E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

‘মরার জাত নাই, যুদ্ধের শেষ নাই’

২০২০ জুন ০২ ১৬:৩৯:১৩
‘মরার জাত নাই, যুদ্ধের শেষ নাই’

রহিম আব্দুর রহিম


বছর দু’য়েক আগের কথা, প্রতিবেশী এক মহিলা মারা গেলেন, তিনি পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর। একটি রাজনৈতিক দলের জেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাও ছিলেন। প্রতিবেশী, নেতৃস্থানীয়, ভাল মানুষ সব মিলিয়ে তার মৃত্যু কষ্টদায়ক। পরের দিন সকাল ১০ টায় তাঁর নামাজে জানাজা। রাতেই আমি আমার কর্মস্থলের অধ্যক্ষকে কমিশনারের মৃত্যুর সংবাদটি দিয়ে তাঁর জানাজা শেষে প্রতিষ্ঠানে যাবো বলে জানালাম। তিনি ইতিবাচক জবাব দিলেন। রাতেই মৃত কমিশনারের জানাজার সংবাদটি, মাইকে প্রচার হচ্ছে, ‘শোক সংবাদ, শোক সংবাদ, অমুক দলের তমুক ইন্তেকাল করেছেন, আগামীকাল সকাল ১০ টায়, তাঁর নামাজে জানাজা কেন্দ্রীয় গোরস্থানে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় ‘বি’ দল ও তাঁর অঙ্গ সংগঠন ‘য’ দল, ‘ছ’ দলের সকল নেতা কর্মী, শুভাকাঙ্খীদের জানাজায় শরীক হওয়ার জন্য আহ্বান করা হল।

আহ্বানে অমুক দলের সিনিয়র সহ সভাপতি তমুক।’ সকালে জানাজায় অংশগ্রহণ না করেই চলে গেলাম কর্মস্থলে, অধ্যক্ষ মহোদয় জিজ্ঞেস করলেন, ‘জানাজায় অংশগ্রহণ করেন নি?’ বললাম, আমি কোন দল করি না, তবে কোন একটি দলকে অন্তরে লালন করি। ওই দলের আদর্শ বিশ্বাস করি, জানাজায় আমাকে আমন্ত্রণ করে নি। তিনি ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি জানালাম, তিনি বললেন, “জানাজা ‘ফরজে কেফায়া’, দায়িত্ব পালন ‘ফরজে আইন’।” আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ এমন হয়েছে যে, মানুষ মারা যাওয়ার পরও মৃত ব্যক্তিকে দলীয় পরিচয়ে জানাজা করা হয়। অথচ, শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের নায়ক মাছ চুরি করতে গেলে তার নৌকায় একটি মৃত লাশ ঠেকে যায়, মাঝি তাঁকে জাত-পাতের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘এতো লাশ! জাত যাবে।’ শ্রীকান্ত উত্তর দিয়েছিল, ‘লাশের কোন জাত নেই।’ অথচ আমাদের জাত-পাতের বিভক্তি আদশহীন সমাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ, একদল অন্য দলের ভুল-ভ্রান্তি খতিয়ে-নতিয়ে তুলে ধরেন, তার তীব্র সমালোচনা করেন, অন্যায় অসুন্দরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর হয়। আবার এই প্রতিবাদী দলটি সকল প্রকার রাষ্ট্রের দুর্দিন-দু:সময়ে যার যার অবস্থানে থেকে সরকার বা তার প্রতিপক্ষকে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকেন। বিপক্ষ দলের প্রতিবাদ সমালোচনা পর্যালোচনা শেষে পক্ষ দল সংশোধন হওয়ার চেষ্টা করেন। আমাদের রাজনৈতিক আদর্শে যা উল্টো। একে অন্যের কুৎসা এবং সত্য-মিথ্যার তীব্র প্রতিযোগিতায় পরিবেশ এতই ঘোলাটে হয় যে, সাধারণ মানুষও তাদের প্রতি চরম বিরক্তিবোধ করে।

কোভিডকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পরিচ্ছন্ন আদর্শের স্বাক্ষর রেখেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তিনি দল নিরপেক্ষভাবে ভুক্তভোগীদের মাঝে ত্রাণ ও প্রনোদনা বিতরণে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে দল-মত নির্বিশেষে সত্যিকার ভুক্তভোগীরাই ত্রাণ সুবিধা ভোগ করছেন, তবে প্রনোদনার ব্যাপারটি এখনও বলা যাচ্ছে না। দলের রাঘব বোয়ালরা কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বোঝা যাবে পরে। ত্রাণের ক্ষেত্রে নিদর্লীয় কর্মকান্ডে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার, সাধারণ মানুষ থেকে ভূঁয়শী প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

তবে এক শ্রেণির চাঁপাবাজ নেতাদের বেফাঁস কথাবার্তা, চালচোর-তেলচোরদের স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি। কথায় বলে, ‘জাত যায় না মইলে, স্বভাব যায় না ধুইলে।’ শেখ হাসিনার আদর্শ এবার প্রথমদিকেই লুফে নিয়েছেন নারায়নগঞ্জের এমপি শামীম ওসমান। তিনি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নারায়নগঞ্জ সিটি কাউন্সিলর কোভিড হিরো, করোনা আক্রান্ত মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও তাঁর স্ত্রী আফরোজা খন্দকার লুনা’র পাশে দাঁড়িয়েছেন। যে সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়ায়, “খোরশেদ ও তাঁর স্ত্রীর পাশে দাঁড়ালেন শামীম ওসমান।” শিরোনামে প্রকাশ হয়েছে। সংবাদ বডির সারাংশে, ২৩ মে খন্দকার খোরশেদ আলমের স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসাতে আইসোলেশনে থাকেন। ৩০ মে আক্রান্ত হয় খোরশেদ। ৩১ মে, খোরশেদের স্ত্রীর অবস্থা জটিল আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নারায়নগঞ্জের নির্বাচিত এমপি শামীম ওসমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তাদের দুজনকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়। প্রতিদিন তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবরও নেন।

এ ব্যাপারে নারায়নগঞ্জ সিটির জনপ্রিয় মেয়র আইভি রহমানের মুঠোফোনে ১ জুন ৪:৫৩ মিনিটে কথা হলে, তিনি বলেন, “আমার প্রত্যেক কমিশনার আন্তরিকতার সাথে কোভিডকালীন সেবা দিচ্ছেন। এর মধ্যে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ব্যতিক্রমী সেবক। তিনি ও তাঁর স্ত্রী অসুস্থ, তাঁদের এবং সারা দেশের কোভিড আক্রান্তদের সুস্থতা কামনা করছি।” সম্প্রতি শেখ হাসিনাও করোনা আক্রান্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর খোঁজ খবর গণভবন থেকে ফোন করে নিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শেখ হাসিনার এই আদর্শ আরো আগেই জাতি লক্ষ্য করেছিলেন। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বাসায় গিয়েছিলেন, শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে। ওই দিন খালেদা জিয়া, তাঁর বাসার গেট বন্ধ রেখে শেখ হাসিনাকে সারা বিশ্বে নন্দিত করে তুলেছেন।

কোভিডকালীন হাজারও অমানবিক সংবাদের মাঝে রাজনৈতিক আদর্শের যে ইতিবাচক পরিবর্তন জাতি দেখছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। কোভিডকালীন প্রধানমন্ত্রী ১৮ টি প্রনোদনা ঘোষণা করেছেন। ১৯ নম্বর প্রনোদনার তথ্য তিনি দিয়েছেন ৩১ মে। ওই দিন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশের কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডসহ ১১ টি শিক্ষাবোর্ডের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল ঘোষণাকালে তিনি বলেছেন, “ব্যাংক থেকে যারা লোন করেছেন, তাদের ‘এপ্রিল-মে’ দুই মাসের সুদের হার ১৬ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। যা করোনাকালীন স্থগিত করা হয়েছে। সেই স্থগিত সুদের মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা, সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করবেন। ফলে আনুপাতিক হারে ব্যাংক ঋণ গ্রহীতাদের আর তা পরিশোধ করতে হবে না।” এই নিয়ে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত মোট ১৯ টি প্রনোদনা প্যাকেজের টাকার পরিমান দাঁড়ালো ১ লক্ষ ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা।

