E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

করোনাকালে দেশপ্রেম

২০২০ আগস্ট ০৪ ২১:৫৮:০৮
করোনাকালে দেশপ্রেম

শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ


পুরো বিশ্ব আজ ভয়ঙ্করভাবে বিপর্যস্ত। করোনা নামক প্রাণঘাতী ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে লকডাউন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। এরইমধ্যে হাজার হাজার মানুষের চাকরি চলে গেছে। মধ্য ও নিম্নবিত্তের ঘরে ঘরে চলছে আর্থিক সংকট। করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে বিশ্বে¦র বেশির ভাগ দেশ লকডাউন হয়ে আছে। মানুষ না থাকায় বন্ধ খাবারের দোকানগুলো। ফলে উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকা পথের পশু-পাখি চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে লক-ডাউনের কারণে বেশ কয়েক মাস গরিব মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ ছিল। বিধিনিষেধ শিথিলে সীমিত পরিসরে কাজ চললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্কট কাটেনি। করোনাভাইরাসের সাথে সম্পর্কিত জীবিকার সাথে জড়িত দরিদ্র মানুষের আয়ের ক্ষতি হয়েছে। বেশিরভাগেরই ন্যূনতম সঞ্চয় না থাকায়, আয়ের এ সংকটকালে তাদের খাদ্য গ্রহণ এবং পুষ্টির অবস্থার উপর বাড়তি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ও ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকেই এগিয়ে আসছেন করোনা ভাইরাস বিপর্যয় মোকাবেলায় সাহায্য করার জন্য। দেশপ্রেমিক মানুষ সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা করোনা যুদ্ধে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে পরিস্থিতি মোকাবিলায়। করোনাকালে মানবসেবা ও সংকট পরিত্রাণে ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ সরকারের সহায়ক শক্তি। যারা এই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসছেন, তারা আর্তমানবতার আপনজন। ঠিক এমন সময় দেশের বহু বিত্তবান হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও কিছু মানুষ তাদের সহযোগিতার হাত খোলা রেখেছেন ঠিকই। তাদের উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার নয়। তারা মানবতার সেবায় নীরবে নিভৃতে সাধারণ মানুষদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। প্রাণঘাতি করোনার এ বিপদসংকুল মুহূর্তে মৃত্যুকে ‘পরোয়া’ না করে ভয়কে জয় করে বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে সার্বক্ষণিক থেকে তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ‘করোনা’ জয়ে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে প্রমাণ করলেন এই ব্যক্তিরাই সত্যিকার অর্থে এক-একজন খাঁটি দেশ প্রেমিক।

আমরা দেশের খাই, দেশের পরি। কিন্তু দেশের জন্য আসলে কী করি! আমাদের দেশপ্রেম কি কেবলি লোক দেখানো ব্যাপার? নইলে দেশের ক্ষতি হয়, দেশের মানুষ কষ্টে থাকে এমন কাজ আমরা কী করে করতে পারি। দেশ ও সমাজের ক্রান্তিকালে যারা সেবা দিচ্ছেন তা যেন লোক দেখানো না হয়। এ ক্ষেত্রে সততাই হলো কাজের সফলতার বড় মাপকাঠি। সেবার নামে কিছু অসৎ মানুষ, যারা সংখ্যায় খুবই কম- কিন্তু প্রভাবশালী, তারা পরিস্থিতির সুযোগে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে, ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ছে- তারা নষ্ট মানুষ। খাটের নিচে, খড়ের গাদায়, গোপন স্থান থেকে ত্রাণসামগ্রীর ভান্ডার ধরা পড়েছে অনেক জনপ্রতিনিধির বাড়িতে। ত্রাণ চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ইতোমধ্যে বেশকিছু জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

