E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

নারী নির্যাতন দেশে দেশে, গলদ কোথায়?

২০২৩ নভেম্বর ২৪ ১৬:৫৬:৪০
নারী নির্যাতন দেশে দেশে, গলদ কোথায়?

মীর আব্দুল আলীম


নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার। এমনকি জাতিসংঘ থেকেও  নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা কথা বলা হয়েছে বারবার। তবু কেন দেশে দেশে নারী নির্যাতন হচ্ছে? নারী নির্যাতন একটি দুঃখজনক বাস্তবতা। যুগে যুগে নারীরা তাই অনিরাপদই থেকে গেছে। নারীর প্রতি অপরাধ কঠোর হাতে দমনের বিকল্প নেই।

ভাবতাম আমাদের দেশের নারীরা বুঝি অনেক বেশি নির্যাতিত। সম্প্রতি ভারতের দিনাজপুর, শিলিগুড়ি এবং কলিকাতার কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এখানকার নারীদের কষ্টের কথা কবিতা তাঁদের বক্তৃতায় খুঁজে পেলাম। তাঁদের কাছ থেকে যে বইগুলো উপহার হিসেবে পেয়েছি তা ঘেঁটে দেখলাম এখানকার নারীরা আমাদের দেশের চেয়েও বেশি অনিরাপদ। কৌশলের তার তাঁদের লিখনীতে তা প্রকাশ করেছে।

কষ্ট লাগে যে আমরা দিন দিন আধুনিক হচ্ছি; দিবস আসছে দিবস যাচ্ছে কিন্তু আমাদের নারীরা নিরাপদ হচ্ছে না। প্রশ্ন হল নারীরা কবে নিরাপদ হবে? ঘরে বাইরে কোথাও কি নারী নিরাপদ? আমাদের এ সমাজের পুরুষেরা ঘরের বাইরে নিপাট ভদ্রলোক! অনেকে প্রায়ই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছুঁড়েন। মঞ্চ সেমিনার কাঁপিয়ে তোলেন। জোর গলায় বলেন-‘নারীরা মায়ের জাতি, নারী নির্যাতন করবেন না’। মাইকে গলা ফাঁটিয়ে বক্তৃতা করেন-“বউ পেটানো লোক আমি দু‘চোখে দেখতে পারি না।” এজাতিয় ভদ্রলোকেরা বিচার সালিশে নারী নির্যাতনকারী পুরুষ পেলে বেশ শায়েস্তাও করেন।

এ বিষয়ে নসিহত করেন; হাদিস কোরানের আলোকে পরামর্শ দেন-“বউ ঘরের লক্ষী; কখনো বউ পেটাবেন না। আল্লাাহ নারাজ হবেন।” কিন্তু নিজ ঘরে ঢুকলেই এদের অনেকেই এক অন্য মানুষ। বউয়ের কাছে এলেই মুখোশ খুলে যায় ওদের। আমাদের সমাজে নেত্বদানকারী এমন পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভুঁড়ি ভুঁড়ি। কি রাজনৈতিক, কি ডাক্তার, উকিল, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক কেউ বাদ নেই এ তালিকা থেকে। তারা বিবেক সম্পন্ন উঁচু তলার মানুষ তবুও এ কর্মটি করেন নির্লজ্জভাবে। যারা জনগনকে সচেতন করবেন; নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবেন; তারাই যদি নির্যাতন করেন তাহলে নারী নির্যাতন বন্ধ হবে কি করে?

