Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

শীতে গ্রামাঞ্চলে সুস্বাদু পিঠার আধিক্য ও উপস্থাপনের গল্প

২০১৭ নভেম্বর ০৮ ১৫:৩১:০৩
শীতে গ্রামাঞ্চলে সুস্বাদু পিঠার আধিক্য ও উপস্থাপনের গল্প

নজরুল ইসলাম তোফা


বহুকাল ধরেই বাঙালীর লোক ঐতিহ্য পিঠার ইতিহাস বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের ঘরে ঘরে শীত ঋতুতে বারবার হাজির হয়। শীতে বিভিন্ন ধরনের পিঠার গুরুত্ব এবং ভূমিকা সে তো ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী। গ্রামীণ মানুষদের কাছে পিঠা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, পিঠার এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় শহরের সবখানে এখন ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ অন্য ঋতুর চেয়ে শীতঋতু আসলেই যেন খুব বেশী পিঠা উৎসবের আয়োজন করে। যুগ যুগ মানুষেরা সুস্বাদু উপাদেয় পিঠা খাদ্যদ্রব্যে উৎসব পালন করে আসছে।

হেমন্ত আসতে না আসতেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন। চলে পিঠা বানানোর প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে গ্রামেগঞ্জে তৈরিও হচ্ছে নানান স্বাদের পিঠা। শুধুই যে গ্রামে তা নয়, শহরের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠে বিভিন্ন পিঠার দোকান। এই দোকানেও পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের মানুষদের মতো। তবে গ্রামীণ জনপদের মানুষ যে ভাবে পিঠা তৈরী করে শহরের মানুষ ততটা ভালো পারে না। গ্রামই তো পিঠা তৈরি করার শিকড় স্হান। শীতকালের আমেজে খেজুর গুড় আর রস ছাড়া তো পিঠা তৈরীর পূর্ণতা কখনই উৎকৃষ্ট হয় না। খেজুরে রস দিয়ে ভাপা পিঠা, পুলি, দুধ চিতই পায়েস যাই হোক না কেন শীতঋতু আর খেজুর গাছ ছাড়া অসম্ভব।

শীত ঋতুতে গ্রামে গঞ্জে খেজুর রস আর শীতের হরেক রকম পিঠা নিয়েই তো হয় উৎসবের আমেজ। বাড়িতে তাদেরই নিজ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো ও জামাই মেয়েদের বাড়িতে নিয়ে এসে নতুন কাপড় চোপড় উপহার দেওয়ার যেন হাজার বছরের রীতি। উনুনের পাশে বসে গরম গরম ধোঁয়া বা ভাপ উঠার ভাপা পিঠা খেজুর গুড় বা গাঢ় খেজুর রসে চুবিয়ে খাওয়ার ষোলকলা পূর্ণ হয় না শীতঋতু ছাড়া। শুভ সকালে সারারাত্রির বাসি, ঠান্ডা ভাপা পিঠা খেজুর রসে চুবিয়ে খেতে মন্দ লাগে না। মজার বেপার হল শীতকালের এই অমৃত ভাপা পিঠা শুধুই যে গ্রামের মানুষের কাছে প্রিয় তা কিন্তু নয়। শহরের অলিতে গলিতেও দেখা যায় অনেক ভাপা পিঠার দোকান। নারিকেল আর খেজুর গুড়ের সমন্বয়ে চালের আটা মিশ্রণে ভাপা পিঠা তৈরীও হয়। তবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ হুমড়ি খেয়েই সেগুলো পিঠা খায়। বলতেই হয় গ্রামই পিঠা তৈরীর শ্রেষ্ট স্হান।

এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম করনে চিহ্নিত পিঠা বা আলাদা গঠনে নকশাকৃতির পিঠা লক্ষনীয়। গ্রামীণ জনপদের মানুষ অগ্রহায়ণ মাসে সাধারণতঃ নতুন ধান উঠার পর পরই যেন পিঠা তৈরির আয়োজন শুরু করে। অসলে শীতঋতুতে হরেক রকম পিঠার বাহারি উপস্থাপন এবং আধিক্য হয় বলেই কিশোর কিশোরীরা মামার বাড়ি যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ততা দেখায়। মামার বাড়ি মধুর হাড়ি এই কথাটি যে যুগে যুগে হয়তো সত্যিই রয়ে যাবে। গ্রামবাংলার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পিঠার অনেক নাম গ্রামের মানুষের দ্বারে এসে হানা দেয় আজও। বিভিন্ন পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি গ্রামাঞ্চলের ধনী-গরীব নির্বিষেসে প্রতিটি ঘরে ঘরেই শুরু হতে দেখা যায়। সুতরাং গাঁ গেরামেই আত্মীয়-পরিজনের আগমন ঘটে।

