E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Technomedia Limited
Mobile Version

শেখ রাসেল

২০২১ অক্টোবর ১৭ ১৬:৫৬:১৯
শেখ রাসেল

এম. আব্দুল হাকিম আহমেদ


সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদরের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ই অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে রাত দেড় টায়। শেখ রাসেলের প্রকৃত নাম ছিল শেখ রিসাল উদ্দিন। ডাক নাম রাসেল। তার ছোট বোন শেখ রেহানা তাকে আদর করে ডাকত রাসুমণি বলে। বঙ্গবন্ধু বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাসেলের বই পড়ে এবং বেগম মুজিব রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে, তারা তাদের ছোট সন্তানের নাম বার্ট্রান্ড রাসেলের নামে নামটি রাখেন। অনেক বছর পর মা ফজিলাতুন নেছার কোল আলো করে রাসেলের জন্মে বঙ্গবন্ধু পরিবারে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। শেখ রাসেলের জন্মের সময় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আয়ুব খানের বিরুদ্ধে সর্ব দলীয় ঐক্য পরিষদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। রাতেই টেলিফোনে রাসেলের জন্মের খবর বঙ্গবন্ধু যেন পান সে ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শেখ রাসেলের জন্মক্ষণ সম্পর্কে তার বড় বোন আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা ‘স্মৃতি বড় মধুর স্মৃতি বড় বেদনার’ নামক স্মৃতি চারণ মূলক নিবন্ধে লিখেছেন, “১৯৬৪ সালের অক্টোবরে রাসেলের জন্ম। তখনও বাড়ির দোতলা হয়নি, নিচতলাটি হয়েছে। উত্তর-পূর্ব কোণে আমার ঘরেই রাসেলের জন্ম হয়। মনে আছে আমাদের সে কী উত্তেজনা! আমি, কামাল, জামাল, রেহানা, খোকা কাকা- অপেক্ষা করে আছি। বড় ফুফু, মেজ ফুফু তখন আমাদের বাসায়। আব্বা তখন ব্যস্ত নির্বাচনী প্রচার কাজে। আইয়ুবের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করা হয়েছে সর্বদলীয়ভাবে। বাসায় আমাদের একা ফেলে মা হাসপাতালে যেতে রাজি না। তাছাড়া এখনকার মতো এত ক্লিনিকের ব্যবস্থা তখন ছিল না। এসব ক্ষেত্রে ঘরে থাকারই রেওয়াজ ছিল। ডাক্তার-নার্স সব এসেছে। রেহানা ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট মানুষটি আর কত জাগবে। জামালের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু, তবুও জেগে আছে কষ্ট করে নতুন মানুষের আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। এদিকে ভাই না বোন! ভাইদের চিন্তা আর একটি ভাই হলে তাদের খেলার সাথী বাড়বে, বোন হলে আমাদের লাভ। আমার কথা শুনবে, সুন্দর সুন্দর ফ্রক পরানো যাবে, চুল বাঁধা যাবে, সাজাবো, ফটো তুলব, অনেক রকম করে ফটো তুলব। অনেক কল্পনা মাঝে মাঝে তর্ক, সে সঙ্গে গভীর উদ্বেগ নিয়ে আমরা প্রতি মূহূর্ত কাটাচ্ছি। এর মধ্যে মেঝ ফুফু এসে খবর দিলেন ভাই হয়েছে। সব তর্ক ভুলে গিয়ে আমরা খুশিতে লাফাতে শুরু করলাম। ক্যামেরা নিয়ে ছুটলাম। বড় ফুফু রাসেলকে আমার কোলে তুলে দিলেন। কি নরম তুলতুলে। চুমু খেতে গেলাম, ফুফু বকা দিলেন। মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল, ঘাড় পর্যন্ত একদম ভিজা। আমি ওড়না নিয়ে ওর চুল মুছতে শুরু করলাম। কামাল, জামাল সবাই ওকে ঘিরে দারুণ হইচই।”

পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে রাসেল সবার ছোট। পরিবারের সব আনন্দ রাসেলকে ঘিরে। বড় ভাই বোনদের আদর সোহাগে রাসেল সোনা বড় হতে থাকে। জন্মের প্রথম দিন থেকে রাসেলের ছবি তুলা শুরু হয়। সব ভাই বোন মিলে ওর জন্য আলাদা একটা অ্যালবাম করেছিলেন। রাসেলের জন্মের দিন, প্রতিমাস, প্রতি তিন মাস, ছয় মাস অন্তর ছবি অ্যালবামে সাজানো হতো। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু ভবন থেকে অন্যসব জিনিসপত্রের সাথে অ্যালবামটা লুট করে নিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অতি যত্নে তোলা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবার আদরের ছোট্ট রাসেলের অনেক দুর্লভ ছবি। রাসেল তার বড় বোনকে ‘হাসুপা’ বলে ডাকত। বড় দুই ভাই কামাল ও জামালকে ‘ভাই’ বলতো আর ছোট বোন রেহানাকে ‘আপু’ বলত। রাসেল যখন কেবল হাটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, বঙ্গবন্ধু তখন ৬ দফা দিলেন, তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল তার পিতা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজত।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে অনেক কবুতরের ঘর ছিল। সেখানে অনেক কবুতর থাকত। রাসেল খুব ভোরে মায়ের সাথে ঘুম থেকে উঠে নিচে যেত, মায়ের সাথে নিজের হাতে কবুতরের খাবার দিত, কবুতরের পিছন পিছন ছুটত। কবুতরের প্রতি রাসেলের ছিল আলাদা রকম মায়া মমতা। রাসেলকে কবুতর দিলে কখনও খেতনা। ছোট্ট বাচ্চা রাসেল কীভাবে যে টের পেত তা কে জানে। শত চেষ্টা করেও কেউ কোন দিন রাসেলকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে প্রতি ১৫ দিন পর পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বেগম মুজিব সন্তানদের সবাইকে নিয়ে দেখতে যেতেন। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুব কান্নাকাটি করত। রাসেলকে বোঝানো হতো, “তার আব্বার বাসা জেল খানা তারা সেখানে আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছে।” বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হত। বাসায় ফিরে রাসেল তার আব্বার জন্য কান্না কাটি করলে মা বেগম মুজিব তাকে বোঝাতেন এবং তাকে (মাকে) আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। রাসেল মাকে আব্বা বলে ডাকত।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও শেখ রাসেলের প্রতি ছিল অপরিসীম পিতৃস্নেহ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কারাগারের দিন পুঞ্জি ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামক গ্রন্থে অনেক জায়গায় তার কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন। উল্লেখিত গ্রন্থে ২৪৯ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘৮ই ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, “আব্বা বালি চলো”। কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, “তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।” ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’ ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে অন্যত্র (পৃষ্ঠা নং-২৩৪) বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের উপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই এদিক ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বলল, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কি করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, ‘তুমি রেহানাকে মার?’ রাসেল বলল, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিল, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।’

ছোট রাসেল পিড়িতে বসে বাসায় কাজের লোকদের সাথে ভাত খেতে খুব পছন্দ করত। বঙ্গবন্ধু ভবনে একটা পোষা কুকুর ছিল, নাম ছিল টমি। শেখ রাসেলের সাথে টমির খুব বন্ধুত্ব ছিল। রাসেল টমিকে নিয়ে খেলত। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে উঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে ছোট আপু শেখ রেহানার কাছে এসে বলে, ‘টমি বকা দিচ্ছে।’ টমি তাকে বকা দিয়েছে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। কারন সে টমিকে খুব ভালবাসতো। নিজের পছন্দ মতো খাবার গুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে তার কাছে কষ্টতো লাগবেই। ছোট্ট রাসেলের ছিল পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, কাছে পাওয়া, কাছে থাকার সান্নিধ্যের টান। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় টানা তিন বছর কারাভোগের পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুথানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন মুক্তি পান, তখন ছোট্ট রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তখন তার বাসায় নিচ তলায় অফিস করতেন, শেখ রাসেল সারাদিন নিচে খেলা করত; আর একটু পরপর তার আব্বাকে দেখতে যেত। রাসেল মনে মনে বোধ হয় ভয় পেতেন যে, ‘তাঁর আব্বাকে বুঝি আবারও হারিয়ে ফেলে।’ ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে ২৬ শে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাক হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করলে বেগম মুজিব শেখ রাসেল ও শেখ জামালকে নিয়ে পাশের বাড়ি আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন পাক হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটা একতলা বাড়িতে আটক থাকেন। বন্দি অবস্থায় ছোট্ট রাসেল তার আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। যুদ্ধের মধ্যে বন্দি অবস্থায় বড় বোন হাসুপার ছেলে জয়ের জন্ম হলে রাসেল যেন একটু আনন্দ পায়। সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকত। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় ভারতীয় যুদ্ধ বিমান উড়া শুরু হলে বিমানের আওয়াজ শুনে রাসেল জয়ের কানে তুলা গুজে দিত। আবার নিজের কানেও নিত। সব সময় তার পকেটে তুলা থাকত।