এবিশ্বে নারী নির্যাতনকে অগ্রহনযোগ্য উল্লেখ করার সুযোগ নেই। নারী নির্যাতনের কোন ব্যাখ্যা থাকতে পারে না এবং এটি কোনক্রমেই সহনীয় নয়। বিশ্বের কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ নারী তার জীবনের কোন না কোন সময়ে শারিরীক নির্যাতন কিংবা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এটা আমার কথা নয় জাতিসংঘের একটা পরিসংখ্যান। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ভ্রুনের লিঙ্গ সনাক্তকরণের পর বহু মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের মোট নারীর শতকরা ৭০ ভাগ কমবেশী নির্যাতনের শিকার হয়। এ পরিসংখ্যান থেকেই বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন যে কত অমানবিক অবস্থায় পৌঁছেছে তা অনুধাবন করা যায়। তবে নারী নির্যাতনের ধরন এক এক সমাজে এক এক রকম এবং কোথাও কোথাও নারীদের হত্যা করার মাধ্যমে নির্যাতনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যেসব নারী হত্যাকান্ডের শিকার হয়, তাদের শতকরা ৪০ ভাগ নিহত হয় তাদের স্বামীদের হাতে। নারী নির্যাতনের ঘটনা শুধু যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে হয়, তাই নয়, বরং পশ্চিমা দেশগুলোতেও ব্যাপক মাত্রায় নারী নির্যাতন চোখে পড়ে। মার্কিন ফেডারেল পুলিশ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ তাদের স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন চালায়। এর মধ্যে শতকরা ১৭ ত্রিশ ভাগ নারীর ওপর এত বেশী শারিরীক অত্যাচার চালানো হয় যে, তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। জাতিসংঘর হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২০ থেকে ৪০ লাখ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়। জার্মানীতে সড়ক দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় যত মানুষ হতাহত হয়, তার চেয়ে বেশী সংখ্যক নারী স্বামীদের হাতে আহত কিংবা নিহত হয়। সৌদি, দুবাই, ফ্রান্সেও ঐ একই চিত্র। সভ্য ধনী রাষ্ট্রগুলোতেও নারীরা নিরাপদ নয়। এ পরিসংখ্যানটি আরো ভয়াবহ মনে হবে তখন, যখন জানা যাবে, যে সব নারী নির্যাতনের শিকার হন তাদের তিন জনের মধ্যে মাত্র একজন পুলিশকে ফোন করে থাকেন।
এসব কারনেই পুরুষ শাসিত এ সমাজে নির্যাতনের পরিসংখ্যান এতো লম্বা যে তা নির্নয় করা দুরুহ ব্যপার।

বছরে যতনা নারী নির্যাতন হয় তার শতকরা দু’ভাগও আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। যেগুলো আদালতে বিচারাধীন থাকে তারও সাজা হয় ক’জনের? এসব অপরাধের ঘটনায় আদালতে মামলা হয় সবচেয়ে কম; মামলা হলে বিচার প্রক্রিয়ার শেষে অপরাধীর দন্ড কার্যকর হওয়ার দৃষ্টান্ত আরও কম। অনেক ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষণের শিকার নারী ও তাঁর পরিবার সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় তা প্রকাশ করে না। একারনেই দেশে নারী নির্যাতন বাড়ছেই।

যেদিন এ লিখাটি লিখছি সেদিনের সংবাদ শিরোনাম- নিজ শ্রেণিকক্ষ থেকে হাত-পা বাঁধা ছাত্রীকে উদ্ধার, সিঁদ কেটে যৌন হয়রানি, প্রেমপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে লাঠি দিয়ে পেটাল বখাটে। এর ঠিক দু’দিন আগে পত্রিকায় পড়েছি-কলেজছাত্রীর গাল কেটে দিল বখাটে, স্কুল ছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্কেও ছবি ফেসবুকে, বখাটের আগুনে কলেজছাত্রী দগ্ধ, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিশোরীকে হত্যার চেষ্টা। কিছুতেই নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না; বাড়ছে। অবলা নারী প্রতিদিনই ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপহরণ, খুন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীরা বাইরের চেয়ে ঘরেই বেশি নির্যাতনের শিকার হন।

দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে একশ্রেনীর মানুষরূপী পশু মেয়েদেরকে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করছে। এছাড়া অবৈধ সম্পর্কের পরিণতিতেও অনেক সময় মেয়েরা দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সুসংগঠিতভাবে একটি গোষ্ঠি নারীদের দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য করে। দুঃখজনকভাবে ধর্ষণের মত অমানবিক ও অনৈতিক কাজ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকায় পশ্চিমা দেশগুলোতে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা অধিক হারে লক্ষ্য করা যায়। পাচার হয়ে যাওয়া নারী ও শিশুদেরকে ক্রীতদাসের মত কেনাবেচা করা হয় এবং কিছু লম্পট পুরুষ এসব অসহায় নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন চালায়। দুঃখজনকভাবে নারী ও শিশু পাচার বর্তমানে ব্যাপক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ ব্যবসার ফলে একদিকে পাচারকারী দালালরা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, আর অন্যদিকে হাজার হাজার নারী ও শিশুর জীবনে নেমে আসছে চরম দুর্ভোগ ও দুর্বিসহ জীবন।

