Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

২০১৭ নভেম্বর ১০ ১৬:৩৭:০৯
হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা : দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যে সদরের হিজলগাড়ী (কুমারপাড়া) এ এলাকার মানুষ একে অন্যকে দু’ভাবে চিহ্নিত করে। উপজেলাতেও বংশ পরম্পরায় বসবাসকারীদের স্থানীয় ভাষায় ‘বরিন্দা’ এবং দেশভাগের পর ভারত থেকে আসা মানুষকে ‘দিয়াড়া’ বলা হয়।

ভাষা-সংস্কৃতির দিক থেকেও পার্থক্য রয়েছে উভয়ের মধ্যে। খাবার থেকে শুরু করে ব্যবহৃত জিনিসপত্রেও রয়েছে ভিন্নতার ছাপ। বিশেষভাবে, দিয়াড়া গ্রামগুলোতে রান্নার জায়গাটি বাড়ির বাইরে আলাদাভাবে নির্মাণ করা হয়। সেখানে থাকে ভিন্নতার ছাপ। স্থানীয় বরিন্দারা যেখানে মাটির চুলা তৈরি করেন একেবারে সাদামাটাভাবে; সেখানে দিয়াড়াদের চুলা একেবারে ভিন্ন আকৃতির।

খড়, মাটির তৈরি টালি আর বাঁশের খুুঁটি দিয়ে চারচালা করে তৈরি করা হয় রান্নাঘর। সেই ঘরের চারদিক কোমর অবধি মাটির তৈরি দেয়াল তুলে ঘেরাও করে দেওয়া হয়; যেন ঝড়ো বাতাস না লাগে। রান্নাঘরের ভেতরে থাকে চুলা; আর তার ধোঁয়া বের হয় ঘরের বাইরের দিকে। মাটির তৈরি পাইপ দিয়ে ধোঁয়া বাইরে চলে যাওয়ায় রাঁধুনীকে কষ্ট পেতে হয় না। আবার বিশেষ কায়দায় তৈরি সেই চুলার আগুন যেন বাইরে বেরিয়ে না আসে, তারও ব্যবস্থা থাকে।

রান্নাঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রও মাটির তৈরি। বাইরে থেকে যাওয়া যেকোন ব্যক্তিকে আকর্ষণ করবে দিয়াড়াদের এই বিশেষ রান্নাঘর। আসলেই তাই; চমক এখানেই শেষ নয়। মাটির তৈরি বিশাল বাড়িজুড়েই রয়েছে চমক। মাটির তৈরি দোতলা বাড়ির রং আর কারুকাজ দেখলে সেটাকে মাটির বাড়ি ভাবতে অনেকটা সময় লাগার কথা।

মাটির দেয়ালে আলমারির মতো কোটর করে জায়গা রাখা থাকে। যেখানে বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা যায়। ধান সংরক্ষণের জন্য রয়েছে বিভিন্ন আকারের কুঁঠি বা গোলা। এই গোলার নিচের অংশে গোলাকৃতির ছিদ্র সিপি দিয়ে আটকে রাখা থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী ছিপি খুলে ধান বের করে নেওয়া যায়।

ডালের খোসা ছাড়ানোর জন্য রয়েছে মাটির তৈরি জাঁতা, সেই যন্ত্রে আটাও তৈরি করা যায়। মুরগি রাখার ঘর, ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা তোলার জন্য বসন্যা, হাড়ি-পাতিল রাখার বসন্যাও রয়েছে। এছাড়া আটা চালার চালনাও বিশেষ কায়দায় তৈরি। প্লাস্টিকের কাঠামোর তলায় মশারির মতো জাল যুক্ত করে তৈরি করা নয়; কাঠের ফ্রেমে চামড়া লাগিয়ে গরম সুঁচ দিয়ে ফুটো করে তৈরি করা হয় এই বিশেষ পাত্র।

চামড়ার তৈরি চালনা, দোতলা বাড়ি আর কাঁসার বাসন-কোসন এই এলাকায় কোনো মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণের অনুষঙ্গ। মাটির তৈরি এসব পাত্র নারীরাই বাড়িতে বসে তৈরি করেন। কমবয়সী অনেকেও তৈরি করতে পারে এসব পাত্র। এসব পাত্র তৈরির জন্য বয়স্ক নারীর কদর থাকলেও নতুন করে এসব বানানোর আগ্রহ তেমন একটি নেই।

আগেকার দিনে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও গ্রাম্যমেলা থেকে মাটির তৈরি রঙিন হাড়ি-পাতিল কিনে নিয়ে আসতেন। ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সেসব রঙিন হাড়ি টাঙিয়ে রাখা হতো পাটের তৈরি রং-বেরঙের শিকায়। হাট-বাজারে কুমারদের তৈরি হাড়ি-পাতিল বিক্রির আলাদা জায়গায় নির্ধারণ করা থাকতো। সেখানে মাটির হাড়ি, কাঁসা, ঢাকনা, কলস, কড়াই, ডাবর, প্রদীপ, সরা, ঢুকসা, রুটি তৈরির খোলা, মুড়ি ভাজার সামগ্রী, পিঠার ছাঁচ, ব্যাংক, চাল রাখার মঠ বিক্রি হতো।

এখন সারাদেশে মাটির জিনিসের কদর আর আগের মতো নেই বললেই চলে। মাটির তৈরি জিনিসের তুলনায় প্লাস্টিকের পণ্য টেকসই হওয়ায় কদর বাড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি জিনিসের ঐতিহ্য। অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। তবে শহরের অনেক দোকানে এমনকি শপিং মলে বিক্রি হচ্ছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র। যেগুলো শিল্প সচেতন মানুষ ঘর সাজানোর অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফুলদানি, পটারি, ঢাকনাসহ বিভিন্ন জিনিসের পাশাপাশি প্লাস্টিকের পণ্যের আদলে মসৃণ করে বানানো থালা, বাটি, গ্লাস, গামলা, হাড়ি, মুখোশ পাওয়া যাচ্ছে দোকানগুলোতে। এছাড়া নামিদামি খাবারের রেস্তোরাঁতেও দেখা মিলছে মৃৎশিল্পের। তবুও বলতে হয়, গ্রাম থেকে শহরে মাটির তৈরি জিনিসপত্র এসেছে ঠিকই। কিন্তু মাটির সেই সোঁদা গন্ধ আর নেই।

(এসআইআর/এসপি/নভেম্বর ১০, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

২২ এপ্রিল ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test