করোনা-সংকটে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। কোথাও বসেছে ‘মানবতার বাজার'। কোথাও মাত্র এক টাকায় খাদ্যপণ্য কিনতে পারছেন গরিব মানুষ। কোথাও অসহায়দের সহায় হয়েছে ‘মানবতার ঘর’। এছাড়াও অগণিত শুভ উদ্যোগ আমরা করোনকালে প্রত্যক্ষ করেছি যেগুলো সত্যিকার অর্থেই আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে। সকলের বিষয়ে না বললেও কিছু উদ্যোগের কথা উল্লেখ করবার মতো, বাহবা পাবার যোগ্য, অনুসরনীয়ও বটে।

করোনা সংকটের কালে বরিশাল নগরীর দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। তারা নগরীতে বিনামূল্যে খাদ্য ও ওষুধ বিতরণের জন্য ‘মানবতার বাজার' নামে একটি বাজার স্থাপন করেছে। সেখান থেকে মানুষ একদিনের খাদ্যপণ্য নিতে পারেন। বাজারে কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধও রেখেছে তারা। এছাড়া, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সব ধরনের রোগীদের হাসপাতালে নিতে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাসদের এ উদ্যোগে নগরীর নিম্নআয়ের মানুষ খুব খুশি। সামাজের নানা স্তর থেকে মানুষ মানবতার বাজরের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অর্থ সহায়তা করছেন বলে জানান স্থানীয় বাসদ নেতারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ফরদাবাদ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের উদ্যোগে এ বাজার চালু করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস দুর্যোগে এলাকার দরিদ্র মানুষরা ওই বাজারে এক টাকায় শাক-সবজি কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।

সিলেট নগরীর ২৪ নং ওয়ার্ডে হতদরিদ্রদের সহায়তায় নগরীর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটি'র উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে ‘মানবতার ঘর'। যে ঘরের নানা তাকে রাখা আছে চাল, ডাল, তেলসহ নানা খাদ্যপণ্যের প্যাকেট, পাশে ঝুলছে কিছু জামা কাপড়। যার যা প্রয়োজন তিনি এ ঘর থেকে নিয়ে যেতে পারছেন। আবার কেউ সাহায্য করতে চাইলে এই ঘরে নিজের সাধ্যমতো জিনিস রেখে যেতে পারেন। স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে জানা গেছে, নগরীর বিত্তবানরা তাদের উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন।

ক্রিকেটার মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পরপরই অসহায় মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজ জেলা নড়াইল ও ঢাকার মিরপুরের দরিদ্র মানুষদের ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি আরো বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফী তাঁর ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে একটি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠন করেছেন। যারা নড়াইল ও লোহাগড়ার তৃণমূল এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া, নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের প্রবেশ পথে তিনি জীবাণুনাশক একটি চেম্বার স্থাপন করেছেন। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনরা এই চেম্বারে প্রবেশ করে জীবাণুমক্ত হয়ে তারপর হাসপাতালে যান।

করোনাকালীন সংকটে বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ) এর কার্যক্রম প্রশংসার দাবী রাখে। বাংলাদেশের অনগ্রসর রবিদাস জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জীবন মান উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করে সংগঠনটি। রবিদাস জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ পাদুকা ও চামড়া শিল্পের সাথে পেশাগতভাবে যুক্ত। করোনার শুরু থেকে বিআরএফ তার ১১৯ টি শাখার মাধ্যমে সারাদেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি, জীবানুনাশক স্প্রে, সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ এবং ত্রাণ সহায়তা প্রদানে যথাসাধ্য প্রয়াস অব্যহত রেখেছে। সামাজিক সংগঠন বিধায় বিআরএফ এর সাধ্যের জায়গা খুবই সীমিত। তাই সংগঠনটির সাধ আকাশছোঁয়া হলেও সাধ্যের কমতি অনেক। তাই বিআরএফ একটি কমন ফরম্যাটে আবেদন লিখে সারাদেশের শাখা সংগঠনগুলোকে পাঠায়, যার মাধ্যমে স্ব-স্ব এলাকার জনপ্রতিনিধি, সরকারী-বেসরকারী দপ্তর ও স্থানীয় বিত্তবানদের নিকট সহায়তার অনুরোধ জানায়। তাতে লক্ষণীয় ইতিবাচক সাড়া মেলে। এছাড়াও করোনাকালে কৃষকের ধান কেটে দিয়েও সকলের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বিআরএফ। সুসংগঠিত জনশক্তিই যে ইতিহাসের নির্মাতা তা বিআরএফ এর কার্যক্রমেই মূর্তমান হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘নাগরিক উদ্যোগ’ ও এর ভ্রাম্যমান রান্না করা খাবার বিতরণ। এছাড়াও রাষ্ট্রচিন্তার উদ্যোগে অনুরূপ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে ঢাকা মহানগরীরর বিভিন্ন পয়েন্টে। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (বিডিইআরএম) সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে করোনা সচেতনতামূলক লিফলেট, সুরক্ষা সামগ্রী ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যহত রেখেছে। এছাড়াও দেশীয় ও বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন সামাজিক/সাংস্কৃতিক সংগঠন অনুরূপ কার্যক্রম করেছে, করছে। মানুষের পাশে থাকবার মতো মহৎ কার্যক্রমে তাদের সকলের অবদান অনস্বীকার্য।