দেশ স্বাধীন হবার পর একমাত্র বঙ্গবন্ধু সরকারই কৃষি ঋণ মওকুফ করে জাতিকে ঋণের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার এমনটা করাই স্বাভাবিক। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এসএসসি ফল প্রকাশ হলেও, করোনা প্রতিরোধে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিচ্ছেন না। কারণ, শিক্ষার্থীদের করোনা ঝুঁকিতে ফেলতে রাজি নন।” অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি পরীক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব সম্ভব না মন্তব্য করে বলেন, “আমাদের পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা বহুগুন বৃদ্ধি করতে হবে এবং এরূপ করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ব্যাপকভাবে থেকে যাবে। কোনভাবেই এই ঝুঁকি এই মুহুর্তে নেওয়া যাবে না বলে আমরা মনে করি। যে কারণে করোনা পরিস্থিতি অনুকুলে না আসা পর্যন্ত, আমরা এইচএসসি পরীক্ষা নিতে পারছি না। যখন আমরা মনে করব পরীক্ষা নেওয়ার মত পরিস্থিতি হয়েছে তখনই অন্ততপক্ষে দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে প্রীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করব।”

দায়িত্ববানদের দায়িত্বশীল বক্তব্য। ১ জুন একটি জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম ছিল, “একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি এখনই জারি হচ্ছে না। ১৫ জুন পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা চলছে, ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল।” আমরা জাতি হিসেবে নন্দলালের অনুসারী নই, সহজেই করোনা দুর হচ্ছে এমনটি ভাবা অনুচিত। মহামারি, দুর্যোগ, করোনার মাঝেই দেশের সকল কাজকর্ম অব্যাহত রাখতে হবে। এজন্য স্থায়ী কৌশল ও বিকল্প রাস্তা আমাদেরই বের করতে হবে।

অজানা শত্রুর কাছে সভ্যতা এভাবে হার মানলে দেশ স্থবির হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কোভিডকালীন পাবলিক পরীক্ষা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, এক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় অন্য প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষক নিয়োগ করে নেওয়া হলে শিক্ষার মান-গুণের যেমন ক্ষয়-ক্ষতি হবে না, তেমনি সার্টিফিকেটের মান মর্যাদাও ক্ষুন্ন হবে না। তবে যথা সময়ে পরীক্ষা না হলে, একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে যে, কর্মজীবনের সময় ক্ষয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। শিক্ষক সমাজের অনেকের মুখেই শুনে আসছি, মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিনা দাবিতে সকল বেসরাকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিতেন। কোভিড দুর্যোগ নাকি বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এগুলো শোনা কথা, ভিত্তি পরে বুঝতে পারব। লেখাটি যখন তৈরি করছিলাম, তখন হাইকোর্টের একজন শুভাকাঙ্খী আইনজীবি বলছিলেন, ‘ভার্চুয়াল কোর্টে জামিনযোগ্য ব্যক্তির জামিন হওয়ায় অসুবিধা নেই, তবে বিচার কার্যে ভার্চুয়াল কোর্ট যৌক্তিক নয়।’ পৃথিবীর সকল প্রাণিই জীবন যুদ্ধে হয় জয়ী, না হয় পরাজয় বরণ করে। যুদ্ধবিহীন কোন সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। করোনাকালীন দুর্যোগ একটি অদৃশ্য আতংকের সাথে গেরিলাযুদ্ধ, এই যুদ্ধে সাবধানতার সাথে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, সবার সাথে সকল ক্ষেত্রে থেকে উন্নয়ন কর্ম সচল রাখাই হোক উন্নয়নশীল দেশের ব্রত।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও নাট্যকার।

পাঠকের মতামত:

০৫ জুলাই ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test