১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বন্দি বেগম মুজিব সহ পরিবারের অন্যান্যরা সবাই ভারতীয় মিত্র বাহিনীর মেজর তারার সহযোগিতায় মুক্ত হন ১৭ই ডিসেম্বর। সে দিন রাসেলই তাদের পতাকা হাতে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। মুক্ত হওয়ার পরপরই রাসেল মাথায় একটা হেলমেট পরে নিল। সাথে সমবয়সী টিটো নামে তাদের এক নিকট আত্মীয়ের ছেলেও পরল একটা। দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধযুদ্ধ খেলা শুরু করলো।

ছোট্ট রাসেলের সবচেয়ে আনন্দের দিন ছিল ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী যে দিন বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এলেন। সে ক্ষনিকের জন্যও তার আব্বাকে হাতছাড়া করতে চাইত না। সব সময় রাসেল তার আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াতো। বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন সকালে গনভবনে আসতেন অফিস করতেন। দুপুরে গন ভবনেই খাওয়া দাওয়ার পর বিশ্রাম নিতেন। বিকেলে হাটতেন। রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে যেত, তার প্রিয় সাইকেলটাও সঙ্গে নিত। সাইকেল চালানো তার খুব প্রিয় ছিল। রাসেলের মাছ ধরা খুব পছন্দ ছিল। রাসেল মাছ ধরার পর আবার ছেড়ে দিতো।

টুঙ্গিপাড়ায় রাসেলের ক্ষুদে বাহিনী ছিলো। রাসেলের ক্ষুদে বাহিনীর জন্য ঢাকা থেকে জামা কাপড় কিনে দিতে হতো। রাসেল ক্ষুদে বাহিনী সদস্যদের বাড়ির উঠানে প্যারেড করাত। তার একমাত্র চাচা শেখ নাসের রাসেলকে ১ টাকার নোটের বান্ডিল দিলে, রাসেল ক্ষুদে বাহিনীর সদস্যদের লজেন্স বিস্কুট কিনে খেতে দিত এই টাকা থেকে। রাসেলের খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই এই ইচ্ছা। রাসেল তার পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ছায়ার মত অনুস্মরণ করত। সে তার আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইত না। বঙ্গবন্ধু রাসেলকে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ওকে নিয়ে যেতেন। বেগম মুজিব ছোট ছেলে শেখ রাসেলের জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ বঙ্গবন্ধু প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও সেদিন পরত।

দেশ স্বাধীনের পর আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থনকারী জাপান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে জাপান সফরের আমন্ত্রন জানায়, বিশেষ করে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেল ও রেহানা কে নিয়ে জাপান যান। ছোট্ট সোনা রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচীও রাখে জাপানী সরকার। প্রতিবেশি আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং ফুফাতো ভাই আরিফ সেরনিয়াবাত ছিল রাসেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাইকেল চালানো তার প্রিয় ছিল। তবে সে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলাও পছন্দ করত। বাড়ির প্রাঙ্গন, বাড়ির সামনের রাস্তা, লেকের ধার ও ফুফুদের বাসা ছিল তার বিচরণ ভূমি। সে গল্প শুনতো বড়দের কাছে। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মিত্র মাতা ইন্দিরা গান্ধি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে বেড়াতে এলে মা-বাবার সঙ্গে বিমান বন্দরে শুভেচ্ছা জানিয়ে ছিল শেখ রাসেল। বাই সাইকেলের পাশাপাশি রাসেলের একটা ছোট ‘মপেট’ মটর সাইকেল ছিল। একদিন ‘মপেট’ চালানোর সময় পড়ে গিয়ে ওর পা সাইকেলের পাইপে আটকে যায় এবং পায়ের অনেক খানি যায়গা পুড়ে যায়। বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য রাশিয়া গেলে রাসেলকেও সঙ্গে নিয়ে যান। সেখানে রাসেলের পায়ের চিকিৎসা করানো হয়। সে পিতার সঙ্গে যুক্তরাজ্যও সফর করে।

