E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা

২০২০ জানুয়ারি ০৩ ১৬:৫৩:১৭
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা

মমিনুর রহমান


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হলো ভবিষ্যত ‘আন্তর্জাতিক উন্নয়ন’ সংক্রান্ত একগুচ্ছ লক্ষ্যমাত্রা। ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে United Nations Sustainable Development Summit এ ১৯৩টি দেশের সরকার প্রধানদের আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে এবং “টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা” হিসেবে লক্ষ্যগুলোকে প্রচার করেছে জাতিসংঘ। এসব লক্ষ্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-কে প্রতিস্থাপন করেছে যা ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। SDGsএর মেয়াদ ২০১৬-২০৩০ সাল। এতে মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অন্তর্ভূক্ত আছে।

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যঃ শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন এবং তাদের দেশাত্ববোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার করণীয়ঃ

১. দারিদ্র্য বিমোচনঃ সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল করা (End poverty in all its forms everywhere)

দারিদ্র্য দূর করার জন্য চাই শিক্ষা। আর্থিক ও মানসিক দারিদ্র্য দূর করার জন্য আনুষ্ঠানিক বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রকৃত ফলপ্রসূ সম্মিলন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ’ উদযাপনের অংশ হিসেবে ‘শিক্ষা র‌্যালি’র আয়োজন করা হয়। মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, উঠান বৈঠক, স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে সংশ্লিষ্টতা, এসএমসির দায়িত্বশীলতা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার আলো প্রতি ঘরে পৌছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে যা দক্ষ জনশক্তি বা মানবসম্পদ গঠনের হাতিয়ার।

প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তী স্তরে মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার প্রচলন ও সমন্বয় সম্ভব হলে দেশকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে মনে করি। বিশ্বব্যাংকের মান অনুযায়ী দিন প্রতি ১.৯ ডলারের নিচের আয়ের এবং জাতীয় দারিদ্র্যসীমা দ্বারা পরিমাপকৃত চরম দারিদ্র্য হ্রাসে আমাদের অগ্রগতি সঠিক পথেই রয়েছে। মোট সরকারি ব্যয়ের অংশ হিসেবে সেবা খাতসমূহের (স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা) ওপর ব্যয়িত অর্থে অগ্রগতিও সঠিক ধারায় রয়েছে। ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.৩% ও চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ১২.৯% যা ২০১৯ সালের জুন মাস শেষে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২০ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার কমে দাড়িয়েছে ১০ শতাংশে।

২. ক্ষুধা মুক্তিঃ ক্ষুধা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু (End hunger, achieve food security and improved nutrition and promote sustainable agriculture)

ক্ষুদা মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সারাদেশে ‘মায়ের দেয়া খাবার খাই, মনের আনন্দে স্কুলে যাই’ শ্লোগানে শুরু হয় প্রতিদিন মিড ডে মিল কার্যক্রম যা আনুমানিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ২৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব। ২০২৩ সালের মধ্যে সারাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ চালুর লক্ষ্য নিয়ে এ বছর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

এই নীতিমালার ৩ এর (১) ধারায় বলা হয়েছে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরীর ন্যূনতম ৩০ ভাগ স্কুল মিল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে। যা প্রাথমিক এবং প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৩ থেকে ১২ বছর বয়েসি ছেলে ও মেয়ে শিশুদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এবং এই বয়েসি স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট’র ৫০ শতাংশ স্কুল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে। খাদ্যের বৈচিত্র নিশ্চিত করার (মিনিমাম ডায়টরি ডাইভার্সিটি) জন্য ১০টি খাদ্যগোষ্ঠী বিচেনায় নিয়ে তন্মেধ্যে ৪টি খাদ্যগোষ্ঠী নির্বাচন করা হবে। মিড ডে মিলের আওতায় বর্তমানে সরকার তিনটি উপজেলায় রান্না করে খাবার পরিবেশন করছে।

১০৪টি উপজেলায় ১৫ হাজার ৩৪৯টি স্কুলের ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে এই ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে। এছাড়া দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সততা স্টোর চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অল্প পরিমানে হলেও ক্ষুধা মুক্তি ও পুষ্টি অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি হিসাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ‘ গঠনের আদেশ জারি করেন। ১৯৯৭ সালে প্রথম জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় এবং ২০১৫ সালে সরকার জাতীয় পুষ্টি নীতি অনুমোদন করে।

৩. সু-স্বাস্থ্যঃ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা ও সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করা (Ensure healthy lives and promote well-being for all at all ages)

