E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

'কারো দয়া-দক্ষিণা চাইনা, প্রাপ্য সম্মানটুকু চাই'

২০১৫ জুন ০৫ ০০:৪৯:১০
'কারো দয়া-দক্ষিণা চাইনা, প্রাপ্য সম্মানটুকু চাই'

। মাজহারুল ইসলাম রোকন ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি চন্দন শীল বলেন, দু’পা হারিয়ে জীবনযাপন করা কি যে কষ্ট তা আমি আর রতন দাস ও আমাদের মত যারা আছে তারাই বুঝতে পারবে। কারো দয়া-দক্ষিণা চাইনা, প্রাপ্য সম্মানটুকু চাই। ডাকাতি করতে গিয়ে পা হারায়নি। দলীয় কার্যালয়ে বোমা হামলায় পা হারিয়েছি।

১৬ জুন শোক দিবস পালনে অনেককেই পাওয়া যায়না। এমনকি দলীয় অনেক নেতারাই অনেক সময় বলার চেষ্টা করেছেন যে, নিজেরাই নিজেদের উপর বোমা হামলা করেছি। ঠিক বিএনপি যেমন ২১ অাগস্টের গ্রেনেড হামলার পর বলেছিল, শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে বোমা নিয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক বিএনপির মতই অনেকেই বলার চেষ্টা করেছিলেন। যারা নিহত হয়েছেন তাদের জন্য ফুল পর্যন্ত দেয়ার লোক পাওয়া যায়না। কষ্ট হয়।

কথাগুলো বলতে বলতে চন্দন শীল তার দু'চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলেন না। নিজের হারানো দু'টি পায়ের দিকে তাকিয়ে যেনো আরো কাঁদতে থাকলেন তিনি। তাঁর বুকফাটা আর্তনাদ ফুুটে উঠলো গাল বেয়ে গলা পর্যন্ত গড়িয়ে পড়া দু'চোখের অশ্রুতে।

একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, চাষাড়া বোমা হামলায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের দু-একটি পরিবার ছাড়া সকলেই অতিকষ্টে দিনাতিপাত করছেন। আমি চাকুরী করছি। আমার স্ত্রীও চাকুরী করছেন। ছেলেটাকে লেখাপড়া করিয়েছি। দু'মাস হলো সে একটা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীতে যোগদান করলো। তারপরও ভাল আছি। কিন্ত যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোর জন্য কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমি নিজেই ভিকটিম, আমি কিভাবে করব?

আর আমি কোন উদ্যোগ নিলে অনেকেই হয়তো বলা শুরু করবে অন্যদের নামে আমি নিজেই ধান্দা শুরু করেছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করে এসে এখন এমন কোন কথা শুনতে চাইনা। তবে যারা চাষাড়া বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো ও সহযোগিতা করার দাবি জানাই। আর সেলিম ওসমান এসব পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করেছিলেন। শামীম ওসমানও খোঁজ-খবর রাখেন। সকল কিছুতেই যদি শামীম ওসমান হয়, তাহলে তো শামীম ওসমানকে একাই নেতা মানতে হবে। তাহলে দলের শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য নেতাদের ভূমিকা কি? এসব পরিবারগুলো কষ্টে দিন কাটাচ্ছে এ বিষয়টি আমার নেত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার কানে গেলে এসব পরিবারগুলোর দুর্ভোগ কমতো। কারণ বিএনপি-জামাতের বোমায় বাসে আগুনের ঘটনায় পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক সহযোগিতা করেছেন। তাই আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর কানে যদি পৌঁছায় চাষাড়া বোমা হামলায় নিহত পরিবারগুলো কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, তাহলে তাদের অনেক উপকার হবে।

আমি আহত হওয়ার পর আমাকে নারায়ণগঞ্জের অনেকেই সহযোগিতা করেছিলেন। শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান ও নাসিম ওসমানও আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন।

