E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

পথের ধুলো থেকে : পর্ব- ১৬

একক দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আ. লীগের বাঙালিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া তার সামনে দাঁড়ানোর আর কেউ থাকে না

২০২১ সেপ্টেম্বর ১৬ ১৩:৩৮:০২
একক দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আ. লীগের বাঙালিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া তার সামনে দাঁড়ানোর আর কেউ থাকে না

সাইফুল ইসলাম


মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে কোন রাজনৈতিক দলের কী অবস্থা ছিল? মুক্তিযুদ্ধে তারা কে কী ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে তৃণমূলে? এ উদাহরণ প্রধানত সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের, তবে, মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় ঘটনা, তাই, একটি এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার তফাৎ খুব একটা নেই বলেই লেখক-সংগঠকদের ধারণা।

লেখক-সংগঠকদের অনুসন্ধানে জানা যায়, আয়ূব শাসন আমলে উচ্চবিত্ত এবং গ্রামের ধনী কৃষকেরা মুসলিম লীগকে সমর্থন করতো। ইউনিয়নের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা রাষ্ট্রকাঠামোতে থাকায় তারাও হয়ে ওঠেন পাকিস্তান তখা মুসলিম লীগ সমর্থক। গ্রাম্য মাতব্বরদের মধ্যেও ছিল তাদের প্রভাব। এর বাইরে ন্যাপ প্রভাবশালী সংগঠন। এরা যেহেতু সমাজতন্ত্রের কথা বলতো এজন্য বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষিত মহলে ছিল তাদের প্রভাব। ‘বিপ্লবের ঘোর’ থাকায় এরা শ্রমিক-কৃষকের মধ্যে সংগঠন গড়ার চেষ্টা করতো। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোতে এদের ছিল একাধিপত্য। পরে এই সংগঠনটি মোজাফ্ফর ন্যাপ ও ভাসানী ন্যাপ নামে বিভক্ত হয়। এলাকায় ভাসানী ন্যাপও প্রধানত: তোয়াহা গ্রুপ এবং মতিন-আলাউদ্দিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আরো বেশ কয়েকটি গ্রুপ ক্রিয়াশীল ছিল সুপ্ত আকারে।

অপরদিকে, ব্যাপক নির্যাতনে আওয়ামী লীগ ছিল কোণঠাঁসা। এমনকি অনেকে দল ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও আছে। নিস্ক্রিয় হয় অনেকে। ওই সময়ের একটি গল্প চালু রয়েছে এখনো। ’৬৮ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ ‘জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং আওয়ামী লীগ অফিসের পিয়ন আব্দুস সোহবার আওয়ামী লীগ অফিসে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে থাকতেন। সোবহান পিয়নের বগলে একটি খাতা থাকতো যাতে লেখা থাকতো কোন নেতা কত টাকা তাকে মাসে মাসে দেবেন। অধিকাংশ নেতারই এই টাকা মাসের পর মাস বকেয়া থাকতো।’ গ্রামীণ মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তানেরা প্রধানত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সমর্থন করতেন। ছাত্রলীগ কখনোই আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে নির্ভরশীল ছিল না। বরং আওয়ামী লীগই ছিল নির্ভরশীল ছাত্রলীগের ওপর। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আব্দুর ওয়াহাব এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘উল্লাপাড়ার বাঙ্গালা ইউনিয়নের কুচিয়ামোড়ায় এক জনসভার আয়োজন করা হয়। ওই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় জনসভার উদ্যোক্তা ছিলেন মোহনপুর ছাত্রলীগের নেতা ওসমান গণি। জনসভায় প্রধান অতিথি হন [বিখ্যাত কমিউনিষ্ট নেতা] অমূল্য লাহিড়ী, আর আমি হই প্রধান বক্তা।’ এ সাক্ষাৎকারেই বোঝা যায় তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা।