নির্যাতিত নারীরা যেখানে আইনী আশ্রয় খোঁজেন সেখানেও সমস্যা। এ ব্যাপারে একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রসংঙ্গ না আনলেই নয়। তিনি নারায়ণগঞ্জের এক থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঐ ওসি সাহেবের স্ত্রীরর দিন কাটতো ওপরওয়ালাকে স্মরণ করে, যেন ঐ দিন নির্যাতনের মাত্রা একটু কম হয় এই আশায়। দোষে দুষ্ট বললে ভুল হবে, বলতে হবে তিনি গুণে গুণান্বিত ওসি ছিলেন! অতি নিরবে বউ পেটাতে পেটাতে তথাকথিত নারী নির্যাতন বিরোধী এই ওসির একদিন থলের বিড়াল বের হয়ে গেল। এক রাতে থানার নিজ কক্ষে ওসি সাহেবর বউ পেটানো আসামীকে নিজের হাতে ডান্ডা মেরে বাসায় ফিরেন। সেদিন একটু বেশীই রাগেন তিনি। নিজের পশু চরিত্রও সামাল দিতে পারেননি। সে রাতে ঐ মহান ওসি নিজেই তাঁর প্রথম স্ত্রীকে শুধু পিটাননি সন্তানসহ ঘর থেকেই বের করে দেন। তার অধিনস্থদের সামনেই থানা কম্পাউন্ডে ঘটে এসব। পরদিন নারীবাদী এই ওসির বউ পেটানো মুখোশ থানার বাউন্ডারী পেরিয়ে জনসমক্ষে ফাঁস হয়ে যায়। এই হচ্ছে আমাদের সমাজের নারী নির্যাতনের নমুনা।

নারী নির্যাতনের সব ঘটনাই খবরই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। ইদানীং লক্ষ্য করা যায়, নারী নির্যাতনের নুুন হাতিয়ার হিসাবে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের অনৈতিক সম্পর্ক একটি ক্যামেরায় ধারণ কওে ফেসবুক, টুইটর কিংবা অন্য কোন সামাজিক মাধ্যমে দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে দেয়। ব্যাপারটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গর্হিত বিষয়। তাতে স্নায়ু আবেদন থাকায় এর দর্শকেরও যেন কমতি ইেন। ফলে মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে তা মুহ‚র্তেই ছড়িয়ে যায় দেশ-দেশান্তর। কিন্তু এই মেয়ে, তার পরিবার এবং আত্মীয়দের অবস্থা কি আমরা ভেবে দেখেছি? তথাপি এ বিষয়ে কথা বলার যেন কেউ নেই। কিন্তু গত পাঁচ বছরে 'গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে যৌন হয়রানি'র বিষয়টি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বিষয়টি সচেতন মহলকে উদবিঘ্ন করে তুলেছে। সাধারণত স্কুল কলেজের মেয়েরাই এর শিকার বেশি হয়। উঠতি বয়সের মেয়েরা তারা হয় কোনো প্রতিশোধের শিকার নুুবা প্রেমিকের প্রতারণার ম‚ল্য গুণে। পরকীয়া প্রেমে ফাঁসা নারীও এর শিকার হন।

বিচারহীন সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না পাওয়াই নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নারীদের এ সমস্যা বহুদিন ধরেই; কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ রাষ্ট্র কিংবা সমাজ কোনো পক্ষ থেকেই জোরালো নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব, সে ক্ষেত্রে ম‚ল ভ‚মিকা পালন করে পুলিশ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুলিশের এই ভূমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ আছে অজ্ঞাত কারণে ধর্ষিতাকে সহযোগিতার বদলে তারা নানাভাবে ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে থাকে। কেবল পুলিশ নয় সমাজপতি, গ্রাম্যমোড়লরাও এসব নির্যাতনের ঘটনার পর তা মিমাংসা করে দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এ অবস্থায় সমাজে এ ধরনের অপরাধ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমরা চাই নারীর উপর এ নির্যাতন বন্ধ হউক।

নারীরা মায়ের, স্ত্রীর মর্যাদা ফিরে পাক। আমি কাউকে অনুরোধ করবো না যে, ভেবে দেখুন। কাউকে বলবো না যে, সচেতন হোন। কাউকে অনুনয়-বিনয় করে বলবো না- নারী নির্যাতন করবেন না, বউ পেটাবেন না। কিছুই বলবো না আমি। মানুষ যে, সে শুধু বুঝে নেবেন। আর যে নয়- তাকে বুঝালেও কোন কাজ হবে না জানি। তবে যারা মানুষ নন- সেই ঘৃণ্য প্রজাতিদের সমাজ থেকে বের করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি আমি নিজেও যদি সেই রোগে আক্রান্ত হই। ক্ষমা যেন আমারও না হয়। সমচিন বিচার যেন আমারও হয়। আমি নারীকে তুলসী পাতা হিসেবে দেখছি না। নারীরাও অনেক দোষ করেন। তাই বলে পেটাতে হবে কেন? একজন স্বামী হিসেবে আপনিও তো স্ত্রীর কাছে দোষ করতে পারেন- তাই বলে কি তিনি (স্ত্রী) আপনাকে পেটাতে আসছেন? সংসার করছেন- পরস্পরকে ভাল করে বুঝে সংসার করেন। স্বামী-স্ত্রীতে মতের মিল না হলে আলোচনা করেন, প্রয়োজন হলে দুপক্ষের মুর”ব্বীদের নিয়ে বসে এর সুরাহা করেন। তার পরেও সমাধান না হলে- কি আর করা, বউ পেটানো প্রথাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে সমমঝোতার মাধ্যমে দুজন আলাদা হয়ে যান।