রাসেল ১৯৭৫ সালে বড় ভাই কামাল, মেজ ভাই জামালের বিয়েতে অনেক মজা করে। বিশেষ করে গায়ে হলুদের দিন ওর সমবয়সীদের সাথে মিলে রং খেলে। বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের পাশে পাশেই থাকে। সব সময় ভাবীদের খেয়াল রাখতো কার কি লাগবে। রাসেল জয় ও পুতুলকে নিয়ে খুব মজা করে খেলতো। ১৯৭৫ সালের ৩০ শে জুলাই যখন বড় বোন শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে জার্মানিতে যান তখন রাসেল খুব মন খারাপ করেছিল। বড় বোন শেখ হাসিনা রাসেলকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু হঠাৎ রাসেলের জন্ডিস হয়ে শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা বেগম মুজিব বড় বোনের সাথে রাসেলকে জার্মানিতে যেতে দেন না। রাসেল যদি সেদিন বোনদের সাথে জার্মানিতে যেতেন তাহলে ওকে আর ঘাতকের বুলেটের নির্মম আঘাতে হারাতে হত না।

¯েœহের আদরের ছোট ভাই শেখ রাসেলের প্রতি বোন শেখ রেহানার ছিল অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা। ১৯৭৫ সালের ৩০ শে জুলাই বড় বোন শেখ হাসিনার সাথে জার্মানিতে যাওয়ার সময় বিমান বন্দরে বিমানে উঠার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত শেখ রাসেল শেখ রেহানাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। শেখ রেহানার প্রিয় আদরের ছোট ভাই রাসেল, যার সাথে সারাদিন খুনসুটি চলত, একটা সাইকেল নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকত, সেই রাসেলের মুখ শেখ রেহানাকে বারবার টানে। জার্মানিতে যেয়ে শেখ রেহানা তার অতি আদরের রাসেলকে চিঠি লিখেন।

০৩.০৮.১৯৭৫ ট্রিবার্গ

“রাসুমণি

আজকে আমরাTriberg গিয়েছিলাম। এটা জার্মানির সবচেয়ে বড় ঝরনা। অনেক উপরে উঠেছিলাম। এদের ভাষায় বলে Wasserfalle। আজকে ব্লাক ফরেস্ট গিয়েছিলাম। ...পড়াশুনা করো। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমত করবে। মা’র কথা শুনবে। তোমার জন্য খেলনা কিনব। লন্ডনের চেয়ে এখানে অনেক দাম। ছোট্ট ছোট্ট গাড়িগুলো প্রায় দুই পাউন্ড দাম। তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া ও পড়াশুনা করো।

ইতি রেহানা আপা।”