করোনার হটস্পট নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্ত মৃতদেহ সৎকার করে দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, উপাধি পান 'মানবতার ফেরিওয়ালা'। করোনার সময়ে এই কাউন্সিলরের কার্যক্রমের প্রশংসা দেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব মিডিয়ায়ও উঠে আসে। এ পর্যন্ত খোরশেদ তার গঠন করা ‘টিম খোরশেদ’ প্রায় শ’খানেক লাশ কবরস্থ ও সৎকার করেন। যার মধ্যে বেশ কয়েকজনের শেষকৃত্যের জন্য পরিবার, আত্মীয় স্বজন কিংবা প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি তিনি দান করেছেন নিজের প্লাজমা। গত ২৩ জুন ২০২০ দিবাগত রাতে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে শাহীন আহমেদ নামে এক করোনা রোগীর জন্য প্লাজমা দান করেন তিনি। এছাড়াও তাঁর টিম ৩০ এর অধিক প্লাজমা দান করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ খ্যাত এই মানুষটি আজীবন মানুষের প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেবার শপথ নিয়েছেন।

করোনাভাইরাসের দুর্যোগকালীন সময়ে কর্মহীন, অসহায়, অভুক্ত মানুষের মুখে এক মুঠো অন্ন যোগাতে এগিয়ে আসে তৃতীয় শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রী। তিল তিল করে মাটির ব্যাংকে জমানো অর্থ সে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের ত্রাণ তহবিলে জমা দিয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দুপুরে সেন্ট মাদার তেরেসা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী মুক্তা তার সঞ্চয়কৃত মাটির ব্যাংকের দুই বছরের জমানো টাকা জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিমের হাতে তুলে দেয়।

পিরোজপুরের ডিসি আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেনের কাছে অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা প্রদান করে মিনা শিশু নিকেতনের পাঁচ শিক্ষার্থী (মাশরাফি ইসলাম আরিয়ান, সিনথিয়া ইসলাম, মো. রিজভি হোসেন, মুক্তা আক্তার ও শামীম মিনা)। মাটির ব্যাংকে জমানো ১ হাজার ৪২২ টাকা শিশুরা ডিসির কার্যালয়ে গিয়ে তুলে দেন এই মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন কোমলমতি শিশুরা।

নজিমুদ্দিন। বয়স ৮০ বছর। ভিক্ষা করে সংসার চালান। নিজের বসতঘর মেরামত করার জন্য দুই বছরে ভিক্ষা করে জমিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। কিন্তু এ টাকা দিয়ে তার নিজের ঘর মেরামত না করে দান করলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে কর্মহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষদের খাদ্য সহায়তার জন্য খোলা তহবিলে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২০) দুপুরে তার এই টাকা তিনি ঝিনাইগাতী ইউএনও রুবেল মাহমুদের হাতে তুলে দেন।