এমনি পরিস্থিতিতে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন উভয় গ্রুপ মিলে শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন। গ্রামে ‘বিপ্লব করতে যাওয়া’ ভাসানী গ্রুপ মুসলিম লীগের আস্তানাগুলোতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঢেউ নিয়ে আছড়ে পড়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আব্দুল ওয়াহাব জানান, ‘সে সময় ডাকাত, গরু চোর, ছিঁচকে চোরের প্রাদুর্ভাব ছিল বিভিন্ন গ্রামে। চোর-ডাকাতের উপদ্রুপে অতিষ্ট গ্রামের মানুষ। এ ব্যাপারে থানা পুলিশকে জানানো হলে তারা এসে ঘুরে যেত, তাদের ভুড়ি ভোজের জোগান দিতে হয় গৃহস্থকে। মোহনপুর ইউনিয়নের নতুন গ্রাম ও সড়াতৈল তখন ডাকাতদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। মেনন গ্রুপ এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ওই সব গ্রামে হামলা চালিয়ে চোর হিসেবে চিহ্নিত সোহরাবসহ কয়েকজনের হাত কেটে দেয়। এতে চোর ডাকাতের প্রাদুর্ভাব কমে যায়। এ ভাবেই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে তারা। পাশাপাশি তারা বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া ধান রক্ষারও উদ্যোগ নেয়। এলাকার কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে বাঁশ তুলে বিভিন্ন জমিতে বেড়া দেয়া হয়। রক্ষা পায় কৃষকের ধান। তাদের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় এলাকায়। চকপাড়া, বজ্রপাড়া, এলংজানি, সাতবিলা, চিনাধুকুরিয়া, গোড়াইগাতী, সুজা, কালিয়াকৈর, বলতৈলকে মুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে মেনন গ্রুপ।’ বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আব্দুল ওয়াহাব আরো জানান, ‘এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের সদস্যরা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল ‘হক-তোয়াহা’ গ্রুপ নামে। এই গ্রুপের ঘাঁটি ছিল লাহিড়ী মোহনপুর এলাকার এলংজানি গ্রাম। এখানে হক-তোয়াহা গ্রুপের হয়ে রাজনীতি করতেন আবদুল হামিদ শামা, কুদরত আলী, আব্দুস সাত্তার, মকবুল হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। তারা সবাই ছিলেন শিক্ষিত। পড়ালেখার আনুষ্ঠানিক পাঠ চুকিয়ে তারা হয়ে ওঠেন রাজনীতির সার্বক্ষণিক কর্মী। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেশার জন্য তারা কলেজের শিক্ষা শেষ করে দূরে কোথাও চাকরির সন্ধানে যায়নি। এদের প্রত্যেকেই এলাকার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে এলাকাতেই থেকে যায়।’ ফলে এদের রাজনৈতিক ‘প্রতারক’ বলার সুযোগ নেই কোনও ক্রমেই।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে আলোচিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে সর্বাগ্রে মুক্তি পান আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে মাইক বের করে দেওয়া হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি সদ্যমুক্ত নেতাকে রেসকোর্স ময়দানে সংবর্ধনা দেওয়ার। মুজিবের মুক্তির পরে অন্যান্য নেতারা মুক্ত হলেও তাদের ওই সংবর্ধণা সভায় অন্তুর্ভূক্ত করতে ছাত্রলীগ অনীহা প্রকাশ করে বলে অভিযোগ আছে উভয় ছাত্র ইউনিয়নের। যাইহোক, সংবর্ধণা সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত করা হয়। জাতীয় রাজনীতিতে বিজয়ী হয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগ। জাতীয় রাজনীতিতে এগিয়ে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগ। এর কয়েক দিন পরেই আয়ুব খান পদত্যাগ করে। জারি হয় নতুন সামরিক শাসন। এর মধ্যেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। মোজাফ্ফর ন্যাপ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে আলাদা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়। আর ভাসানী ন্যাপ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হযে বিপ্লবের আকাঙ্খা অনুযায়ী ‘গ্রাম থেকে ঘেরাও’য়ের উদ্দেশ্যে শহর ত্যাগ করে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠা। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো ছিল, ছিল বেশ কিছু কর্মীও, তাদের জনসমর্থণ ঠেকেছিল একেবারেই তলানিতে।

এর পরের ইতিহাস খুব সরল। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিজয়ী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। মোজাফ্ফর ন্যাপ ঐক্য গড়তে ব্যর্থ হয়ে বি টিম হিসেবে তার ভোট চলে যায় আওয়ামী লীগে। নির্বাচনে বর্জন করে ভাসানী ন্যাপ কর্মীরা যায় গ্রামে বিপ্লবী জোস নিয়ে। ফলে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দিতাহীন ভাবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। একক রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আওয়ামী লীগের, বাঙালিদের নেতা হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাড়া তাঁর সামনে দাঁড়ানোর আর কেউ থাকে না। বাঙালিরা সাজ সাজ রব করে রণমূর্তিতে বঙ্গবন্ধুর পিছনে কাতার বন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম আব্দুল ওয়াহাব জানান, ‘আমাদের সমর্থকরা এলংজানিতে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেয়। মেনন গ্রুপ এ প্রস্তাবের বিরোধীতা করে। ওরা বলতে থাকে যে ওরাও স্বাধীনতা চায়, তবে সে স্বাধীনতা কৃষক-শ্রমিকের স্বাধীনতা। গরীব মানুষের স্বাধীনতা। সমাজতন্ত্র। কিন্তু ওদের চাপিয়ে দেয়া স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্র জনগণের স্বতস্ফূর্ততার তোড়ে ভেসে যায়। এ সময় কমরেড অমূল্য লাহিড়ীর মধ্যস্থতায় এক সময় যৌথ ভাবে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তবে পার্থক্য বোঝার জন্য আমাদের সমর্থকরা মাথায় কালো পট্টি বেঁধে নেয়, ওরা বেঁধে নেয় লাল পট্টি। প্রথমে ওদের লাল পট্টির সংখ্যা বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে আমাদের লোক সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় ওদের লোকজন লাল পট্টি খুলে ফেলে কালো পট্টি মাথায় বেঁধে নেয়।’ এ ভাবেই ভাসানী ন্যাপ গণবিচ্ছিহ্ন হয়ে পড়ে গ্রামাঞ্চলে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কথাসাহিত্যিক, আহ্বায়ক-সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটি।

পাঠকের মতামত:

১৬ অক্টোবর ২০২১

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test