Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন জরুরী

২০১৯ অক্টোবর ০৩ ১৬:৩৬:২২
হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন জরুরী

রূপক মুখার্জি


জাতি, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ এবং লিঙ্গ পরিচয়ের ভেদাভেদ দূর করে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ। শোষনমুক্ত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। এ জন্য বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই ধর্মীয় অনুশাসনের ভিত্তিতে ধর্ম, সম্প্রদায় ও নৃ-গোষ্ঠীর জন্য আলাদা উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইন চালু রাখা হয়েছে। এ কারণে জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় জনসাধারনের নানা অংশের মধ্যে নানা ধরনের শোষন ও বৈষম্য রয়ে গেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ সব শোষন ও বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার নারী। বিশেষ করে, বিয়ে এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি অধিকার বঞ্চিত হিন্দু নারীরা। মুসলিম ও খ্রিষ্টান নারীদের তুলনায়ও হিন্দু নারীর শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনা যেন সীমাহীন।

হিন্দু ধর্মীয় প্রথায় নারীর বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার না থাকার কারণে মারাত্মক বৈষম্য বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন দেশের অগনিত হিন্দু নারী। স্বামী ভবঘুরে, বেকার, দুশ্চরিত্র, লম্পট, মাদকাসক্ত, নির্যাতনকারী, পরকীয়ায় আসক্ত কিংবা নিরুদ্দেশ যাই হোন কেন স্ত্রীর বিয়ে বিচ্ছেদের কোন অধিকার বা সুযোগ নেই। একটি আইন অনুযায়ী, আলাদা থাকার সুযোগ থাকলেও লোক লজ্জ্বার ভয়ে অনেক নারীই দিনের পর দিন অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মুখ বুঝে পড়ে থাকে স্বামীর সংসারে। অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষরা স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই একাধিক বিয়ে করার সুযোগ রয়েছে।

শুধু তাই নয়, স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবা নারীরা স্বামীর সম্পত্তির কোন ভাগ বা অংশ পান না। আর এ কারণে বহু হিন্দু বিধবা নারীকে আশ্রিতের মতো বাস করতে হয় মৃত স্বামীর বাড়িতে। এ ক্ষেত্রে বিধবা নারীরা তাদের পিতৃলয়ে আশ্রয় নিলেও কোন লাভ হয় না। কেননা, সম্পত্তির মতোই পিতার সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর কোন উত্তরাধিকার নাই। পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর কেবল আজীবন ভোগের অধিকার রয়েছে, কোন বিধিবিধান দ্বারা সু-নির্দিষ্ট না থাকায় এটি অধিকারহীনতারই নামান্তর।

স্বামী নির্যাতন করলে কিংবা স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হলে হিন্দু নারীর আলাদা বসবাস ও ভরনপোষনের বিষয়ে ১৯৪৭ সালে প্রনীত একটি আইন রয়েছে। এই আইনের আশ্রয় নিয়ে হিন্দু বিধবা নারীরা শালিসের মাধ্যমে আলাদাভাবে বসবাস করে নিজের ও সন্তানের ভরণপোষন আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন।
হিন্দু নারীর সংকট আরও বাড়ার কারণ, হিন্দু প্রথায় বিয়ের নিবন্ধন না থাকা।

হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন করতে সরকার ২০১৩ সালে একটি আইন প্রণয়ন করলেও সেটি বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক। শিক্ষিত ও উচ্চ বিত্তের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা থাকলেও নিম্নবিত্ত হিন্দু নারীরা এ সমস্যার বড় শিকার। হিন্দু পুরুষ বিয়ের কথা অস্বীকার করলে, নারীর ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করা অনেক ক্ষেত্রেই দুরহ হয়ে ওঠে। ফলে একদিকে নিবন্ধন না থাকায় বিয়ে প্রমাণ করতে না পারার সংকট, অন্যদিকে, বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার না থাকায় সারাজীবন স্বামীর গলগ্রহ হয়ে থাকার সংকটে হিন্দু নারীরা আসলেই অসহায়।

ব্রিটিশ ভারতের ১৯৪১ সালে হিন্দু ব্যক্তিগত আইনকে বিধিবদ্ধ করাকে স্যার বিএন রাওয়ের সভাপতিত্বে “হিন্দু ল কমিটি” গঠন করা হয়, যা রাও কমিটি নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতে ১৯৫৬ সালে রাও কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সমগ্র ভারত বর্ষের জন্য অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন ‘দা হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্ট’ পাশ হয়। যার মাধ্যমে ভারতের সব অঞ্চলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে নারীর মালিকানা বা অধিকার স্বীকৃত হয়। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশেও পূর্বের আইনটি রয়ে গেছে।

ভারত সরকার পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের আইন সংশোধন করে সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার মগ্রহ ভারতের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। সম্প্রতি সার্ক ভুক্ত দেশ নেপালে হিন্দু আইন সংস্কারের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

দেশের নারী আন্দোলনের কর্মী ও মানবাধিকার কর্মীরা বক্তৃতা, বিবৃতি, সভা-সমাবেশ ও সেমিনারে দীর্ঘদিন বলে আসছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তিতে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারাই সমাজে নারীর প্রতি নানাবিধ বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুসলিম পারিবারিক আইনে নারী পুরুষের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীকে বঞ্চিত না করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে বিষয়টির সরার পথ বের করার আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই কথা, হিন্দু নারীর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কেননা, মুসলিম নারীরা পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে একটি নির্দিষ্ট ভাগ বা অংশ পেলেও হিন্দু নারী কোন ভাগ বা অংশ পায় না। আবার মুসলিম বিবাহ রীতিতে শর্তসাপেক্ষে নারীর তালাক বা বিচ্ছেদের অধিকার থাকলেও হিন্দু নারী কোন অবস্থাতেই বিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারে না।

নারী পুরুষের এই বৈষম্য দূর করতে হিন্দু ধর্মীয় বিয়ে ও উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে না পারলে নারী প্রতি বঞ্চনার মাত্রা বাড়বে, বৈ কমবে না। নারী পুরুষের বিভাজন দূর করে মুক্তিযুুদ্ধের কাঙ্খিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী, নড়াইল।

পাঠকের মতামত:

০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test