এই দুর্যোগে যখন জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণ চুরিতে ব্যস্ত তখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার লতিবপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুর গ্রামের পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী রবিদাস সম্প্রদায়ের মিলন রবিদাস (৩৭)। মূলত মিলন পেশায় একজন পাদুকাশিল্পী (জুতা মেরামতকারী)। জুতা সেলাই করে সংসার চলে তার। কিন্তু তিনি যে মহৎ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী, তা অনেক উচুস্তরের মানুষের থেকেও মহান। দীর্ঘদিন থেকে মিলনের মনের আশা তিনি কোনও দুর্যোগের সময় প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে টাকা দেবেন। এ জন্য ৫ বছর থেকে প্রতিদিন ১০/২০ টাকা করে বাড়িতে জমা করতেন। শেষ পর্যন্ত করোনা সংকটে এ আশা পূরণ হওয়ায় নিজেকে ধন্য মনে করছেন মিলন রবিদাস। মিলন রবিদাসের পর্যাপ্ত টাকা না থাকলেও তার একটাই শান্তনা যে, তিনি এই বিপদের দিনে মানুষের সহায়তায় শরীক তো হতে পারলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণিতেই পড়ালেখার পাঠ চুকে যায় রবিদাসের। প্রায় ২০ বছর আগে মারা যান বাবা মতিলাল। এরপর বাবার পেশাকে আঁকড়ে ধরে সংসারের ঘানি টানতে শুরু করেন মিলন রবিদাস। মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদের পাশে জুতা সেলাইয়ের দোকান দিয়ে বসেন তিনি। যেখান থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে চলে মিলনের সংসার। ছেলে দিগন্ত ১ম শ্রেণিতে ও মেয়ে মনীষা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। নিজের ঘর বানানোর চেয়ে এই টাকা দিয়ে অনাহারি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করলেন এই দরিদ্র পাদুকাশিল্পী। তাই দেশমাতৃকার সেবা করার এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না তিনি। সঞ্চিত সেই ২০ হাজার টাকা জমা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। গত ২৭ এপ্রিল ২০২০ দুপুরে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুন ভূঁইয়ার হাতে ২০ হাজার টাকা তুলে দেন মিলন রবিদাস। মিলন রবিদাসের এই দানের খবর সামাজিক মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, চারদিকে যখন ত্রাণচুরির অভিযোগ, ব্যবসায়ে মানুষকে ঠকানোর অভিযোগের শেষ নেই, তখন এরকম মানবিক হৃদয়বত্তার খবর মানুষকে একটু হলেও স্বস্তি দিচ্ছে, উৎসাহ দিচ্ছে একটি মানবিক সমাজ গড়ার।

মহামারী করোনা ভাইরাস এক নিশ্চিত মারণঅস্ত্রের নাম। পৃথিবীর প্রায় সকল উন্নত রাষ্ট্র ব্যর্থপ্রায় এই রোগ কাটিয়ে উঠতে। সময় আর পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও সক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রকৃতির দরুন দাপটে অসহায়ত্ব বরণ করে নিচ্ছে বিশ্বসভ্যতা। প্রতিজ্ঞা এখন ঘরে থাকার! যুদ্ধ এখন স্থির থাকার!

এই দুর্যোগ যেন আমাদের আরও মানবিক করে তোলে। বারবার প্রকৃতি সভ্যতার পরীক্ষা নেয়। সব পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত মানুষই জয়ী হয়। তাই সভ্যতা এগিয়ে যায়। করোনা পরীক্ষায়ও মানবতারই জয় হবে। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো মূহুর্ত আর একটিও হতে পারে না। বিচ্ছিন্নতা থেকেই সৃষ্টি হোক মানবিকতার ঐক্য। প্রাণঘাতী করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয় হোক সভ্যতার আর বিশ্ব মানবতার।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম (বিআরএফ), কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা।

পাঠকের মতামত:

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test