E Paper Of Daily Bangla 71
World Vision
Walton New
Mobile Version

সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে জাদুঘরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

২০২৪ মে ১৭ ১৬:৪৯:৫৯
সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে জাদুঘরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ


১৮ মে শনিবার আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২৪। প্রতিবছর, আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের জন্য একটি থিম নির্বাচন করা হয়। এবারের থিম ‘শিক্ষা ও গবেষণার জন্য জাদুঘর’। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়ামের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মতে, এই বছরের থিম “শিক্ষা, আবিষ্কার এবং সাংস্কৃতিক বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে গতিশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে জাদুঘরের তাত্পর্যকে আন্ডারস্কোর করা।” পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যতো ইতিহাস জমা হচ্ছে তারই প্রতিচ্ছবি হলো জাদুঘর। জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মিউজয়ন থেকে, যার অর্থ কাব্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হলো, যে গৃহে আদ্ভুত পদার্থসমূহ সংরক্ষিত আছে এবং যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়। তাই বরাবরের মতো দিনটিতে জাদুঘরের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়— যাতে ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নাগরিকরা তার আপন ঐতিহ্য সম্পর্কে ভাবতে শেখেন। জাদুঘর এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। এতে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয় এবং তা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। আর পৃথিবীতে একটি টেকসই, নির্মল, সবুজ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ আবাসস্থল বিনির্মাণে জাদুঘর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি জাদুঘর নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান দ্বারা দর্শকদের গ্যালারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে থাকে। নিয়মিত দর্শক/বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পথশিশু থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি ভিআইপি ইত্যাদি পর্যায়ে নিয়মিত গাইড সেবা প্রদান করে থাকে।

এ ছাড়াও নানা দিবসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। এর মধ্যে দিয়ে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে জাদুঘর অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। এ ছাড়া গবেষকদের জাদুঘরের নিদর্শন নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীদের জাদুঘরের ওপর বিশেষ ফিচার ও প্রতিবেদন তৈরি ও জাদুঘরের ওপর জাদুঘরের কর্মীদের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নিয়ে সরাসরি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা ইত্যাদি কাজে সহযোগিতা করছে।আর বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের যুগে মোবাইল গেম, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি ব্যবহারে সারা বিশ্বের মতো এ দেশের শিশু–বয়স্ক সবাই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর এই বিচ্ছিন্নতা রোধে ভূমিকা পালন করতে পারে জাদুঘর। কেননা জাদুঘরগুলো সব শ্রেণির দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত এবং বিনোদনের পাশাপাশি প্রায়োগিক ও বাস্তবিক জ্ঞান বিতরণ করে থাকে।

ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামসের আহ্বানে ১৯৭৭ সালে প্রথম বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইসিওএম)। এর সদস্য হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৮০টি দেশের ২৮ হাজার জাদুঘর যুক্ত রয়েছে।

জানা গেছে, এ উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। ভারতীয় এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যরা এ অঞ্চলের জাতিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূ-তাত্ত্বিক এবং প্রাণী বিষয়ক নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন— তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে জমির ব্যবস্থা করেন। ১৮০৮ সালে সেখানে জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ শেষ হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১৮১৪ সালে উপমহাদেশের প্রথম জাদুঘর ‘এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম’-এর জন্ম ও প্রতিষ্ঠা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯১০ সালের এপ্রিলে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় শরৎকুমার রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। এটি নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ সালে। বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর আছে। তবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরই দেশের প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর

ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। চারতলা বিশিষ্ট ভবনটির স্থাপত্য নকশা অত্যন্ত নজরকাড়া। ২০ হাজার বর্গমিটারের ভবনটির ৪৫টি গ্যালারিতে রয়েছে প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি নিদর্শন। কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ জাদুঘর।

জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণটি নানান রকম গাছে সুসজ্জিত। ভবনের প্রবেশ দ্বারের দু’পাশে রয়েছে ঐতিহাসিক দুটি কামান। ৪ তলা বিশিষ্ট ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে নান্দনিক নভেরা ভাস্কর্য। এই ভবনের প্রথম তলায় অফিস, হল রুম। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ঐতিহাসিক সকল নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে যা প্রদর্শনীর জন্য উন্মুক্ত। দ্বিতীয় তলায় গেলে দর্শনার্থীরা সামগ্রিক বাংলাদেশ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র, গাছপালা, জীবজন্তু, উপজাতি জনজীবন, শিলা, খনিজ, সুন্দরবন ও অতীত সময়ের বিভিন্ন মুদ্রা ও স্থাপত্য।

তৃতীয় তলায় সজ্জিত আছে অস্ত্রশস্ত্র, চীনামাটির শিল্পকর্ম, পুতুল ও বাদ্যযন্ত্র, বস্ত্র ও পোশাক-পরিচ্ছদ, নকশি কাঁথা, পাণ্ডুলিপি, সমকালীন শিল্প ও আবহমান বাংলাদেশের নানান উপকরণ। চতুর্থ তলায় সজ্জিত আছে বিশ্ব মনীষীদের প্রতিকৃতি, বিশ্ব শিল্পকলা, বিশ্ব সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের রয়েছে আনুমানিক ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বইসংবলিত নিজস্ব গ্রন্থাগার। গবেষণার কাজে এই গ্রন্থাগার বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর বরেন্দ্র জাদুঘর ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বরেন্দ্র জাদুঘরে প্রায় ৯ হাজার পূরাকীর্তি রয়েছে। রাজধানী ঢাকা শহর, বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলায় জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে জাদুঘরের সংখ্যা শতাধিক। আমাদের দেশেও বিভিন্ন ক্যাটাগরির জাদুঘর রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর (ঢাকা), মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর (ঢাকা), বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর (ঢাকা), স্বাধীনতা জাদুঘর (ঢাকা), আহসান মঞ্জিল জাদুঘর (ঢাকা), বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা জাদুঘর (ঢাকা), সামরিক জাদুঘর (ঢাকা), প্রাণী জাদুঘর (ঢাকা) দিয়াশলাই জাদুঘর (ঢাকা), বরেন্দ্র জাদুঘর (রাজশাহী), জাতি তাত্ত্বিক জাদুঘর (চট্টগ্রাম), পানি জাদুঘর (কুয়াকাটা), পাথর জাদুঘর (পঞ্চগড়), নৌকা জাদুঘর (লৌহজং), পাইকগাছা জাদুঘর (পাইকগাছা)। ভিন্ন ভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণে জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হলেও এসব জাদুঘরের লক্ষ অভিন্ন।

অতিত ও বর্তমানের সেতুবন্ধন হচ্ছে জাদুঘর। জাদুঘর দেশের গৌরবময় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। নিদর্শন ভিত্তিক গবেষণা ও শিক্ষা বিস্তারের জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দেশের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সঙ্গে সেই দেশের পরিচয় তুলে ধরে জাদুঘর। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার জন্য জাদুঘর পরিদর্শন করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ একটি সু-প্রাচীন সভ্যতার দেশ। আমাদের রয়েছে গৌরবদ্বীপ্ত ইতিহাস। আর কোনো দেশের জাতীয় জাদুঘর ঘুরলে সে দেশ ও জাতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এ জন্য এটিকে জনসাধারণের বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা হয়।তাই জাদুঘর এমন একটি জায়গা, যেখানে দর্শনার্থীদের ধর্ম, বর্ণ, পরিচয়ের শ্রেণিকরণ নেই। সব মানুষের জন্য নিরপেক্ষ জায়গা হচ্ছে জাদুঘর।আর ‘সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে জাদুঘরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস, ঐতিহ্য, শুদ্ধ সংস্কৃতি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে জাদুঘর সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঝুঁকি নিয়েও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে জাদুঘরের ভূমিকা রয়েছে।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

পাঠকের মতামত:

২৫ জুন ২০২৪

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test