১৯৭৫ সালে শেখ রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। রাসেল মাত্র ১০ বছর ৯ মাস ২৮ দিন বেঁচে ছিল। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে তার বয়স হত ৫৭ বছর। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালী জাতিসহ বিশ্ব বিবেক উপলদ্ধি করল মানবতার কি পরাজয়। শোকাবহ এই দিনে পৃথিবীর সমস্ত মানব সভ্যতাকে হার মানিয়ে সংঘঠিত হয়েছিল ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ড। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ও তাদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের ষড়যন্ত্রে কতিপয় ক্ষমতা লোভী বিশৃংখল সেনা অফিসার খুনি মোশতাক-জিয়াউর রহমান গংদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়, নির্দেশনায়, পরিচালনায়, আশ্রয়-প্রশ্রয়, সমর্থনে, পরামর্শে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালো রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে খুনি সর্দার কর্ণেল ফারুক-রশিদের নেতৃত্বে নির্মমভাবে হত্যা করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, ২য় পুত্র শেখ জামাল, বঙ্গবন্ধু কনিষ্ঠ পুত্র আদরের শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভ্রাতা শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্র বধু সুলতানা কামাল, পারভীন জামাল রোজী, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহম্মেদ, পুলিশের এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহাবুবুল হক। ঘাতকেরা মন্ত্রী পাড়ায় মিন্টু রোডে হামলা করে হত্যাকরে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নীপতি ও মন্ত্রীসভার সদস্য আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাতের কিশোরী কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত, শেখ রাসেলের খেলার সাথী শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, শিশু পৌত্র সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষপুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই আব্দুল নইম খান রিন্টু। ধানমন্ডির অন্য একটি বাড়িতে ঘাতকেরা হামলা করে হত্যাকরে বঙ্গবন্ধুর অতিস্নেহের পুত্রতুল্য ভাগ্নে ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনি, শেখ মনির সন্তান সম্ভবা স্ত্রী বেগম আরজু মনিকে। ১৫ই আগস্টের ঘাতককের গোলায় নিহত হন মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী রোডের বস্তিঘরের ঘুমন্তবস্থায় নিরীহ রিজিয়া বেগম, রাশেদা বেগম, সাবেরা বেগম, আনোয়ারা বেগম, আনোয়ারা বেগম-২, সয়ফুল বিবি, হাবিবুর রহমান, আবদুল্লা, রফিকুল, শাহাবুদ্দিন, আমিনুদ্দিন ও শিশু নাসিমা। আগস্ট বড় দুঃখ বেদনার মাস, স্বজন হারানোর মাস। ১৫ই আগস্ট বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষ ও বিশ্বের বিবেকবান মানুষ চোখের অশ্রু ঝরায়। আগস্ট এলে আমাদের চোখে ভেসে উঠে শেখ রাসেল, সুকান্ত বাবু, বেবী, আরিফ, রিন্টু, মোহম্মদপুরের বস্তি ঘরের নাসিমার কচি কোমল মুখ। আগস্টের এই শিশু কিশোর হত্যা গোটা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। এ যেন কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনাকেও হার মানিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে নিহতের তালিকায় অন্তঃসত্তা বা নব বিবাহিতা তরুনী অথবা দুগ্ধ পোষ্য শিশুরা ছিল না, যেমন ছিল পঁচাত্তরের আগস্ট হত্যাকান্ডের নিহতদের মধ্যে। শেখ রাসেল একটি আবেগ প্রবন সত্তা, শিশু অধিকার রক্ষার মূর্ত প্রতীক। ১৫ই আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে ঘাতকদের অভিযানের শেষ শিকার ছিল শিশু রাসেল।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট মানব সভ্যতার বীভৎস, পৈশাচিক নির্মম হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন আবাসিক পি এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মামলার বাদি প্রয়াত আ.ফ.