E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

হবিগঞ্জের ইউনিয়ন রিচি যেন আওয়ামী রাজনীতির এক চিলতে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট!

২০২০ জুন ০৬ ২২:২৯:৫৬
হবিগঞ্জের ইউনিয়ন রিচি যেন আওয়ামী রাজনীতির এক চিলতে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট!

প্রবীর সিকদার


হবিগঞ্জ সদরের ইউনিয়ন রিচি। নানা কারণে রিচি আলোচিত। এখানে রয়েছে প্রভাবশালী আওয়ামীলীগ নেতাদের বসবাস। সেই সাথে রিচি বিখ্যাত সুদের কারবারিদের জন্যও! এই সুদের কারবারিদের খপ্পরে পড়ে বহু মানুষ ঘর বাড়ি ব্যবসা বাণিজ্য ফেলে হবিগঞ্জ ছেড়ে পালিয়েছেন! অবশ্য রিচিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক গুণীজনও। তাঁদের সেই অর্জন সুদের কারবারিরা একটু হলেও ম্লান করে দিচ্ছে। এই ভয়ঙ্কর সুদের কারবার নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করবো অন্য আরেক লেখায়।

আজকের বিষয় রিচি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ২০১৬ নিয়ে। এই রিচিরই মানুষ হবিগঞ্জের এমপি ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট আবু জাহির। সেখানকার অনেকেই আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে শুধু সক্রিয় নয়, দাপুটে ও প্রভাবশালী! হবিগঞ্জের মানুষ রিচিকে বলে থাকেন আওয়ামীলীগের ঘাঁটি। অথচ ওই ঘাঁটিতেই পর পর দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হবিগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মিয়া মো.ইলিয়াছ। এটি বিস্ময়কর, এটি কল্পনা করাও অসম্ভব; অথচ সেটা হয়েছে কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে! এবার আমি একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে চাইছি সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত রিচি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে। ওই নিবাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান মিয়া মো.ইলিয়াছ।

সর্বশেষ রিচি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ৪ জুন। ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। এরা হলেন, লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির কাজল আহমেদ, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির মিয়া মো.ইলিয়াছ, নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামীলীগের মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী, কাস্তে প্রতীক নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির মো.সামচু মিয়া ও চশমা প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র মো.সারাজ মিয়া। বড় পরিতাপের বিষয়, দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামীলীগের দাপুটে সরকারের সময়েই ওই নির্বাচনে মো.মহিউদ্দিন চৌধুরীর নৌকাকে বিপুল ভোটে পরাস্ত করে টানা দ্বিতীয় বারের মতো জয় ছিনিয়ে নেয় মিয়া মো.ইলিয়াছের ধানের শীষ! ওই নির্বাচনে মো.মহিউদ্দিন চৌধুরীর নৌকার অবস্থান ছিল চতুর্থ! বিএনপি প্রার্থী মিয়া মো.ইলিয়াছ ভোট পেয়েছিলেন ৭৪৪৫টি, আর আওয়ামীলীগ প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন মাত্র ১৮৯২ ভোট! ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে অন্য তিন প্রার্থী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী কাজল আহমেদ ২৯৪০, কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মো.সামচু মিয়া ৯১ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সারাজ মিয়া ২০৫৯ ভোট পেয়েছিলেন। ভোটের এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, ওই নির্বাচনের ভোটে আওয়ামীলীগ প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী শুধু বিএনপির প্রার্থী মিয়া মো.ইলিয়াছেরই পেছনে পড়েননি, পেছনে পড়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী কাজল আহমেদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সারাজ মিয়ারও, যেটা অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর! আওয়ামীলীগের সরকার দেশে, ওই ইউনিয়ন এলাকার এমপি শুধু নয়, রাচিতেই বাড়ি হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট আবু জাহির এমপির। জেলা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী, এমন অনেক নেতার বাস ওই রিচিতেই! তারপরও নৌকার এই হেরে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি হবিগজ আওয়ামীলীগের নেতা কর্মী সমর্থকেরা; যদিও এমপি মহোদয় আনন্দ চিত্তেই মেনে নিয়েছেন নৌকার হার আর ধানের শীষের বিপুল বিজয়কে! তবে কী এমপি মহোদয় অপকৌশল করে নৌকা হারিয়ে ধানের শীষের বিপুল বিজয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছেন? এই প্রশ্নের সরাসরি ও স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার সাহস নেই হবিগঞ্জের মানুষের! ঘুরিয়ে পেচিয়ে যে উত্তরগুলো হবিগঞ্জের বাতাসে উড়ে বেড়ায়, সেগুলো আরও ভয়ঙ্কর! উত্তর হচ্ছে, সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী ও এই নির্বাচনী এলাকার সাবেক এমপি শাহ এএমএস কিবরিয়ার জীবদ্দশাতেই কিবরিয়া সাহেবকে হটাতে আওয়ামীলীগের একটি অংশের সাথে বিএনপির গোপন আঁতাত হয়েছিল! সেই আঁতাত এখনো বহমান! নৌকার পরাজয় কিংবা ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে শুধু ধানের শীষে ভোট নয়, এলাকা ভেদে লাঙ্গল ও চশমায় ভোট দেওয়ার নির্দেশনাও জারি করা হয়েছিল! যারা এমন ভাষায় উত্তর দিচ্ছেন, তাদের এই উত্তরের স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায় রিচি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটের পরিসংখ্যানে।