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যে প্রথমেই শিশুর শারীরিক বিকাশ সাধনের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া একটি অন্যতম প্রান্তিক যোগ্যতা হলো শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক বিকাশে সহায়তা করা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করা। এ ব্যাপারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমপক্ষে এক ষষ্ঠক ‘কাব দল’ ও এক ষষ্ঠক ‘হলদে পাখির দল’ গঠন করা আছে। ক্ষুদে ডাক্তার টিম আছে যাদের মাধ্যমে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো থেকে শুরু করে, কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়ানো, ওয়াশরুম ব্যবহার বিধি, প্রতি বৃহস্পতিবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং সর্বদা সে মনোভাব সকল শিশুদের মাঝে জাগ্রত রাখা, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম চলমান। যা এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করানো প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম একটি লক্ষ্য।

এ ব্যাপারে প্রাত্যহিক সমাবেশে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে, ফলাফল প্রকাশের উদ্দেশ্যে অভিভাবক সমাবেশে ও বিভ্ন্নি জাতীয় দিবস পালনের মাধ্যমে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করানো হয় সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করে। এছাড়াও দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে স্থাপিত হয়েছে ‘মহানুভবতার দেয়াল’ ও ‘ভালো কাজের পুরস্কার’ এর মাধ্যমে মানবিক ও নৈতিক বিকাশের চর্চা হচ্ছে।

৪. মানসম্মত শিক্ষাঃ অন্তর্ভূক্তিমূলক ও সমতা-ভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা (Ensure inclusive and equitable quality education and promote lifelong learning opportunities for all)

মানসম্মত শিক্ষার মুল উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য সুনাগরিক তৈরি। সারা বিশ্বের মানুয়ের শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে মানসম্মত শিক্ষা একটি বড় কর্মপরিকল্পনার অংশ। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেমন নারী, ছিন্নমূল শিশু, প্রতিবন্ধি শিশু ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অন্তর্ভূক্তিমূলক ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা হলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির শিকার হবে।

মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১.One day one word learning কর্মসুচি, ২. শতভাগ রিডিং স্কিল ডেভেলপমেন্ট (বাংলা ও ইংরেজি), ৩. বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদেরকে এসিস্টিভ ডিভাইস প্রদান, ৪. বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে অটিজম বিষয়ে ধারণা প্রদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, ৫. বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষকগণের প্রশিক্ষণ, ৬. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ধারণা প্রদানের জন্য মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করে শ্রেণিপাঠদানের ব্যবস্থা, ৭. মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য অনলাইন ব্যবস্থা চালুকরণ, ৮. শিক্ষক, কর্মকর্তাদের উৎসাহ বা চাকরি সন্তুষ্টি বৃদ্ধির জন্য বিদেশ সফর, ৯. শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন শ্রেনির কর্মকর্তা ও শিক্ষকগণ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে নানা ধরনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম। যেমন: মোবাইল মাসী বা বিদ্যালয় বন্ধু, Student of the day, মহানুভবতার দেয়াল, সততা স্টোর, থিম বেইজড ক্লাসরুম, বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার, সেরা মায়েদের পুরষ্কার, পেনশন সহজীকরণ, বিদ্যালয়গুলো ই-মেইল যোগাযোগ, মুক্তপাঠে অনলাইন কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ, শিক্ষক বাতায়নে ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরি ও সেরা কন্টেন্টগুলো দেখে অভিজ্ঞতা অর্জন, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে বিনা খরচে অনলাইন বার্তায় পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক অভিজ্ঞতা বিনিময়, এই দিনে, মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার, প্রিয় শিক্ষক প্রিয় মুখ, শিক্ষকগণের প্রতি বছর বই পড়া প্রতিযোগিতা, শিশুবরণ উৎসব, ভালো ফলাফলের পুরষ্কার, সেরা মা বাছাই ও পুরষ্কার প্রদান ইত্যাদি। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষা প্রথম সিড়ি অর্থাৎ ভিত্তি রচনা করতে পারে এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

৫. লিঙ্গ সমতাঃ লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন করা (Achieve gender equality and empower all women and girls)

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ নারীদের জন্য বহাল রাখা আছে। লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের চর্চা হিসেবে স্কাউটিং এ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য ‘হলদে পাখির দল’ ও ছেলেদের জন্য ‘কাব দল’ গঠন করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ছেলে বা মেয়ে উভয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য গঠন করা আছে স্টুডেন্ট কাউন্সিল, বালক ও বালিকা আলাদাভাবে অংশগ্রহণের জন্য আন্ত:প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। আজকের শিশুকে মানবসম্পদে পরিণত করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন অভিভাবক সমাবেশের পাশাপাশি অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে মা সমাবেশের, উঠান বৈঠকের বা হোম ভিজিটের। যার ফলাফল ইতোমধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি।