ম. মহিতুল ইসলাম সরকারী কাজে ঝিনাইদহ সার্কিট হাউসে অবস্থান কালে আমরা আওয়ামী লীগের তরুন কর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাত করে ১৫ই আগস্ট লৌহমর্ষক বঙ্গবন্ধু সহ তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও স্বজনদের হত্যাকান্ডের কাহিনী শুনেছিলাম এবং আমি লিপিবদ্ধ করেছিলাম। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে মহিতুল ইসলাম বারবার অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন, আমরাও অঝরে কেঁদেছিলাম। সেখান থেকে কিছু অংশ উদ্বৃত করলাম, “ঘাতক মেজর নুর, মেজর মহিউদ্দিন (ল্যান্সার), ক্যাপ্টেন বজলুর হুদা বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামালকে হত্যা করে নিচে নেমে এসে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এর পরপরই মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন তাদের সৈন্যসহ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসে। আজিজ পাশা তার সৈন্যদের নিয়ে দোতলায় চলে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা দরজায় গুলি করে। তখন বেগম মুজিব দরজা খুলে দেয় এবং ঘরের মধ্যে যারা আছে তাদের না মারার জন্য অনুরোধ করেন। ঘাতকরা বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিয়ে আসতে থাকে। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেই বেগম মুজিব কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’ বেগম মুজিব নিচে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ঘাতকরা শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে যায়। আর বেগম মুজিবকে তার ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বেগম মুজিবসহ বঙ্গবন্ধুর ঘরে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া শেখ জামাল, সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন। বেগম মুজিবের নিথর দেহটি ঘরের দরজায় পড়ে থাকে। বাঁদিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। রোজী জামালের মুখে গুলি লাগে। আর রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামালের মুখ। শেখ নাসের, শেখ রাসেল আর রমাকে নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের সবাইকে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এ সময় শেখ নাসের ঘাতকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না। কোনোরকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে খাই।’ এরপর তারা শেখ নাসেরকে বলে, ‘ঠিক আছে, আপনাকে কিছু বলব না। আপনি ওই ঘরে গিয়ে বসেন।’ এই বলে তাকে অফিসের সঙ্গে লাগোয়া বাথরুমে নিয়ে গুলি করে। এরপর শেখ নাসের ‘পানি, পানি’ বলে গোঙাতে থাকেন। তখন শেখ নাসেরের ওপর আরেকবার গুলিবর্ষণ করা হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে শেখ রাসেল প্রথমে রমাকে ও পরে মহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?’ মহিতুল জবাব দেন, ‘না ভাইয়া, তোমাকে মারবে না।’ এ সময় শেখ রাসেল তাঁর মায়ের কাছে যেতে চাইলে আজিজ পাশা মহিতুলের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে যায়। এ সম্পর্কে মহিতুল বলেন, রাসেলকে ঘাতকরা কেড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় সে চিৎকার করে কান্নাকাটি করছিল। এরপর তাকে নিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। ঘাতক আজিজ পাশার কথামতো এক হাবিলদার সভ্যতার সব বিধি লঙ্ঘন করে এই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। গুলিতে রাসেলের চোখ বের হয়ে যায়। আর মাথার পেছনের অংশ থেঁতলে যায়। রাসেলের দেহটি পড়ে থাকে সুলতানা কামালের পাশে। পুরো ঘরের মেঝেতে মোটা রক্তের আস্তর পড়ে গিয়েছিল। এর মাঝেই ঘাতকের দল লুটপাট চালায়। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন তার দুই মেয়ে ছিলেন না। বড়ো মেয়ে শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে স্বামী বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান।”

