Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

উৎপাদন খরচের নিচে বাজার মূল্য

শরীয়তপুরে বোরো ধান নিয়ে কৃষকের কান্না

২০১৯ মে ২৩ ১৩:৩৮:৪৭
শরীয়তপুরে বোরো ধান নিয়ে কৃষকের কান্না

শরীয়তপুর প্রতিনিধি : বোরো ধান নিয়ে বিপাকে পরেছেন শরীয়তপুরের কৃষকরা। কেউ শুনছেননা প্রায় ৯০ হাজার ধান চাষির কান্না। বর্তমানে বাজারে ধানের দর অত্যন্ত কম হওয়ায় উৎপাদন খরচই ঘরে তুলতে পারছেননা তারা।

এদিকে শরীয়তপুর জেলায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে খাদ্য বিভাগ যে পরিমান বোরো ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে তার পরিমানে খুবই কম, যা মোট উৎপাদনের ২১৮ ভাগেরও কম বা ০.৫০ শতাংশেরও নিচে। উৎপাদন মৌসুমে ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারাবে কৃষক।

চলতি মৌসুমে শরীয়তপুর জেলায় ছয়টি উপজেলায় ২৭ হাজার ২ শত ১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। আর ৮৯ হাজার ৫ শত ১৮ জন কৃষক এ ধান চাষ করেছেন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৬১ হাজার মেট্রিক টন। সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে প্রতি মন বোরো ধান ১ হাজার ৪০ টাকা দরে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর বর্তমানে বাজারে ধানের সর্বোচ্চ দর রয়েছে প্রতি মন ৫ শত টাকা। খাদ্য বিভাগ শরীয়তপুর জেলা থেকে এ বছর মাত্র ৭৪০ মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহের ঘোষনা দিয়েছে, যা জেলার মোট উৎপাদনের ২১৮ ভাগেরও কম। এতে অনেকে মনে করছেন, ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় নয়তো যেন বিপদাপন্ন কৃষকের সাথে সরকারের উপহাস করা।

এদিকে খাদ্য অধিদপ্তর গত ২৫ এপ্রিল থেকে একযোগে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। সংগ্রহ চলবে ৩১ আগষ্ট পর্যন্ত। শরীয়তপুর জেলায় চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৬১৩ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাউল এবং মাত্র ৭৪০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে।

ধান চাষি কৃষকেরা ক্ষোভের সাথে জানিয়েছে, তাদের উৎপাদিত ধান থেকেই চাল তৈরী হবে। অথচ চাল নেয়া হচ্ছে দেড় হাজার টনেরও বেশী আর ধান নিবে মাত্র ৭৪০ টন।

শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবছর জেলার সদর উপজেলায় ৩৬,৮১০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার ধান সংগ্রহ করছে মাত্র ১৬৭ মোট্রক টন, নড়িয়া উপজেলায় ৩৫,৮২০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার ধান সংগ্রহ করছে মাত্র ১৬৮ মোট্রক টন, জাজিরা উপজেলায় ৭৪০৫ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার ধান সংগ্রহ করছে মাত্র ৩৪ মোট্রক টন, ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ২৭,৬৬০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার ধান সংগ্রহ করছে মাত্র ১২৪ মেট্রিক টন, ডামুড্যা উপজেলায় ২৪,৪৮০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার সংগ্রহ করছে মাত্র ১১০ মোট্রক টন এবং গোসাইরহাট উপজেলায় ২৮,৬৪০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করা হয়েছে, এর বিপরীতে সরকার ধান সংগ্রহ করছে মাত্র ১৩৭ মোট্রক টন ধান।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার উত্তর বালুচরা গ্রামের মজিবুর রহমান পাহাড় বলেন, আমি এবছর ৫ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছি। জমিতে হালচাষ, সার, বীজ, শ্রমিক, কর্তণ সহ এক মন ধান উৎপাদনে আমার খরচ হয়েছে কমপক্ষে ৭০০ টাকা। আর বর্তমান বাজারে এক মন ধান বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা থেকে ৫২০ টাকা। ধান নিয়ে এখন আমরা কৃষকরা খুব বিপদে পরেছি, আমাদের কান্না কেউ দেখেনা।

