E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

‘মানুষ মূলত সেফটিপিনের মতো’

২০১৬ আগস্ট ৩০ ১২:০৩:৩৯
‘মানুষ মূলত সেফটিপিনের মতো’

ইকবাল রাশেদ :


জীবন কথা বলে জীবনের গতানুগতিক জীপনযাপনে। যখন সাহিত্যের কোনো শাখা-প্রশাখা কথা বলে তখন তা আর শুধুমাত্র সাহিত্য গণ্য না করাই শ্রেয় - বলা চলে জীবনের কথা বলাই সাহিত্যের সর্বোত্তম কাজ। জীবন ও মানুষ, সাহিত্যের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

মাসুম বিল্লাহ এ সময়ের প্রতিভাবান সাহিত্যকর্মী। "অবুঝ সেফটিপিন" তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। তার মতে - "মানুষ মূলত সেফটিপিনের মতো। ভালোবেসে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চায়।" সত্যিই কি তাই হবে? যুগ যুগান্তরের ইতিহাস কিন্তু লেখক মাসুম বিল্লাহ'র এ উক্তির সার্থকতা বহন করে চলেছে।

পারিবারিক বন্ধনই জনমানুষের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ। স্নেহ-মমতাই মানুষকে বেঁধে নেয় প্রীতিময় আলিঙ্গনে। মধুরিমা। এ উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র। মধুরিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরী ছাত্রী। নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখে লজ্জা পায়। সুন্দরী নারীর প্রতি পুরুষের লোভনীয়তার কথা মনে পড়তেই মন খারাপের ডানা ভর করে ওর আত্মভূমিতে। মধুরিমার বাবাও পুরুষ। মধুরিমার বাবা আলম সাহেব নারীর প্রতি লোভনীয় পুরুষ নয়। এ দু'টো চরিত্র পিতৃ ও সন্তানগত চিরায়ত পবিত্র সম্পর্ক বহন করে।

... তারপর এক ছুটে বাবার রুমে এসে বলল, বাবা, দেখো তো টিপটা ঠিকমতো বসেছে কিনা?

আলম সাহেব পত্রিকা থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন, হুম, বসেছে।

-না দেখে কীভাবে বলছো বাবা?

-আচ্ছা, আয় ঠিক করে দেই।

মধুরিমা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, লক্ষ্মী বাবা। গেলাম।'

আলম সাহেব প্রতিবাদী চেতনার। অবুঝ সেফটিপিনের মতোই সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চত করতে তার চেষ্টার কমতি নেই। তার চোখে ধরা দেয় দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান। ছুটে যান "নিরাপদ সড়ক চাই" জন্মদাতা সুপারস্টার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের অফিসে। ভিআইপি যাতায়াতের উসিলায় যখন রাজপথে একটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়, তিনি যেন দেখতে পান অ্যাম্বুলেন্সের পেটে হয়তো কেউ মৃত্যুর প্রহর গুনছে। সমাজের ভিআইপি ব্যবস্থার প্রতি রাগে ক্ষোভে প্রতিবাদে ছুটে যান রাজপথের দিকে। পুলিশ তাকে পুরে দেয় জেলে। তবুও তিনি দমে যান না। পরিকল্পনা আটেন- একদিন রাজপথের মাঝখানে বসে থাকবেন - কিছুতেই উঠবেন না।

"অবুঝ সেফটিপিন"- এর সবচেয়ে জটিল অদ্ভুত চরিত্র অর্ক। পুরো নাম অরিত্র অর্ক। আলম সাহেবের বাউন্ডুলে ছেলে। মাস্টার্স করেও বাউন্ডুলে। বাবার মতোই নারীর প্রতি লোভী নয়। চলচ্চিত্র বানানোর নেশায় দৌঁড়ানো বন্ধু সাইফুল নিষিদ্ধ ঘরে নিয়ে গেলেও সুচারুভাবে সে এড়িয়ে যায়। একসময় অর্ক রাত্রিতে পুলিশের ফাদে পড়ে। আজব অন্যরকমের ভালো মানুষ পুলিশ অফিসার নুরুল আমিন। প্রতিরাত্রে কাউকে না কাউকে আটক করে গালগপ্পো করে। অর্কের সাথে নুরুল আমিনের ক্ষণিকের সখ্যতা গড়ে ওঠে। অর্ক বই ফেরী করে বেড়ায় শহরের লোকাল বাসে। হয়ে যায় বইয়ের ফেরিওয়ালা। বন্ধুর অবিক্রীত বই বিক্রির দায়িত্ব ঘাড়ে চেপে নেয়। অর্ক বাবার কাছে বইয়ের অপাঠকদের প্রতি শীতল ক্ষুব্ধ অভিযোগ করে -