শেখ রাসেলের বাঁচার অধিকারকে হত্যাকারীরা অভয় দিয়েও রক্ষা করেনি। বেঁচে থাকার সে কি অশেষ ইচ্ছে। বাড়ির প্রায় সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাকে মারা হবে না এই অভয় দিয়ে নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। সে সময়ই রাসেল বাঁচার জন্য কাকুতি মিনতি করেছিল। কিন্তু খুনিরা তার পরিচয় নিশ্চিত জেনেই ওপরে নিয়ে হত্যা করে। একারণেই রাসেল ও আগস্টে নিহত শিশুদের হত্যার বিষয়টি সমগ্র বাঙালীর কাছে আবেগের শোকাহত উপলদ্ধি। ঘাতকদের কাছে মানবিক গুন, মানবতা ও জাতিসংঘের শিশু সনদ এবং জাতীয় শিশু নীতিমালা অতি তুচ্ছ। এরা মানুষ নামে নরপশু, নর ঘাতক ও নরপাষন্ড।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কালো রাতে শিশু রাসেলকে সেদিন যারা হত্যা করেছিল তারা কিন্তু ব্যাপারটি হঠাৎ করে ঘটায়নি। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সুচিন্তিত ভাবে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বশেষ রক্তের ধারা শেষ চিহ্নটি নিধন করার জন্যই ঘাতকেরা এই নির্মম হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছিল। শিশু রাসেলকে ঘাতকেরা হত্যা করেছিল এই ভেবে যে, বাংলাদেশ যেন কোন অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো জীবিত প্রাণীকে প্রতীক হিসেবে না পায়। মহান রাব্বুল আল-আমিনের অশেষ কৃপায় সৌভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন, আর রক্ষা পেয়েছিলেন বলেই আজ মানব সভ্যতার জঘন্যতম বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের হত্যাকান্ডের সব তথ্য এক এক করে বেরিয়ে আসার সুযোগ হয়েছে। আজ সেই খুনিদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়েছে। অনেকের বিচারও হয়েছে সময়ের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। অমোঘ নিয়মে উদ্ঘাটিত হচ্ছে পঁচাত্তরের সেই ষড়যন্ত্রের জাল-আর ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে রক্ত মাখা সময়ের ঘটনাবলী। আমরা চাই মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত ঘাতকদের যারা বাকী আছে তাদের গ্রেফতার করে ফাঁসির রায় কার্যকর করে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্নাঙ্গ রায় বাস্তবায়ন হোক। এর বাইরে আমাদের আরও একটি চাওয়া আছে, পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট হত্যাকান্ডের প্রধান নেপত্যের নায়ক, প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, প্রধান ক্রীড়নক, প্রধান হত্যাকারী, প্রধান বেনিফিসিয়ারী, খুনি চক্রের প্রধান পরামর্শ দাতা, খুনী চক্রের প্রধান আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা ও খুনিচক্রের প্রধান রক্ষক জিয়াউর রহমান, বাংলার দ্বিতীয় মীর জাফর খোন্দকার মোশতাক, খুনি চক্রের অন্যতম রক্ষক ও বেনিফিশিয়ারী যথাক্রমে বিচারপতি সায়েম, বিচারপতি সাত্তার, স্বৈরশাষক এরশাদ, খালেদা জিয়া, চাষী মাহাবুল আলম, মওদুদ সহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে যে সমস্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে জড়িত ছিলো, যারা কুপরিকল্পিতভাবে দেশ স্বাধীনের পর আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে, দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিল, যারা আইন করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারী করে ও পরে সংসদ বিল পাশ করে বঙ্গবন্ধুর আত্ম স্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ করেছিল, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ, বিলম্বিত, প্রলম্বিত করেছিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের শুনানীতে যে সমস্ত বিচারপতি বিব্রত বোধ করেছিল একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে তাদের চিহ্নিত করে মুখোশ উম্মোচন করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।

