Pasteurized and Homogenized Full Cream Liquid Milk
E Paper Of Daily Bangla 71
Janata Bank Limited
Transcom Foods Limited
Mobile Version

৭২ ফুট লম্বা ইলিশ মাছের আকর্ষণে ছুটে আসছে বাঘ-সিংহ

২০১৮ জুন ০৯ ১৪:১৭:২২
৭২ ফুট লম্বা ইলিশ মাছের আকর্ষণে ছুটে আসছে বাঘ-সিংহ

মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) : ৭২ ফুট লম্বা বিশাল ইলিশ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এই মাত্র সাগর থেকে মাছটি ধরা হয়েছে। সূর্যের আলোতে মাছের শরীর চিকচিক করছে। লেকের পাশে রাখা মাছটি দেখে উড়ছে সাদা বক। বিশাল এই মাছটির আকর্ষনে ধেয়ে আসছে সিংহ ও বাঘ। বাঘ ও সিংহের ধেয়ে আসা দেখে ছুটছে ক্যাঙ্গারু, হরিন, বানরসহ বনের পশু-পাখি। ঠিক এমনই ফাইবার ও সিমেন্টর তৈরি বন্য জীবজন্তুর ভাস্কর্য ও লাইফ এ্যানিমেল নিয়ে কুয়াকাটায় পর্যটকদের বিনোদনের জন্য তৈরি হয়েছে “ইলিশ পার্ক এন্ড রিসোর্ট”। কুয়াকাটা জিড়ো পয়েন্ট থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের এই ইলিশ পার্ক দেখতে এখন ছুটে আসছে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। স্কুল-কলেজেন শিক্ষার্থীসহ শিশু-বৃদ্ধদের কাছে এই পার্কটি যেন স¦র্গোদ্যানে পরিনত হয়েছে।

প্রায় এক বিঘা জমির উপর গহীন বন্য প্রকৃতির আদলে তৈরি ইলিশ পার্কের মূল আকর্ষন ৭২ লম্বা বিশাল ইলিশের পেটের মধ্যে তৈরি রেষ্টুরেন্ট। এই রেষ্টুরেন্টে সরবরাহ করা হবে শুধুই সী-ফিস। বিলুপ্ত প্রায় সামুদ্রিক মাছ পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে তৈরি করা হয়েছে মৎস্য জাদুঘর।

উপকূলীয় এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রাখাইন সংস্কৃতি পর্যটকদের জন্য কাছে তুলে ধরতে রয়েছে ফটোগ্যালারী। ইলিশ পার্কের চারিদিকের লেকের মধ্যে ২২ ফুট লম্বা একটি সাম্পান তৈরি করা হয়েছে। এই সাম্পান আসলে একটি মঞ্চ। যেখানে হয় উপকূলীয় রাখাইন ও বাঙালী হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে “শিশুদের রাজ্য ও ভুতের বাড়ি” নামে দুটি পার্ক। এখানে রয়েছে খেলার বিভিন্ন সামগ্রী ও ছবি তোলার জন্য মজার মজার পুতুল ও বন্য পশু-পাখি। সবুজে ঘেরা এই ইলিশ পার্ক দিনের আলোতে উপভোগের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বন্যজগত তৈরি করা হয়েছে। আর রাতের অন্ধকারে পার্কটি লেজার শো ও রং-বেরঙের আলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি আধুনিক দ্বীপের আদলে।

ইলিশ পার্ক ঘুরে দেখা যায়, পার্কের চারদিকে ঘেরা লেকে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছের চাষ করা হয়েছে। পর্যটকদের অবসর সময় কাটানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে আদিম আদলের কটেজ। লেকের পাশে তৈরি করা হয়েছে ছনের তৈরি পাঁচটি সেট ঘর। কাঠ,বাঁশের তৈরি এ সেট ঘরে খাবার পরিবেশনের ট্রে যেমন তেরি করা হয়েছে পাতা দিয়ে, চেয়ার তৈরি করা হয়েছে গাছের শেকড় ও গাছের ছালসহ খন্ড দিয়ে।