নানার বাড়িতে কিশোর কিশোরীরা শীতকালীন ছুটি নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে তাদের যেন দু'চোখে ঘুম আসে না। মেয়ে-জামাই তাদের সন্তানাদের সঙ্গেই শশুর বাড়ি হওয়ার ইচ্ছাটাও পোষন করে। গ্রামে অনেক হতদরিদ্র পরিবারেও যেন বিনোদনের চরম দৃশ্যপট উদয় হয় শীতকালে। আজকাল শীতঋতুর অনেক পিঠা শহরেও মেলা উৎসবের আয়োজন করে গ্রাম গঞ্জের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার দিকনির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করছে। দিকনির্দেশনার পথ প্রদর্শক হিসেবে দেখা যায় সুশীল সমাজকে, প্রগতিশীল মানুষ এবং শিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীকে। সুতরাং গ্রাম গঞ্জের ধনী পরিবার নানান জাতীয় পিঠার ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে তাদের মেয়ে জামাইকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়ে থাকে। শীতঋতুর এই হরেক রকম পিঠা তৈরীর আপায়নে গ্রামীণ জনপদের মানুষরা এখন দিনে দিনে অতীতের বিলুপ্ত হওয়া পিঠাগুলো এখন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং সংস্কৃতির প্রতিও সচেতন হচ্ছে ।

আহা, কি আনন্দ ঘরে ঘরে। ভোজন প্রিয় বাঙালির ঐতিহ্যে পিঠার ইতিহাস খুব পুরনো হলেও বর্তমানে পিঠার স্বাদ আধুনিক ও রন্ধন শিল্পের নানান করণ কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। পিঠার চমৎকার গন্ধের বাড়ির উঠান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খেজুর রসেরগন্ধ যুক্ত পিঠা সবার কাছে আজ সমাদৃত। হতদরিদ্র গাঁ গেরামের খেটে খাওয়া শ্রমিক মানুষের দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির মুহুর্ত যেন অনাবিল এক শান্তির পরশ বয়ে আনে। তাদের খুব পরিশ্রম ও দুঃখ-কষ্টের জীবন হলেও বিভিন্ন পিঠা উৎসবের আয়োজন করতে একটুও পিছপা হয় না। তারা অবাক করে দেবার মতোই অনেক পদের পিঠার নাম বলতে পারে। প্রামাঞ্চলের একজন প্রতিভাবান তরুন শহুরের যান্ত্রিক জীবন কাটিয়ে সে পুনোরাই গ্রামেই থাকছে। সেই গ্রামের যুবক আব্দুল্লাহ আল মামুন সনেট পিঠা সম্পর্কে বলেন, এদেশে ১৫০ বা তারও বেশী রকমের পিঠা থাকলেও মোটামুটি প্রায় ৩০ প্রকারের পিঠার প্রচলন খুবই বেশি লক্ষ্যনীয়।তাছাড়া আরও কতো রকমারি পিঠা অঞ্চল ভেদে রয়েছে সেই গুলোর নাম বলে শেষ করা যাবে না। তবুও সে এক নিঃশ্বাসে বলা শুরু করে। যেমন:-

