনিফেষ্টোয় আস্থঅ স্থাপনকারী যে কোন দল মতের অনুসারী ছাত্র ছাত্রীদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয় ছাত্র ইউনিয়নের।

ভাষা আন্দোলনের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণ বিরোধী আবেদন দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গ্রামে গঞ্জে পর্য্যন্ত এই নতুন সংগঠনের বিস্তার ঘটে। দু’এক বছরের মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়ন পূর্ববাংলার বৃহত্তম ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়। পাশাপাশি সংগঠনের নামের সাথে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকায় ছাত্রলীগ সারাদেশেই তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে-কলেবরও ক্ষীণতর হতে থাকে।

ছাত্র ইউনিয়ন দেশে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়। ধীরে ধীরে আওয়ামী মুসলিম লীগও তার শাখা প্রশাখা দেশব্যাপী গড়ে তুলতে থাকে-এক পর্য্যায়ে এসে আওয়ামী মুসলিম লীগ তার নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। দলকে অসাম্প্রদায়িকী করণে বিশেষ ভ’মিকা রাখেন দলীয় সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবর রহমান। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দেয়। মুসলিম লীগের প্রভাব দ্রুত কমতে থাকে এককভাবে রাজনীতির অঙ্গনে দল হিসেবে স্থান করে নেয় আওয়ামী লীগ।

বামপন্থীদের রাজনৈতিক কৌশল

কঠিন কঠোর নিষেধাজ্ঞা, জুলুম, অত্যাচার নির্য্যাতন থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কমিউনিষ্ট পার্টি যে একটি গণসম্পৃক্ত পার্টিতে পরিণত হতে পারবে না-এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনার ম্েযধ দিয়ে আত্মগোপনে থাকা কমিউনিষ্ট পার্টিকে নানা কৌশল গ্রহণ করে এগুতে হয়। দ্বিমত বহুমত অবশ্যই ছিল কিন্তু পরিষ্ঠমতের ভিত্তিতে স্থির হয়:-

এক. জনগণের মধ্যে কমিউিিনষ্ট হিসাবে কম পরিচিতি আছে, এমন কমরেডরা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তাঁদের স্থান জনতার মধ্যে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ তোয়াহা, ভাষা মতিন, অলি আহাদ আবদুস সামাদ আজাদ বেগম সেলিনা বানু প্রমুখ ম ধ্যবয়সী বহু নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং কাজ ও সুনামের ভিত্তিতে অনেকেই দলটির প্রাদেশিক কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন ।

দুই. ছাত্রত্ব শেষ হলে ছাত্র ইউনিয়নের কমিউনিষ্ট ও সাব্যস্তের নেতারাও আওয়ামী লীগে যোগ নেবেন।

তিন. ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের আগ থেকে যে সকল জেলায় ছাত্র কমিউনিষ্টরা ছাত্র লীগ করছিলেন তাঁরা ছাত্র লীগেই থেকে পার্টি বৃদ্ধির কাজেও আত্মনিয়োগ করবেন।

চার. ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পর ছাত্র ইউনিয়নের কমিউনিষ্টরা পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক কৃষক, শ্রমিক শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহে কাজ করবেন ও অত্যন্ত সাবধানতার সাথে সেকানকার বিশ্বস্ত কর্মীদেরকে ধীরে ধীরে কমিউনিষ্ট পার্টির সমর্থক, সদস্য হিসেবে গড়ে তুলবেন;

পাঁচ. এভাবে ফ্যাকশনাল কাজ নানা সংগঠনে করলেও কমিউনিষ্ট হিসেবে নিজের পরিচিতি গোপন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।

এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত পার্টির জনসম্পৃক্তি বিস্তারে যথেষ্ট কাজ করেছিল। আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীও কমিউনিষ্টদের নানাভাবে বিস্তর সহযোগিতা করেছেন। তদুপরি দেশে সাম্প্রাজ্যবাদ বিরোধিতা সাম্প্রদায়িকতায় বিরোধিতা এবং সমাজতন্ত্রের অনুকূলে তাঁর ভূমিকা ছিল আপোষহীন যার ফলেও কমিউনিষ্টদের কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে সহায়ক হয়েছে। কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর দান অবিস্মরণীয়। দীর্ঘদিন তিনি কৃষক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

লেখক : সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ, একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক।

পাঠকের মতামত:

২৯ মে ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test