E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Technomedia Limited
Mobile Version

যোদ্ধার মুখে যুদ্ধ কথা

২০২৩ ডিসেম্বর ১১ ১৫:৫৬:৪৮
যোদ্ধার মুখে যুদ্ধ কথা

দেবেশ চন্দ্র সান্যাল


১৯৭১ সাল বাংলাদেশের মহান  স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সাল। ২৫ মার্চ’৭১ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের আকস্মিক নৃংশতম আক্রমণে শুরু হয় বাঙালিদের উপর জ্বালাও, পোড়াও, হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, নিপিড়ন,ধর্ষণ ও অন্যান্য মানবতা বিরোধী নৃংশতম কার্যক্রম। বাঙালি সৈন্য, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। বাঙালিদের প্রতিরোধ যুদ্ধের পর ২৬ মার্চ’৭১ থেকে শুরু হয় হানাদার মুক্তি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের সকল বাঙালি সৈন্য, আনসার, অন্যান্য বাহিনী, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ও সবস্ত্রের অন্যান্য নারী পুরুষ অংশ গ্রহণ করে সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমি ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে ছিলাম। ১২ ডিসেম্বর’৭১ জামিরতা গ্রামের অধিবাসী বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচীর নিয়ন্ত্রনাধীন আমাদের গ্রুপটি ছিল সৈয়দপুর গ্রামের কালা চাঁদ চক্রবর্ত্তী ও অন্যানদের বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর’৭১ ছিল আমাদের শেষ রণাঙ্গনের যুদ্ধ। স্থানটি ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার ধীতপুর নামক গ্রাম।

এই যুদ্ধে নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার (কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত) বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগ্চী। ১৩ ডিসেম্বর’৭১ সংবাদ পেলাম পাকি হানাদারেরা কৈজুরী হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পাকি হানাদারেরা পরাজিত হয়ে লঞ্চে যমুনা নদী পাড় হয়ে মালিপাড়া ক্যাম্পে এসেছে। মালিপাড়া ক্যাম্প থেকে রাস্তা চিনানোর জন্য দুই জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়েছে। মালিপাড়ার কাছের গ্রামের ২/৩ জন যুবক এসে সংবাদ দিল কিছু পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য পালিয়ে যাচ্ছে। আমরা পাকি হানাদারদের আক্রমন করার জন্য ওদের পিছু নিলাম। সংবাদপেয়ে শাহজাদপুুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অবস্থানকারি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ গুলোও আক্রমন করার জন্য এগিয়ে এলো। পাকি হানাদারেরা ছিল ক্ষুধার্ত। কৈজুরী গ্রামের একজনের মুলা ক্ষেত থেকে মুলা খাওয়ার চেষ্টা করলো। ওরা হয়তো জানতো না কাঁচা মুলা খাওয়া যায় না। ওয়াপদা বাধ ধরে ওরা অগ্রসর হতে লাগলো।

আমরাও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অস্ত্র তাক করে ওদের পিছু পিছু হাটতে থাকলাম। ওরা ভীষণ ক্রোধী। ধীতপুর নামক স্থানে গিয়ে ওরা আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে গুলি করলো। আমরা জাম্প করে ওয়াপদা বাধের পশ্চিম দিকে পজিশন নিলাম। ওদের উপর গুলি ছুড়তে শুরু করলাম। ওরা ওয়াপদা বাধের পূর্ব পার্শ্বে পজিশন নিল। এক ঘণ্টা ব্যাপি গুলি পাল্টা গুলি চলতে থাকলো। গুলির শব্দে শাহজাদপুর উপজেলার মো: সিরাজুল ইসলাম এর গ্রুপ ও অন্যান গ্রুপ, বেড়া উপজেলার এস আমির হোসের গ্রুপ ও অন্যান্য গ্রুপ বিভিন্ন স্থানে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা দল আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলো।

এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। অন্ধকার হয়ে এলো হানাদারেরা গুলি করা বন্ধ করলো। আমরাও অন্ধকারে গুলি করা বন্ধ করলাম। সারারাত আমরা না খেয়ে পজিশন অবস্থায় ছিলাম। আমাদের গ্রুপটি ছিল বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচীর কমান্ডানাধীন। আমার বাম পার্শ্বে এল.এম.জি চালাচ্ছিলেন কমান্ডার রবীন্দ্র নাথা বাগচী স্যার। আমার ডান পার্শ্বে থ্রি নট থ্রি চালাচ্চিলেন আমার মেজো দাদা সমরেন্দ্র নাথ সান্যাল, তাঁর ডান পার্শ্বে আমার গ্রুপের মো: নজরুল ইসলাম, মো: শামসুল হক ও অন্যান্যরা ষ্টেনগান ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালাছিলেন। যুদ্ধটি ছিল ভীষন ভয়াবহ সম্মূখ যুদ্ধ। তথাকথিত হিংস্র পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ। আমরা ও গুলি করা বন্ধ করলাম। হয় যুদ্ধে বিজয়ী হতে হবে। অন্যথায় সবার জীবন যাবে। আমাদের গ্রুপের বাম দিকেই ছিল বেড়ার এম আমির হোসেন গ্রুপ। তুমুল যুদ্ধ। দুটি গুলি এসে আমার হেলমেটে লাগলো। এস এম আমির হোসেনের সাহেবের গ্রুপে মো: আব্দুল খালেক ও আমজাদ হোসেন গুলি বিদ্ধ হলো। দুই জনই যন্ত্রনায় কাতারাছিল। কিন্তু কোন অবস্থাতেই গুলি করা বন্ধ করা যাবে না। আমরা সবাই গুলি চালিয়ে যাচ্ছি।

আমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে গুলি চালাচ্ছি। দুই বার হ্যান্ডগেরেন্ড চার্জ করলাম। এর মধ্যে সন্ধ্যা ও অন্ধকার নেমে এলো। রাতে ধীতপুর বিশ্রামা গার থেকে মাঝে মাঝে ২/১ টা করে গুলি আসছিল। ওদের গুলির প্রেক্ষিতে আমরাও ২/১ টা করে গুলি করছিলাম। ভোরে ফর্সা হলে আমাদের কমান্ডার বরীন্দ্রনাথ বাগ্চী ও বেড়ার কমান্ডার জনাব এস.এম আমির হোসেন ও অন্যান্যরা ক্রোলিং করে ধীতপুর রেষ্ট হাইসে এগিয়ে গেলেন। রেষ্ট হাইসে গিয়ে দেখা গেল। দুজন রাজাকার সারারাত কভারিং ফায়ার করেছে। কমান্ড করে রাজাকার দুজনকে স্যারেন্ডার করালেন। রাজাকার দুজনের নাম ছিল লতিফ ও কালাম। তারা দুই জন আত্মসমর্পণ করলো। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে নেওয়া হলো। তাদের কাছ থেকে জানা গেল রাত ১১ টার দিকে হানাদারেরা ক্রোলিং করে নিরাপদ দুরত্বে এসে হেঁটে বেড়া নদী পার হয়ে ঢাকা যাবার উদ্দেশ্যে পালিয়েছে। পরে জানা গেল।

পাকি হানাদারেরা বেড়া ঘাটে গিয়ে ভেড়াকোলা গ্রামের হলদারদের নৌকায় নদী পাড় হয়ে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ঢাকা যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ধীতপুরের যুদ্ধে বেড়ার এস. এম.আমির হোসেনের গ্রুপের বৃশালিকা গ্রামের বেড়া বিবি হাইস্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র জনাব মোঃ আব্দুল খালেক ও ছেচানিয়া গ্রামের আমজাদ হোসেন গুলি বিদ্ধ হন এবং পরে শহীদ হয়েছেন এবং আমাদের অন্যান্য গ্রুপের ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। স্থানীয় দুজন পথচারী গোলাগুলির সময়ে গুলি লেগে ওয়াপদা বাধের উপর মারা গিয়েছেন। ধীতপুর যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা জামিরতা হাই স্কুলে ক্যাম্প করে অবস্থান নিয়েছিলাম। ১৪ ডিসেম্বর’৭১ শাহজাদপুর থানা হানাদার মুক্ত হয়।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ব্যাংকার।

পাঠকের মতামত:

২৪ এপ্রিল ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test