চাষাড়া বোমা হামলার বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, চাষাড়া বোমা হামলার বিচার হবেই। ৪৩ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ৩০ বছর পর জাতির জনকের হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। সকল বোমা হামলারও বিচার হবে। তবে একটু সময় লাগবে। এটা আইনী প্রক্রিয়ার ব্যাপার।

তিনি সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমানের বিষয়ে বলেন, তিনি ৭৫ সালের পূর্বে রাজনীতিতে ছিলেন। তার বক্তব্যের সাথে আমাদের বক্তব্য মিলবে না। কারণ তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি রাজনৈতিক কথা বুঝেন না বা বলতেও পারেন না। উদার মনে তিনি উন্নয়ন করছেন। সকলকে তিনি উন্নয়নের স্বার্থে আহ্বান জানাচ্ছেন। বন্দরে বিএনপি নেতা মুকুল উন্নয়নে সহযোগিতা করায় বন্দরে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। অন্যান্যরাও এগিয়ে আসলে তিনি অনেক উন্নয়ন করতে পারবেন।

সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের বিষয়ে তিনি বলেন, শামীম ওসমান একজন বীর। যে শামীম ওসমান ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন। প্রতীকী বিচার করেছিলেন সাইনবোর্ড লাগিয়ে। শামীম ওসমানের সেই ঘোষণাতেই ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে মানবতা বিরোধীদের বিচার করা হবে বলে দলীয় ইশতেহার দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। যে কারণে দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করেছিল। জাতীয় কোন পদে থাকলেই জাতীয় নেতা হওয়া যায় না। শামীম ওসমান জাতীয় নেতৃত্বে না থাকলেও জাতীয় অনেক নেতাদের চেয়ে দল ও জাতির স্বার্থে তার ভূমিকা অনেক বেশি। শামীম ওসমানের ঘোষণার কারনেই গোলাম আযমকে তার আমির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ দিয়ে গোলাম আযমের আরো ২৪টি জেলায় কর্মসূচিতে যাওয়ার কথা ছিল। সে যেতে পারেনি।

সিলেটে যখন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কর্মসূচিটি পালন করা যাচ্ছিল না তখন দেশের প্রথিতযশা শতাধিক বুদ্ধিজীবীদের নারায়ণগঞ্জে নিয়ে এসেছিলেন শামীম ওসমান। সরকারি তোলারাম কলেজের কলা ভবনে সামসুজ্জোহার নামে ভবন হওয়ার কথা ছিল। কাজগপত্রও সব ঠিক ছিল। তখন শামীম ওসমান ওই ভবনকে জাহানারা ইমাম ভবন ঘোষণা করেন। গোলাম আযমকে নিষিদ্ধ করে সাইনবোর্ড লাগানোর পর আজ ওই জায়গার নাম হয়েছে সাইনবোর্ড।

আমি মনে করি এসব কারণেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী চাষাড়ায় বোমা হামলা করে শামীম ওসমানকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কারণ সকল জঙ্গীবাদী সংগঠনের মূল একস্থানেই। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমান নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জের চেহারা বদলে যেতো। নারায়ণগঞ্জবাসীর দুর্ভাগ্য।

নারায়ণগঞ্জে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের চিহ্নিতকরণ বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। ওই তালিকার কোন অনুলিপি আমরা পাইনি। ওটা সরকারের নির্দেশে জেলা প্রশাসন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কাছে চেয়েছিল। খুব গোপনীয়তার মাধ্যমে হওয়ায় আমরা সেই তালিকা পাইনি।