শেখ রাসেল বিশ্বের অধিকারহারা, নির্যাতিত, নিপীড়িত শিশুদের প্রতীক ও প্রতিনিধি। যখনই অবোধ শিশু-বলি দেখি, তখনই রাসেলের কচি মুখখানা ভেসে ওঠে। মানুষরূপী রক্তখেকো হায়েনাদের হাত কাঁপেনি ১৫ই আগস্টে নিরাপরাধ শিশু রাসেলকে হত্যা করতে। শেখ রাসেলকে নিয়ে ‘শেখ রাসেল এক ফুলকুঁড়ি’ নামক একটি টেলিফিল্ম তৈরি করা হয়েছে। এটির কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেন বিটিভি’র প্রাক্তন উপ-মহাপরিচালক বাহার উদ্দিন খেলন। এতে রাসেলের কিশোর চরিত্রে অভিনয় করে শিশুশিল্পী আরিয়ান। এ টেলিফিল্মটি প্রযোজনা করেন মাহফুজার রহমান। ফিল্মটি নির্মাণে বিষয়বস্তু সংগ্রহ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং মিজানুর রহমান মিজান রচিত গ্রন্থ থেকে। এটি হৃদয় বিদারক জীবনভিত্তিক ছায়াচিত্র, যা বাঙালি ও বাংলাদেশের শিশুর কান্না ঝরায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানব সভ্যতার নিকৃষ্টতম শিশু হত্যার অমানবিক হৃদয় বিদারক দৃশ্যপট শেখ রাসেলের নারকীয় হত্যাকান্ড ও মৃত্যুর আগ মুহূর্তে নিষ্পাপ রাসেলের আর্তি- ‘আমাকে মারবে না তো ভাইয়া’ বুকের মাঝে শোকের নদী বইয়ে দেয়। পৈশাচিক খুনিদের নিকট শেখ রাসেলের বেঁচে থাকার আকুতি কতই না মানবিক আবেগের। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে যখন এ নারকীয় তান্ডব চলছিল, তখন ১০ বছর ৯ মাস ২৮ দিনের একটি শিশু থরথর করে ভয়ে কাঁপছিল। তাঁর নাম শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য। ঘাতকেরা ভয়ংকর আক্রোশে স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে বঙ্গবন্ধুর বিশাল মাপের বুকটা ঝাঁঝরা করে দেয়। এ বীভৎস চিত্র দেখে ছোট্ট শিশু রাসেল বুক চাপড়িয়ে আহাজারিরত মায়ের ক্রন্দনে হতবিহবল বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে খুনিরা তার সামনেই তার প্রিয় মাকে হত্যা করে। নিজের চোখের সামনে বাবা-মায়ের স্টেনগানের ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা মুখ ছোট শিশুটির মনে কি ধরনের রেখাপাত করেছিল তা ভাববার বিষয়। বাপ-মা হারা শিশুটিকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন পুলিশ অফিসার অনেক অনুনয় করেছিল। বিনিময়ে তারও ভাগ্যে জুটেছিল ব্রাশ ফায়ার। মাকে হারিয়ে মায়ের ক্ষতবিক্ষত শরীরের ওপর লুটিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল রাসেল। ঘাতক শকুনের দল তাঁকে টেনে হিঁচড়ে মা’র কাছ থেকে আলাদা করলে রাসেলের মুখে করুণ আকুতি ঝড়ে পড়ল, ‘আমাকে মেরো না, আমি কোনো অন্যায় করি নি। আমাকে হাসুপা’র কাছে পাঠিয়ে দাও।’ কিন্তু ঘাতকের কর্ণকুহরে জাতির পিতার এ মাসুম শিশুটির আবেদন পৌঁছালো না। কারণ তারাতো মানুষ ছিল না- ছিল পিশাচ। এরপর রাসেল এক দৌড়ে বড় ভাবি সুলতানা কামালের কাছে আশ্রয় নেয়। সুলতানার পাশে ছিলেন ছোট ভাবি রোজী। তাঁরা দু’জনই মাসুম শিশুটির বুকে আগলে রেখে তাকে রক্ষার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালান। কিন্তু ঘাতকেরা কাউকেই ছাড়বে না। এক এক করে সবাইকে সরিয়ে দেবে এ পৃথিবী থেকে। তার পরক্ষণেই তারা বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূকে একত্রে হত্যা করে। একের পর এক মৃত্যুর মিছিল আর বিভীষিকায় হতবিহ্বল রাসেল এবার ঠাঁই খুঁজে বেড়ায় বাড়ির কাজের লোকজনের কাছে। বাড়ির লোকজনকে জড়িয়ে কান্নারত রাসেলকে টেনে অন্যত্র নিয়ে যায় মেজর আজিজ পাশা। ঘাতকেরা অবুঝ শিশু রাসেলকে এত বেশি ভয় পাচ্ছিল, যদি না শিশুটি কোনোরকম প্রাণে বেঁচে যায় তাহলে তো তাদের সাত-পুরুষের ভিটেয় ঘুঘু চড়বে। তাই তারা মরিয়া হয়ে উঠে বাংলাদেশের ভাবীকালের শিশু নিধনে। তারা এ কচি প্রাণটার ওপর একটা, দুইটা নয়, বেশ কয়টা গুলি চালায়। মুহূর্তে ১০ বছর ৯ মাস ২৮ দিনের নিষ্পাপ শিশু রাসেল নিরব নিথর হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কি দোষ ছিল এ মাসুম শিশুটির? কি দোষ ছিল বাংলার বুকে তার জন্মদাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের? একটি স্বাধীন ভূখন্ড, একটি লাল-সবুজের পতাকা, একটি আলাদা জাতিস্বত্ত্বা, একটি জাতীয় সংগীত ও সর্বোপরি একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার পুরস্কার কি এই বুলেট? আমাদের বড় প্রয়োজন এসব নিয়ে গবেষণার, আজকের প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে যতই বিচার-বিশ্লেষণ করবে তাতে করে খুব সহজে স্বাধীনতার আসল শত্রুর মুখোশ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনাকারীগণ, খুনি চক্রের রক্ষক ও বেনিফিশিয়ারীদের পরিচয় এবং তাদের ভূমিকা আমাদের চোখের সামনে স্বচ্ছ আয়নার মতো প্রতিভাত হবে। শেখ রাসেল নিষ্পাপ, নির্মল একটি শিশুর নাম, শেখ রাসেল অধিকারহারা শিশুদের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে আমাদের মাঝে। বঙ্গবন্ধুর আদরের কনিষ্ঠ পুত্র শিশু রাসেল ১৫ই আগস্ট বাঙালী জাতির নিরন্তর রক্তক্ষরণের আরও একটি নাম।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ।

পাঠকের মতামত:

২১ জানুয়ারি ২০২২

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test