খাবার সরাবরাহ করা হয় মাটির পাত্র ও কলাপাতায়। এই সেট ঘরের দুই পাশে বসানো হয়েছে ফাইবার ও সিমেন্টের বাঘ, সিংহ, হাতি, বানরের ভাস্কর্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবগুলোই জীবন্ত। যেন ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। মাঠের বাগানে বসিয়ে রাখা হয়েছে হরিন ও হরিনের বাচ্চা, ব্যাঙ , খরগোশ ও কচ্ছপ। দেখলে মনে হয় এগুলো যেন বাগানে ছুটোছুটি করছে। এই মাঠে তৈরি করা হয়েছে গহীন অরন্যের আদলে বাগান। যেভাবে রোপন করা হয়েছে বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির বিভিন্ন গাছ। কোন অনুষ্ঠানে এই বাগানে যাতে একসাখে ৫০/৬০ জন মানুষ বসতে পারে তার ও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পার্কে ঘুরতে এসেছেন ঢাকার মিরপুরের সাইয়ান আরমান-তাথৈ দম্পতির সাথে তাদের দুই সন্তান পঞ্চম শ্রেণিতে পড়–য়া আনিকা ও নবম শ্রেণিতে পড়–য়া সাইরাজ। তিন ঘন্টা পার্কে ঘুরে বেড়ানোর পরও এই দুই যেন ঘোর কাটছে না। ইট,কংক্রিটের শহর থেকে উপকূলের এই পরিবেশে লাইফ ও ভাস্কর্য এ্যানিমেলের কাছে গিয়ে ছবি তোলা, তাদের ছুয়ে দেখা, শিশুদের রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো ও লেকে মাছের খেলা দেখেও তাদের আকর্ষন কমছেই না।

সাইয়ান আরমান বলেন, কুয়াকাটায় সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা ছাড়া তারা আর কিছুই খেুঁজে পাননি। কিন্তু এই পার্কটি সত্যিই আকর্ষনীয়। এখানে না আসলে সন্তানরা হয়তো মনে রাখার মতো কিছুই খুঁজে পেতো না কুয়াকাটায়।
নয় বছরের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়–য়া তামান্নার যেন ঘোরই কাটছে না। কখনও বাঘের পিঠে, কখনও বা ব্যাঙের পিঠে উঠছে। বানরের সাথে খেলা করছে। হাতে থাকা চিপসের প্যাকেট থেকে চিপস ছুড়ে দিচ্ছে লেকের মধ্যে মাছকে খাওয়ানোর জন্য।

সে জানায়, চিড়িয়াখানায় ঘুরেছি। বাঘ-সিংহ-হাতি ওইখানে দেখলেও এখানে ছুয়ে দেখতে পেরেছি। এখানে খুব মজা। পাঠ্যবইতে শকুন ও মেছোবাঘের কথা পড়েছি এখানে এসে বাস্তবে দেখলাম। আরও অনেক বন্য পশুও দেখেছি।

শিক্ষক মো. শামিম হোসেন বলেন, শিক্ষা সফরে কুয়াকাটায় গিয়ে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাননি। কিন্তু ইলিশ পার্কে গিয়ে তাদের শিক্ষার্থীরা বেশ আনন্দ পেয়েছে। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্য পশুপাখি দেখে শিক্ষার্থীরা যেন জানার রাজ্যে প্রবেশ করেছে। একটু পরপরই একেকজন জানতে চাইছে স্যার এটা কি, ওটা কি ? আমরা বইতে যেমন পড়েছি বাস্তবেও তো একই রকম। এভাবে হাজারো প্রশ্ন। যা শিক্ষক হিসেবে তাঁদের ভালোই লেগেছে।

ইলিশ পার্কে দায়িত্বরত একাধিক ষ্টাফ জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুয়াকাটায় শিক্ষা সফরে আসলে এই পার্কে ঘুরে যাচ্ছেন। তাদের ভ্রমনের অধিকাংশ সময়ই কাটছে এখানে।

ইলিশ পার্কের উদ্যোক্তা রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান, দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের অহংকার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এখান আদিবাসীসহ বাঙালীদের বিশাল একটি অংশ সাগরে মাছ শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু কুয়াকাটার নিজস্ব কোন প্রতীক নেই। যেহেতু কুয়াকাটা ইলিশ মাছের জন্য বিখ্যাত তাই এই পার্কের নাম রাখা হয়েছে ইলিশ পার্ক এন্ড রিসোর্ট। এই বিশাল ইলিশের মধ্যের তৈরি রেষ্টুরেন্টটিই এখান প্রধান আকর্ষন। সাথে রয়েছে লাইফ ও কৃত্রিম এ্যানিমেল।

বর্তমানে ইলিশ পার্কে বিলুপ্তপ্রায় শকুন, মেছোবাঘ, বনবিড়াল,টারকি, দেশী গুজো বক , খরগোশ, সাদা ইঁদুর রয়েছে। এছাড়া পার্কের প্রবেশের পথে আরও বসানো হবে নানা নানা এ্যানিমেল ভাস্কর্য। পার্কে প্রবেশ মূল্য মাত্র ২০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে দুইশ-তিনশ পর্যটক ঘুরতে আসে এই পার্কে। তবে যারা এই পার্কে রাত্রিযাপন করতে ইচ্ছুক তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়।

(এমকেআর/এসপি/জুন ০৯, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

২১ মার্চ ২০১৯

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test