তিনি আরো বলেন, আমাদের জেলায় দেড় লাখ মেট্রিক টনেরও বেশী ধান উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু কৃষকের কাছ থেকে নাকি নিবে মাত্র ৭৪০ টন। এই সামান্য ক‘টা ধান না কিনলেই সরকারের কী হয়? কর্তণ মৌসুমে ধানের দাম না বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে আমরা বোরো ধান আবাদ না করে গরুর জন্য ঘাষ চাষ করবো।

জেলার সখিপুর থানার উত্তর সখিপুর মাধু সরকার কান্দি গ্রামের ধান চাষি বাচ্চু মিয়া সরকার বলেন, আমাদের এখন আত্মহত্যা করা ছারা কোন পথ নেই। ধান কাটার শ্রমিক পাইনা, বাইরের জেলা থেকে উচ্চ মূল্যে শ্রমিক ভাড়া করে আনতে হচ্ছে। একজন শ্রমিকের মুজুরী দৈনিক ৭০০ টাকা। তাকে দু‘বেলা খাওয়াতে হয়। কিন্তু তিনি দৈনিক ধান কাটতে পারে মাত্র দেড় মন। সরকারি গুদামে ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রি করতে গেলে সেখানে ২০ শতাংশ হারে ঘুষ চায় কর্মকর্তারা। আমরা আর ধান চাষ করবোনা।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরভাগা ইউনিয়নের বকাউলকান্দি গ্রামের কৃষক হাসান বকাউল বলেন, ধান উৎপাদনে যে খরচ হয় সে অনুযায়ী আমরা মূল্য পাইনা। কাটার সময় শ্রমিক পাইনা। নানা সমস্যার মধ্যে ধান আবাদ করতে হয়। তাই এ বছর আমার সব জমি খাজনায় লাগিয়ে দিয়েছি। ধান আবাদ করে আমাদের এখন আর কোন লাভ নেই। যেকানে একটা জেলায় দেড়‘শ থেকে পৌনে দুই‘শ টন ধান উৎপাদন হয়, আর সেখানে সরকার ক্রয় করে মাত্র ৭০০-৭৫০ টন। এটা তো রীতিমত কৃষকের সাথে উপহাস করা।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া বন্দরের ধান ব্যবসায়ী জয়নাল বেপারী বলেন, এ বছর বাজারে ধানের মূল্য গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে রয়েছে। আমরা কৃষকের কাছ থেকে সদ্য তোলা প্রতি মন ধান ক্রয় করছি ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায়। কৃষকের মত আমরাও ধান নিয়ে বিপদে আছি। কোন পাইকার বা মিল মালিকরা আমাদের থেকে ধান কিনছেন না। ধানের দর বাজারে বৃদ্ধি না পেলে কৃষক এ বছর অনেক লোকসানে পরবে।

শরীয়তপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক খোন্দকার নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের জন্য কৃষি বিভাগের কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করে ২২ মে থেকে ধান ক্রয় শুরু করেছি। প্রতি একজন কৃষক ১৫০ কেজি থেকে ৩ হাজার কেজি পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারবেন।

শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রিফাতুল হোসাইন বলেন, এ বছর সারা দেশেই ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। শরীয়তপুরেও ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আমাদের অনেক কষ্ট আছে। কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য পেতে তিনি প্রতি জেলায় সরকারিভাবে চাল কল স্থাপন করা এবং প্রতি ইউনিয়নে বা বাজারে বাজারে ধান সংরক্ষনাগার স্থাপন করে কৃষকের ধান সংরক্ষন করার সুযোগ করে কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য তুলে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহনে সুপারিস করেছেন।

(কেএনআই/এসপি/মে ২৩, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

২৫ জুন ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test