নারীর ক্ষমতায়ন বড়লেও নারী উন্নয়ন আজও পদে পদে বাধা। আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে নারী যে অগ্রযাত্রার সূচনা করেছিল সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তারই শত বছর পার হলো। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সেই ১০২ বছর আগে কিংবা তারও প্রায় সত্তর বছর আগে নারীরা যে জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলেন, এখনো এই আধুনা সভ্যযুগে আমরা মোটামুটি একই দাবি জানাতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হই। নারীরা এখনো সমান শ্রমে সমান মজুরি পায় না, পারিবারিক জীবনে আইনি বৈষম্যের শিকার, পারিবারিক নির্যাতনের জন্য পায় না আইনি সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া এখনো দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। যদিও নারীর সমঅধিকার আজকে একটি স্বীকৃত নীতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। বাস্তবে তার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। এ অবস্থা থেকে আমাদের নারী সমাজকে উঠিয়ে আনতে হবে। নারীকে পরিচিত করে তুলতে হবে নিজ পরিচয়ে। পরিতাপের বিষয় এ দেশের শতবর্ষী নারীও স্বামীর সংসারে পরাধীনুার শৃঙ্খল কিছুতেই ভেদ করতে পারে না; পারে না নিজের স্বাধীনুাটুকু আদায় করে নিতে। সংসারের বৃদ্ধ মাকে চলতে হয় শ্বশুড়-শাশুড়ি কিংবা স্বামীর অধীনে কখনো বা সন্তানের অধীন হয়ে। জীবনের পুরটা বছর পার করলেও তার ওই সংসারে গুরুত্ব খুব কমই পায়। আর এটাই যুগ যুগ ধরে চলছে আমাদের সমাজ সংসারে। আমাদের অবহেলিত বঞ্চিত নারীদের আলো দেখাতে হবে, ওদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে দূর বহুদূর।

এদেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার অপরাধগুলোকে বিশেষভাবে তদন্ত ও বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। এই আইনে যৌতুকের জন্য সাধারণ বা গুরুতর আহতকরণসহ ধর্ষণ, ধর্ষণের প্রচেষ্টা, যৌন হয়রানী, হত্যা, অপহরণ, দহনকারী পদার্থ দিয়ে আহত করা ইণ্যাদি প্রায় ১২ প্রকার অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য ট্রাইবুনাল গঠন, ভিকটিমের জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভ‚ক্ত করা হয়। এই আইনের অপরাধকে জামিনের অযোগ্যও ঘোষণা করা হয়। আইন আছে; আছে আদালত তবু নারী নির্যাতন থেমে নেই।

এ প্রসঙ্গে প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন কি বলছে তা দেখে নেয়া যাক- নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সম-অধিকারের বিধান রয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রণীত হয়েছে একের পর এক আইন। তবু বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতন। কিন্তু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। নির্যাতনের হার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আইন থাকা সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান হারে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে প্রণীত আইনগুলোর বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা ও আইনের প্রয়োগ-পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি। যৌতুকের দাবি ও যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৮০ সালে প্রণীত হয় যৌতুক নিরোধ আইন। পাশাপাশি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ২০০০ সালে প্রণীত হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধনী ২০০৩)।
এই আইন দুটি উদ্দেশ্য পূরণে কতখানি সক্ষম হয়েছে, এর মাধ্যমে নারী ও শিশুরাই বা কতটুকু প্রতিকার পেয়েছে, নির্যাতন প্রতিরোধে আইন দুটির প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা এবং এর উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।

এসব নানা কারনেই গ্রামেগঞ্জে নারী নির্যাতন চলছেতো চলছেই। নারী নির্যাতন আগে ছিল অশিক্ষিতের কাজ এখন তা ভদ্র সমাজে ঢুঁকে গেছে। নারীর প্রতি এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমন ও আইন প্রয়োগব্যবস্থাকে অধিকতর গতিশীল, দক্ষ ও কার্যকর করে তোলার বিকল্প নেই; সেই সঙ্গে নারীর প্রতি প্রয়োজন বিশেষ মনোযোগ।

লেখক : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক, মহাসচিব, কলামিস্ট ফোরাম অফ বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

০৫ মার্চ ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test