রিচি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামটাও নাকি ভোটের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল! দলে এমপি আবু জাহির বিরোধী নেতা কর্মীদের বাঁকা কথন, প্রার্থী হিসেবে মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী ভালো হলেও তার নামের পদবী 'চৌধুরী'তে অনেকেরই এলার্জি রয়েছে। একই সঙ্গে তারা এটাও জানিয়েছেন, এলার্জি শুধু 'চৌধুরী'তেই নয়, এলার্জি তাদের 'সৈয়দ', 'শেখ', 'খোন্দকার'সহ সকল খান্দানি পদবীতেও! আর এই পদবী এলার্জির কারণেও আওয়ামীলীগের প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বেশ পিছিয়ে পড়তে হয়েছে! অবশ্য এই নেতিবাচক ভাবনা কিংবা ধারণা খান্দানি পদবী নেই, দলের এমন প্রভাবশালী নেতাদের, সাধারণ ভোটারদের নয়। তারপরও হবিগঞ্জের কেউ এটা ভাবতে পারেননি যে, আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়বেন! যদিও জেলা আওয়ামীলীগের নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ এটা আগেভাগেই জানতেন; কেননা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংটা যে তারাই করেছিলেন! ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, তাদের সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং সফল ও সার্থক হয়েছিল।