৬. সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাঃ সবার জন্য পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সহজপ্রাপ্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা (Ensure availability and sustainable management of water and sanitation for all)।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানির উৎস নিশ্চিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রতিটি শিশুর জন্য পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্ষুদে ডাক্তার টিমের মাধ্যমে নলকূপ, ওয়াশব্লক ব্যবহারবিধি শিশুদেরকে অবহিত করে ব্যবহারিক চর্চা করানো হয়। মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক, অভিভাবক সমাবেশ, হোম ভিজিট ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের প্রত্যেকটি ঘরে সচেতনতা সৃষ্টির ব্যাপারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা দিবালোকের মতই স্পষ্ট।

৭. নবায়নযোগ্য ও ব্যয়সাধ্য জ্বালানীঃ সবার জন্য ব্যয়সাধ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানী সুবিধা নিশ্চিত করা (Ensure access to affordable, reliable, sustainable and modern energy for all)

স্থানীয় ও সরকারী উদ্যেগে মোট প্রয়োজনীয় জ্বালানী চাহিদার ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানী থেকে মেটানোর জন্য অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হচ্ছে যা দেখে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন নবায়নযোগ্য ও ব্যয়সাধ্য জ্বালানী ব্যবহারে উৎসাহ ও সচেতনতা দুইই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৮. কর্মসংস্হান ও অর্থনীতিঃ সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদী, অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল ও উপযুক্ত কাজের সুবিধা নিশ্চিত করা (Promote sustained, inclusive and sustainable economic growth, full and productive employment and decent work for all)

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণে এলামনাই এসোসিয়েশন গঠন, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, এলাকার মানবম্পদের সমন্বয়ে জাতীয় দিবসসমূহ পালনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সর্বচ্চো সচেতনতা বিস্তরণ করা সম্ভব।

৯. উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামোঃ দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই শিল্পায়ন করা এবং উদ্ভাবন উৎসাহিত করা (Build resilient infrastructure, promote inclusive and sustainable industrialization and foster innovation)

বদলে যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ- দেশের প্রায় সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গঠিত হয়েছে উন্নত অবকাঠামো। চার/পাঁচ/ছয় তলার ভিত্তি স্থাপন করে গড়ে উঠছে শ্রেণিকক্ষ। ভৌত অবকাঠামো একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক চাহিদা (শিখন পরিবেশ) পূরণ করে। একটি সুন্দর পরিবেশ শিশুদেরকে বিদ্যালয়মুখী হতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সরকারি সেবা মানুষের দ্বোরগোড়ে পৌছে দিতে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা প্রয়োগ করতে শুরু করেছে ০৪ নং লক্ষ্যমাত্রায় উল্লিখিত উদ্ভাবনী কার্যক্রমসহ নানা ধরণের পরিকল্পনা। যা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভুমিকা পালন করছে।

১০. বৈষম্য হ্রাসঃ দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈষম্য হ্রাস করা (Reduce inequality within and among countries)

একই শ্রেণিতে ধনী-গরীব, সবল-দূর্বল, ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ-শিক্ষার্থীর আন্তঃযোগাযোগ অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈষম্য হ্রাসকরণে নতুন প্রজন্মকে অধিকতর সচেতন করে তুলতে পারে।

১১. টেকসই নগর ও সম্প্রদায়ঃ নগর ও মানব বসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করে তোলা (Make cities and human settlements inclusive, safe, resilient and sustainable)

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ল্যাপটপ, মডেম, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, সাউন্ড বক্স ইত্যাদি আইসিটি যন্ত্রপাতি গ্রামের পিছিয়ে পড়া শিশুদেরকে এনে দিয়েছে স্বপ্ন। এ সকল শিশুদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর এ ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাদান বিশ্বায়ন ও নগরায়ন কে অন্তর্ভূক্তিমূলক ও টেকিসই করে তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকগণের ডিজিটাল পাঠদান পিছিয়ে পড়া এলাকাকে আরও নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করে তুলতে পারে।

১২. সম্পদের দায়ীত্বপূর্ণ ব্যবহারঃ টেকসই ভোগ ও উৎপাদন রীতি নিশ্চিত করা (Ensure sustainable consumption and production patterns)

দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বল্প পরিমান জমি থাকলেও আঙ্গিনায় ফুলের বাগান তৈরি, বৃক্ষ রোপন, খেলাধুলার স্থান, প্রাত্যহিক সমাবেশের স্থান, পতাকা বেদি, মা-দের বই পড়ার স্থান, দেয়ালে-পিলারে শিক্ষামূলক বিভিন্ন বিষয়ের ছবি-লেখা, শিক্ষার্থীদের আঁকা চিত্রাংকন, অফিসকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষ বিভিন্ন জিনিসের সমাহারে সুন্দর করে সাজানো ইত্যাদি শিক্ষার্থী ও এর সাথে সংশ্লিষ্টদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার শিক্ষা দেয়।