নকশি পিঠা, ভাঁপা পিঠা, ছাঁচ পিঠা, রস পিঠা, দোল পিঠা, পাকান পিঠা, চাপড়ি পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা, চিতই পিঠা, ছিট পিঠা, পাতা পিঠা, খেজুরের পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা পিঠা,পানতোয়া পিঠা, ডিম চিতই পিঠা, জামদানি পিঠা, ভেজিটেবল ঝাল পিঠা, সরভাজা পিঠা, ছিটকা পিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, চাঁদ পাকন পিঠা, মালপোয়া পিঠা, ঝালপোয়া পিঠা, কাটা পিঠা, তেজপাতা পিঠা, তেলপোয়া পিঠা লবঙ্গ লতিকা পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, মালাই পিঠা, চুটকি পিঠা, গোকুল পিঠা, নারকেল পিঠা, আন্দশা পিঠা, পুুুডিং পিঠা, মুঠি পিঠা, সুন্দরী পাকন পিঠা, রসফুল পিঠা, মেরা পিঠা, তেলের পিঠা চাপড়ি পিঠা, সেমাই পিঠা, দুধরাজ পিঠা, গোকুল পিঠা, বিবিয়ানা পিঠা, ঝিনুক পিঠা, ঝুড়ি পিঠা, ফুল পিঠা, ফুল ঝুরি পিঠা, কলা পিঠা, ক্ষীর কুলি, কুশলি পিঠা, ফিরনি পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, নারকেলের ভাজা পুলি পিঠা, ঝাল মোয়া পিঠা, নারকেলের সেদ্ধ পুলি পিঠা, নারকেল জেলাফি পিঠা, চিড়ার মোয়া পিঠা, নারকেল নাড়ু পিঠা এবং কাউনের মোয়া পিঠা ইত্যাদি নাম অঞ্চল ভেদে পিঠা হিসেবেই বিবেচক্য। এদেশের হতদরিদ্র গাঁ গেরামের মানুষ পিঠার আদলেই ধরে কিছু কিছু খটকা লাগা উপরোউল্লেখিত পিঠা নামক খাবার সামগ্রীকে। কারণ, তাদের সাধ ও সাধ্যের বাহিরেই তো পরিচালিত হয় জীবন। শীত আয়োজনে সত্যিই এমন ধরণের পিঠা গুলোকে ধনী, গরীবের পার্থক্যে নিয়ে না এসে নজরুল ইসলাম তোফা গ্রামীণ সকল বাঙালির রসনা বিলাসের উপাদেয় পিঠার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে। গ্রামীন বাঙালির পিঠা উৎসবের রসনা বিলাসী দিক হয়তো পৃথিবীতে আর নেই।

গ্রামবাংলায় ধানের মৌসুম অনুযায়ী নানান পিঠা তৈরী হয়। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন মিলে পিঠা খাওয়ার আনন্দকে কেন্দ্র করে গ্রামের দরিদ্র মজুরদের সঙ্গে নিয়ে ধান মাড়াই করে চালের আটা তৈরি করে মেতে উঠে বিভিন্ন পরিবার। পিঠা তৈরী নানান জাতের চালও শীতঋতুতে গ্রামীণ বাজারেও ক্রয় করা হয়ে থাকে। কোন কোন পরিবার অনেক আগেই পিঠা তৈরীর প্রয়োজনীয় বাৎসরিক চাহিদা ঘরে মজুদ করে রাখে। খেজুর গুড় বা নারিকেলের যোগান এখন তারা গ্রামে ফ্রিজ ব্যবহার করে পিঠা তৈরীর মজা উপভোগ করছে। আয়েস করে পিঠা খাওয়ার তৃপ্তির ঢেঁকুর গ্রামঞ্চলে কনকনে শীতের সময় খুব ছড়িয়ে পড়ে। নিশ্চয় এইসব পিঠার চাল মেশিনে ভাঙানো বা পাটায় পিষানো চাউলে হয়ে থাকে। এক সময় ঢেঁকিতে গীত গাইতে গাইতে চাল থেকে আটা তৈরী করতো গ্রামীণ মেয়েরা। ঢেঁকির শব্দ এখনো কানে বাজলেও পিঠা খাওয়ার উৎসব কমে যায়নি বলা চলে। যে সব মেয়েরা বাবা বাড়ি আসতে পারেনা তাদের শ্বশুর বাড়ীতে শীত মৌসুমী পিঠা পাঠাতেও ভুল করেনা। গ্রাম বাংলার মানুষের এমনই জীবন সত্যিই নান্দনিকতার বহিঃ প্রকাশ ও তাদের উৎসব পূর্ণ বিনোদনের এজীবন আসলেই ইতিহাসের কালজয়ী সাক্ষী।



(এনআইটি/এসপি/নভেম্বর ০৮, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

২৩ এপ্রিল ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test