ভোটের পরিসংখ্যানে ফিরে যাই আর একবার। ২০১৬ সালের রিচি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরী ১০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৯টি ভোটকেন্দ্রেই বিপুল ভোটে হেরেছেন। ৭টি ভোটকেন্দ্রেই তার প্রাপ্ত ভোট দুই ডিজিট অতিক্রম করতে পারেনি! তিনি শুধু বেশি ভোট পেয়ে শীর্ষে ছিলেন তার নিজের ভোটকেন্দ্র সুলতাল মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, পেয়েছিলেন ৯৬৭ ভোট। রিচির যে এলাকায় বাড়ি বর্তমান সংসদ সদস্য আবু জাহিরের, সেই হিসেবে তার অর্থাৎ এমপির ভোটকেন্দ্র রিচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই ভোটকেন্দ্রেও ভোট পায়নি নৌকা! ওই ভোট কেন্দ্রে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল ১৬২৮ ভোট পেলেও আওয়ামীলীগের নৌকা পেয়েছিল মাত্র ৫৭ ভোট! ১০টি ভোটকেন্দ্রের ভোটের পরিসংখ্যান আর একটু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখতে গেলে হতবাক হতে হয় নৌকা মার্কায় প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দেখে। রিচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যলয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ২৬৩৯ জন, নৌকা পেয়েছে ৫৭ ভোট। রিচি হাই স্কুল ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ১৯৭৩ জন, নৌকা পেয়েছে ২৯ ভোট। রিচি সাগরকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৯৯১ জন, নৌকা পেয়েছে ৪৫ ভোট। বগলাখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৭১৭ জন, নৌকা পেয়েছে ১৮৮ ভোট। ছোট বহলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১২৬৫ জন, নৌকা পেয়েছে ৮৭ ভোট। জালালাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৭৬৯ জন, নৌকা পেয়েছে ৩২ ভোট। নোয়াগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৮৯৩ জন, নৌকা পেয়েছে ৩২২ ভোট। মির্জাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১০২৪ জন, নৌকা পেয়েছে ৯৫ ভোট। কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ১৪৩০ জন, নৌকা পেয়েছে ৭০ ভোট। শুধু ব্যতিক্রম সুলতান মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। ওই কেন্দ্রে মোট ভোটার ২৩১৮ জন, নৌকা পেয়েছে ৯৬৭ ভোট; নৌকা এই কেন্দ্রেই শুধু বেশি ভোট পেয়েছে। এই কেন্দ্রটি আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো.মহিউদ্দিন চৌধুরীর নিজের ভোট কেন্দ্র। এই একটি কেন্দ্রে নৌকা ৯৬৭ ভোট পেয়েছে, আর বাকি ৯টি কেন্দ্রে নৌকার প্রাপ্ত ভোট যোগ করলেও ৯৬৭ হয় না; ৯টি কেন্দ্রে নৌকা মোট ভোট পেয়েছে মাত্র ৯২৫টি! এই পরিসংখ্যানটি শুধু হবিগঞ্জের আওয়ামী পরিবারের জন্যই যন্ত্রণার নয়, সারাদেশের বঙ্গবন্ধু ভক্তদের জন্যও বড় বেদনার!

রিচিতে নৌকার এমন শোচনীয় পরাজয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হবিগঞ্জের আওয়ামীলীগ নেতাদের নানা উদ্যোগ ও কৌশলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে! হবিগঞ্জ আওয়ামীলীগের অনেক নেতা কর্মী সমর্থক ভোটের এই পরিসংখ্যান দেখে বিস্ময়ে হতবাক, দেশে আওয়ামীলীগের গ্রহণযোগ্যতার সংকট এখনো এতো নিচে নামেনি যে, একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের ভালো প্রার্থী জাতীয় পার্টি কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থীর চেয়ে কম ভোট পাবেন! তাদের আরও বিস্ময়, বিএনপির প্রার্থী মিয়া মো.ইলিয়াছ এতোটা যোগ্য ও জনপ্রিয় নন যে, তার প্রাপ্ত মোট ভোট অন্য ৪ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের যোগফলের চেয়েও বেশি হবে! অথচ এটাই ঘটেছে রিচি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে! বিএনপি প্রার্থী রিচিতে একাই পেয়েছেন ৭৪৪৫ ভোট, আর আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মোট ভোট ৬৯৮২টি! এটি শুধু বিস্ময়কর নয়,অসম্ভবও! নৌকার এমন ভরাডুবির পর রিচি ইউনিয়ন এলাকার আওয়ামীলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী যখন বলেন, হবিগঞ্জে চলছে লুটপাটের রাজনীতি। ক্ষমতার পালাবদল হলে তো এই লুটেরাদের বাঁচতে হবে! আর সেই সূত্রেই অন্ধকারের আঁতাতে রিচিতে ডুবে যায় বঙ্গবন্ধুর নৌকা! আর এমন নজির শুধু রিচিতেই নয়, বিদ্যমান এখন সারাদেশের নানা প্রান্তে! হবিগঞ্জের এই রিচি যেন দেশজুড়ে আওয়ামী রাজনীতির এক চিলতে উজ্জ্বল ময়নাতদন্ত রিপোর্ট।

পাঠকের মতামত:

০৭ জুলাই ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test