চন্দন শীল জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির বিষয়ে বলেন, যে জেলা থেকে আওয়ামী লীগের জন্ম সেই জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হচ্ছে না ১৮ বছর ধরে। আফসোস হয়, দলের চেইন অব কমান্ড নেই বলে। যে যার মত করে কথা বলতে পারে। যে যার মত করে চলছে। তবে চাই অতিসত্বর কমিটি গঠন করা হোক। এখন তো সম্মেলন করা সম্ভব না। তাই অন্তত একটি কমিটি গঠন করে মাঠে ছেড়ে দেয়া হোক। তাহলে এ প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। যেমন যুবলীগের কমিটিকে অনেকেই বলেন প্রবীণ যুবলীগ। এটা পত্র-পত্রিকায় আসে। তারা কি এগুলো দেখে না? তাই যে সব কমিটিগুলোর সম্মেলন দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না সেগুলোকেও পুনর্গঠন করতে হবে। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়েছে। সেটাও দু'বছর হয়ে যাচ্ছে, তবু কমিটি হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী তো সব বিষয়ে এতটা খেয়াল রাখতে পারেন না। এসব বিষয়ে যারা কেন্দ্রীয় নেতা আছেন তাদের কাজ করা উচিত। অসংখ্য মোস্তাক নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে ঢুকে গেছে। এসব মোস্তাক দূর করতে হলে যারা দলের চেইন অব কমান্ড মানে না তাদেরকে চিহ্নিত করে কমিটি গঠন করতে হবে।

তিনি বলেন, দল ও দলের নেতাকর্মীদের ভালোবাসা পেয়েছি। নেতাকর্মীদের ভালোবাসার কারণেই দু’পা হারিয়ে এখনও সকল কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকি। এছাড়াও সাধারণ মানুষ যে ভালোবাসা দিয়েছে সেটাই অনেক বড় পাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির দল আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হয়েই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চাই। আমি পা হারালেও নেতাকর্মীদের ভালোবাসায় মানসিক শক্তি নিয়ে এখনও দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দল যেখানে রাখবেন সেখানেই কাজ করতে পারব। আমার সেই মানসিক শক্তি এখনও রয়েছে।

দুই পা হারিয়ে এখনও হার না মানা চন্দন শীল ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর বিচার দাবিতে শ্লোগান তুলেন। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে মাত্র ৮ম শ্রেনীতে পড়ুয়া ছাত্র হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে রাস্তায় নেমে পড়েন। যখন বার একাডেমীর ছাত্র একেএম শামীম ওসমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে দেয়ালে পোস্টার লাগাতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছিলেন তখনই শামীম ওসমানকে খুঁজতে শুরু করেন চন্দন শীল।

চন্দন শীলের বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। বাবার মুখে শোনা বঙ্গবন্ধুর কথা চন্দন শীলকে প্রভাবিত করতো। পরবর্তীতে শামীম ওসমানের সাথে যোগ দেন চন্দন শীল। ১৯৭৮ সালে এসএসসি পাশ করে শামীম ওসমান ও চন্দন শীল দু'জনই সরকারি তোলারাম কলেজে ভর্তি হন। শুরু হয় পুুরোদমে ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ। ১৯৮১ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন শামীম ওসমান। পুরো প্যানেল নির্বাচিত হওয়ার পিছনে সেই সময় চন্দন শীলের ভূমিকা ছিল। ১৯৮৩ সালে বিভক্ত জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৮৪ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল এর দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সাল থেকে জিয়াউর রহমান ও এরশাদ বিরোধী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে সক্রিয় ভুমিকায় ছিলেন চন্দন শীল। জিয়াউর রহমানের আমলে তাদের শ্লোগানই ছিল 'জিয়ার কাছে আজব চিজ, রাজাকার শাহ আজিজ।' এছাড়াও ১৯৯১ সালে তিনি শহর আওয়ামী লীগের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সবকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হন। জেলা কৃষক লীগের যখন কোন কার্যক্রম ছিল না তখন জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে সক্রিয় সংগঠনে পরিণত করেছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এছাড়াও জাতীয় নাগরিক সংগঠন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

তিনি দাবি করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখায় তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করায় যারা নৃশংস হামলার শিকার হয়ে নিহত বা গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন তাদের দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র। সম্মান জানানোর পাশাপাশি তাদের ও তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্বও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

(পিএস/অ/জুন ০৫, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

১৪ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test