১৩. জলবায়ু বিষয়ে পদক্ষেপঃ জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা (Take urgent action to combat climate change and its impacts)

বর্ষা মৌসুমে প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় ফলদ বা বনজ বৃক্ষ রোপন করা হয়। এতে একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়ক হয় অন্যদিকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবার বৃক্ষ রোপন বিষয়ে সচেতন হয় এবং প্রতি ঘরে ঘরে জলবায়ু মোকাবেলার আন্দোলনের অংশ হিসেবে বৃক্ষ রোপন অভিযানে নেমে পড়ে। এখানেও প্রাথমিক শিক্ষাই অধিকতর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ও জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলা করতে।

১৪. টেকসই মহাসাগরঃ টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর, সাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও সেগুলোর টেকসই ব্যবহার করা (Conserve and sustainably use the oceans, seas and marine resources for sustainable development)

১৫. ভূমির টেকসই ব্যবহারঃ পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের সুরক্ষা, পুনর্বহাল ও টেকসই ব্যবহার করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয় রোধ ও বন্ধ করা এবং জীববৈচিত্রের ক্ষতি রোধ করা (Protect, restore and promote sustainable use of terrestrial ecosystems, sustainably manage forests, combat desertification, and halt and reverse land degradation and halt biodiversity loss)

প্রতিটি বিদ্যালয় পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে অত্র বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার জনসাধারণ, অসচেতন জনগণ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর পরিবার জীববৈচিত্রের ক্ষতি রোধে ভূমিকা পালন করতে সচেতন হবে, বৃক্ষ রোপনের পাশাপাশি পশু-পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে আগ্রহী হবে এবং এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জনগণ সরকারের মানবসম্পদের ভুমিকা পালন করবে।

১৬. শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানঃ টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ তৈরি করা, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ প্রদান করা এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা (Promote peaceful and inclusive societies for sustainable development, provide access to justice for all and build effective, accountable and inclusive institutions at all levels)

প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ণ পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষে দলীয় কাজ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্টুডেন্ট কাউন্সিল নির্বাচন, গণভোটে শ্রেণি ক্যাপ্টেন তৈরি করা, একই সঙ্গে খেলাধুলা, লেখাপড়া, সততার দোকান থেকে দোকানদারবিহীন কেনাকাটা, ধনী দরিদ্র সকল পরিবারের শিশুদের একই লাইনে সমাবেশে দাড়ানো সবই শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ তৈরি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার প্রতীক। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সকল ইতিবাচক কর্মকান্ডের প্রতিফলন ঘটলে বদলে যাওয়াটা টেকসই হবে বলে মনে করি।

১৭. টেকসই উন্নয়নের জন্য অংশীদারতঃ বাস্তবায়নের উপায়গুলো জোরদার করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনর্জীবিত করা (Strengthen the means of implementation and revitalize the global partnership for sustainable development)

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গঠিত ‘বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, এলামনাই এসোসিয়েশন, সামাজিক নিরীক্ষা কমিটি, শিক্ষক-অভিভাবক কমিটিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতা বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের মালিকানাবোধ জাগ্রত করে, দেশপ্রেম ও উন্নয়নশীলতায় সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে টেকসই উন্নয়নের জন্য অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরিশেষে বলতে পারি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে যা নিরলসভাবে এ বিভাগের কর্মকর্তা, শিক্ষক কাজ করে যাচ্ছে। আন্তরিকতার সাথে দেশের জন্য এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবং সম্মানিত শিক্ষকগণ নিম্নের সুপারিশগুলোর প্রতিফলন ঘটালে ‘টেকসই’ শব্দটির প্রতিফলন ঘটবে।

১.দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলা।

২.সুনাগরিক হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়/প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীকে তার অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা/দায়িত্ব সম্পাদনে প্রশিক্ষণ দেয়া।

৩.শিক্ষার্থীর নিজ পরিবেশকে জানতে ও বুঝতে সহায়তা করা।

৪ জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান ও অন্ত:দৃষ্টি লাভ করা এবং এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা।

৫.জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব বোঝা এবং প্রয়োগে আগ্রহী করা।

৬.শিশুকে গাণিতিক ধারণা ও দক্ষতা এবং বিদেশী ভাষা হিসেবে ইংরেজির প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করানো এবং এ ভাষা ব্যবহারে সহায়তা করা।

৭.শিক্ষার্থীর সামর্থ্য, প্রবণতা ও আগ্রহ অনুসারে তাকে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা এবং পরবর্তী স্তরে শিক্ষা লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলা।

৮. কায়িক পরিশ্রমের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করা।

৯. শরীরচর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক বিকাশে সহায়তা করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করা। এবং

১০. পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীকে তার অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

লেখক :সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, শালিখা, মাগুরা।

পাঠকের মতামত:

৩১ মার্চ ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test