'না বাবা, আমার এক বন্ধুর বই এটা। নিজের টাকায় বই বের করেছে, কিন্তু বইগুলো ওর খাটের তলায় পড়েছিল। আমি ওর বইগুলো মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়ার একটা ব্যবস্থা করছি।

-সেটা তো অন্যভাবেও হতে পারত।

-সে চেষ্টা করেছি বাবা, কিন্তু কেউ সেভাবে এগিয়ে আসেনি সব বই নাকি বাজারে চলে না।'

অর্কের স্বপ্ন সুসং নগরে চায়ের দোকানি হবে। সেখানে সাথে নিবে মিতুকে। মিতুকে অভিশপ্ত দারিদ্রতা পতিতা পরিচয় দেয়। টগবগে তরুণ যুবক অর্ক মিতুকে সঙ্গিনী করে ভেঙে দিতে চায় কথিত আধুনিক সমাজতান্ত্রিকতার কঠোর দেয়ালের চিলেকোঠা।

উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র মিতু। বই পড়ে। বই পড়া তার কাছে নেশার মতো। নীলক্ষেতে গিয়ে বইয়ের খোঁজ করে। সমরেশের মাধবীলতা তার প্রিয়। দীপবলীকে মিতু বড্ড বেশি আত্মীয় ভাবে। না ভাবার কারণ নেই। মিতুর দুর্বিষহ জীবনের একপিঠ যে দীপাবলী। জারুল গাছের সাথে মিতু গোপন স্বপ্নের কথা আলাপ করে। মিতু স্বপ্ন দেখে তার ছোট্টবোন সেতু মিতুর জীবনের ছবক স্পর্শ করবেন না। মায়ের বেদানা লুকোনো গালি, বাড়িওয়ালার তীর্যক লালসার কটুকথা, পার্কে জোড়া যুবকের 'মাল' শব্দ শুনতে কিংবা কোনো লম্পটের তাড়া খেতে হবে না। সেতু বড় হবে। অনেক বড়। অর্কের সাথে বন্দী খাচার টিয়েপাখি মুক্তো আকাশে উড়িয়ে দিতে মিতুর ভালো লাগে।

অবুঝ সেফটিপিনের পাতা জুড়ে আছে ইকবাল। মায়ের দেয়া আদুরে ডাকনাম ইকু। ইকবাল আবহমান গ্রামীণ বাংলার সরল সন্তান। শহরের নিত্যনৈমিত্তিক হালচালের রাস্তায় সাথে নিজেকে খাপে খাপ করতে পারে না। রাস্তার ফুটপাতে বোপোয়ারা গতিময় মোটরবাইক তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। মধুরিমার অজান্তে প্রেমিক ইকবাল। শহরের বিলবোর্ডের মডেলদের মুখে মধুরিমার ছায়ার আভা দেখতে পায় ইকবাল।

ইকবালের মা ছেলেকে শহরে পড়তে আসতে দিতে চাননি, ভার্সিটিতে মারামারি আর গোলাগুলির ভয়ে। ইকবালের মা বলে," বাপ তুই বোছো গন্ডলোগের মইদ্যে যাও। হ্যালো মোর মাতা খাও।" তবু ইকবাল

ভার্সিটির গুলিতে জর্জরিত হয়। তারপর গায়ের ছেলে গায়ে ফিরে যায় মায়ের সুবোধ বাধ্য ছেলের মতো। গায়ে যেয়ে চাষার ছেলে ছাষা হবে। ইকবালের খোঁজে মধুরিমা গায়ে আসে। সেও হতে চায় গায়ের মানুষ, চাষার বৌ। মধুরিমার ওড়নার অবুঝ সেফটিপিন হয়ে যায় ইকবাল।

উপন্যাস : অবুঝ সেফটিপিন, লেখক : মাসুম বিল্লাহ, বইটি প্রকাশ করেছে : ম প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ একুশে বইমেলা ২০১৬, মূল্য : ২০০ টাকা মাত্র।
বইটি সংগ্রহের জন্য ফোন করুনঃ ০১৯১১৭৮৫৪২১। এছাড়াও অনলাইনে রকমারী.কম এ পাওয়া যাবে সারা বছর।

পাঠকের মতামত:

১৬ নভেম্বর ২০১৮

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test