E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

‘সুবিচার দিতে হলে কে খুশি-অখুশি তা ভাবা চলবে না’

২০১৯ ডিসেম্বর ১৪ ১৬:২৮:৫৬
‘সুবিচার দিতে হলে কে খুশি-অখুশি তা ভাবা চলবে না’

স্টাফ রিপোর্টার : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন বলেছেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের সুবিচার দিতে হলে, কে খুশি হলো আর কে অখুশি হলো, কে বিরাগভাজন হলো, বিচারকদের এসব ভাবলে চলবে না। তাছাড়া আমাদের দেশে জাজমেন্টের পর কোনো সমালোচনা হয় না।’

শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত ‘নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের এক যুগ শীর্ষক’ মুক্ত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিচারপতি মো. আবদুল মতিন বলেন, ‘যেটি সঠিক, যেটি সত্য ও ন্যায়সঙ্গত, তা রায়ে স্বাধীনভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদের চরিত্রে এবং অনুভূতিতে স্বাধীনতার বোধ থাকা প্রয়োজন, তাহলেই সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে।’

তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থার জন্য বারকে (আইনজীবী সমিতি) শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। বার যদি ইউনাইটেড (ঐক্যবদ্ধ) থাকতো, দু’টি ভাগে বিভক্ত না হতো, তাহলে বিচার প্রার্থীদের সুবিচার পেতে আরও বেশি সহায়ক হতো।’

অবসরপ্রাপ্ত এ বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের চরিত্রে এবং অনুভূতিতে স্বাধীনতার বোধ থাকা প্রয়োজন, তাহলেই বিচার বিভাগে সত্যিকারের স্বাধীনতা আসবে।’

‘আমাদের দেশে জাজমেন্টের (আদেশ) পর কোনো সমালোচনা হয় না। জাজমেন্টের সমালোচনা করলেই কনটেম্পট (আদালত অবমাননা) হবে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। ন্যায়বিচার মানে মনিবের আনুগত্য নয় বরং আইনের আনুগত্য। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বার এবং বেঞ্চ এর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা করা প্রয়োজন’, বলেন বিচারপতি মো. আবদুল মতিন।

হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান খান।

আলোচনায় অংশ নেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মাসদার হোসেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

মূল প্রবন্ধে মিজানুর রহমান খান বলেন, ‘বিচারবিভাগ পৃথকীকরণে আমাদের পলায়নপরতার অবসান ঘটুক। ‘মাসদার হোসেন মামলা’র (বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার আবেদন জানিয়ে করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালে রায় দিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে সেই মামলাটি করেছিলেন জেলা জজ ও জুডিশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন) অর্জনকে পাথেয় করেই অবশ্য আমাদের পথ চলতে হবে। কিন্তু অধঃস্তন আদালতের পুরো একটি চ্যাপ্টার সাংবিধানিকভাবে কোমায় আছে কি-না, সেটা একটা বড় জিজ্ঞাসা। এমনও হতে পারে, হয়তো অলক্ষ্যে এভাবে পড়ে আছে। কিন্তু এভাবে থাকাতো সমীচীন নয়।’

অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, ‘নানামুখী প্রতিকূলতার মাঝে আমরা যে প্রত্যাশায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে স্বাক্ষর করেছিলাম, তা হয়তো অনেকটাই কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগ আর্থিকভাবে স্বাধীন না হলে এ পৃথকীকরণ অনেকটাই মূল্যহীন।’

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা একটা গ্লোবাল ট্রেন্ড (বৈশ্বিক প্রবণতা) হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের উদ্দেশ্য থাকে তার বিরুদ্ধে যেন কোনো রায় না আসে, যদিও বিচারের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সদাচার জনগণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নির্বাহী বিভাগের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের।’

আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ‘বর্তমানে বিচার বিভাগে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আদালতের অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থাপনা বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার অন্তরায়। নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ একত্রিত হয়ে গেলে সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই বিচার বিভাগের বাস্তবিক পৃথকীকরণের জন্য কার্যকর কর্মপন্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আমাদের বিচার বিভাগ বরাবরই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সবসময়ই সব বিরোধী দল বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার অনেক কারণই রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের বিচারক নিয়োগের কোনো আইনও নেই, নীতিমালাও নেই। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, নিম্ন বা উচ্চ আদালতে, যেখানেই হোক, সেখানে অবশ্যই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, মেধাসম্পন্ন, সৎ ও সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হতে হবে। কিন্তু সবসময়ই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে ক্ষমতাসীন সরকারের দলের আস্থাভাজন ও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। এ-ই যদি হয় বিচারক নিয়োগের অবস্থা, তাহলে সঠিক বিচার আসবে কী করে?’

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বিচারের রায় পক্ষে এলে বিচার বিভাগ স্বাধীন, আর বিপক্ষে এলেই পরাধীন- এটা সঠিক নয়। বিচার বিভাগের সম্মান রক্ষায় সবার সচেতনতা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন সেক্রেটারিয়েট থাকা খুবই জরুরি। আশা করা যাচ্ছে নিকট সময়ে তা বাস্তবে পাওয়া যাবে। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।’

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাসন বিভাগে সম্পৃক্ত করা উচিত নয়। বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির মতামত প্রাধান্য পেলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব হয়। হয়তো বিচার বিভাগ হতে আমরা যতটা চাই ততটা পাইনি, কিন্তু স্বাধীনতার পর হতে বিচার বিভাগের অর্জন কম নয়।’

অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের এক যুগ পূর্তি ও মাসদার হোসেন মামলার ২০ বছর পূর্তিতে আজকের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন। এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখছি বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ পুরোপুরি কার্যকরের স্বার্থে। উন্নয়নের জন্য বেশি নিবেদিত- এতটা প্রয়োজন আছে কি না তা প্রশ্নের দাবি রাখে। উন্নয়নের শরণার্থী যেন আমরা না হয়ে যাই সেদিকে লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়। আমরা হতাশ নই বরং আশাবাদী, সামনের সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সুফল যেন সমাজের সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই কার্যক্রম নিয়ে জেগে আছি আমরা।

(ওএস/এসপি/ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

১৫ জুলাই ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test