রণেশ মৈত্র


আজ ৩ অক্টোবর। প্রায় দুই দশক আগে পাবনা হারিয়েছে তার হাল আমলের শ্রেষ্ঠ ও কর্মঠ সাংবাদিক মীর্জাকে। মীর্জা শাসমুল ইসলাম দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদক হওয়ায় দৈনিক বাংলা তাঁকে জেলা সংবাদদাতা থেকে ষ্টাফ রিপোর্টার পদে উন্নীত করেছিল। মীর্জাই প্রথম পাবনা জেলায় ঢাকার কোন প্রথম শ্রেনীর জাতীয় পত্রিকায় ষ্টাফ রিপোর্টার পদে উন্নীত হতে পেরেছিলেন। পেশাদার বেতনভুক্ত সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

পাকিস্তান আমল। তদুপরি আইয়ুব সামরিক শাসকের দৌরাত্ম্য সংবাদপত্র আর সাংবাদিকদের জীবন বিপর্যস্ত। তাদের স্বাধীনতা অন্তর্হিত। এই সময়কালে সাংবাদিক জীবনের যাত্রা শুরু মীর্জা শামসুল ইসলামের।পাবনা শহরের পশ্চিম প্রান্তে ইছামতির তীরে এডওয়ার্ড কলেজের তৎকালীন রসায়ন শাস্ত্রের প্রফেসর সাহিত্যানুরাগী অধ্যাপক আব্দুল হামিদ কতৃক প্রকাশিত ও সম্পাদিত সাপ্তাহিক আমাদের দেশ পত্রিকাতেই তার হাতেখড়ি।লজিং থাকতেন মীর্জা শামসুল ইসলাম ঐ বাড়িতেই।অধ্যাপক তাকে তাঁর পত্রিকাতেই কাজ করার সুযোগ দেন।সেই থেকেই শুরু।

মীর্জা শামসুল ইসলামের বাড়ি বেড়া উপজেলার আমিনপুর গ্রামে।সেখান থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে পাবনা এসেছিলেন উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের তাগিদে। ভর্তি হয়েছিলেন এডওয়ার্ড কলেজে।লজিং থেকে পড়াকালেই মীর্জা শামসুল ইসলাম পৌরসভার স্কুল ইন্সপেক্টর পদে চাকুরী নেন। ঐ চাকুরী, সাংবাদিকতা ও লেখাপড়া একসাথেই তিনটি দায়িত্বই পালন করতেন তিনি ।

এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বি এ পাশ করার পর হঠাৎ খবর পেলেন পাকিস্তান সরকার গঠিত প্রেস ট্রাষ্ট থেকে দৈনিক পাকিস্তান নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে চলেছে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। মীর্জা ঐ পত্রিকায় দরখাস্ত করে বসলেন পত্রিকার পাবনাস্থ সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার আহবান জানিয়ে। বার্তা বিভাগ জানালো পরীক্ষামুলকভাবে নিয়মিত খবর পাঠাতে হবে।

খবর সংগ্রহ করা, খবর তৈরি করা, খবর লেখার ক্ষেত্রে নৈপুন্য দেখাতে সামরথ্য হওয়ায় পেয়ে গেলেন দৈনিক পাকিস্তানের পাবনাস্থ নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগপত্র। সেই যে শুরু আর কখনোই পেছনে তাকাতে হয়নি মীর্জা শামসুল ইসলামকে – তার সাংবাদিকতা জীবনে প্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে।

রেডিও পাকিস্তানের পাবনাস্থ সংবাদদাতা হিসেবেও নিয়োগ পেলেন তিনি।তখনও পুর্ব বাংলায় টেলিভিশনের প্রচলন হয়নি। সংবাদ পিপাসু সকলকেই তখন টাটকা খবরের জন্য বেতারের উপর নির্ভর করতে হতো।দৈনিক পত্রিকাগুলো এখন যেমন যেদিনের পত্রিকা সেই দিন সকালেই নিজ নিজ বাড়িতে পাওয়া যায়-তখন তা পাওয়া যেতনা । ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রতিকাগেুলি আসতো একদিন পর। কারন তখনো যমুনা সেতু নির্মিত না হওয়াতে রাজধানী থেকে পত্রিকাগুলি আসতে একদিন বিলম্ব হতো।আসতে হতো ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে সিরাজগঞ্জের জগন্নাথগঞ্জ ঘাট দিয়ে।

ভালো লিখনীর কারনে তিনি ছিলেন সাংবাদিকতায় পাবনার অন্যতম পথিকৃৎ, পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠতা সভাপতি এবং পুর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ কে এম আজিজুল হক সাহেবের বিশেষ স্নেহধন্য । খবর সংগ্রহ করে দেয়া, জরুরী খবরের প্রেস টেলিগ্রাম ড্রাফট করে দেয়া হক সাহেবই মীর্জাকে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিলেন হাতে কলমে।

পরবর্তীতে মীর্জা শামসুল ইসলাম প্রেসক্লাবের সদস্য হন।আমৃত্যু সদস্য থাকাকালে মীর্জা প্রতিবার দুই বছর মেয়াদে পর পর তিনবার সভাপতি নির্বাচিত হন। এ কে এম আজিজুল হক ছাড়াও আনোয়ারুল হক, প্রসাদ রায় ও আমার সাথে ছিল তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা বেচে থাকা অবধি বজায় রেখেছিলেন মীর্জা শামসুল ইসলাম।

খবর তৈরির ক্ষেত্রে মীর্জার ছিল বিশেষ নৈপুন্য। সকল দিকে থাকতো বিশেষ নজর। এ ক্ষেত্রে তার নৈপুন্যের কয়েকটা উদাহরন তুলে ধরলে বিষয়টা উপলব্ধি করা সহজ হবে।

একবার ওয়াপদার ঢাকা অফিসে থেকে প্রকাশিত তাদের সাপ্তাহিক বুলেটিন আসে পাবনা প্রেসক্লাবে। মীর্জা ঐ বুলেটিনগুলির উপর নজর রাখতেন। একবার একটি হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে তার নজরে পড়লো কয়েকশ কোটি টাকার এক বাঁধ নির্মান প্রকল্পের খবর। বুলেটিন গুলি বাংলায় প্রকাশ হত।মীর্জা শামসুল ইসলাম আর কাউকে না দেখিয়ে ঐ বুলেটিনের সংশ্লিস্ট খবরটি কেটে একটি প্রেস টেলিগ্রাম ফরমে আঠা দিয়ে সেটে দৈনিক পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিলেন নিজে টেলিগ্রাম অফিসে গিয়ে।নিজে গেলেন অন্যদের কাছে বিষয়টি গোপন রাখার উদ্দেশ্যে। ফিরে এসে দিব্যি প্রেসক্লাবের পুর্বদিকের ছাদে বসে আড্ডা।
পরদিন পত্রিকা এলে দেখা গেল মীর্জা শামসুল ইসলামের নাম দিয়ে দৈনিক পাকিস্তানের প্রথম পাতায় তিন কলাম শিরনামে খবরটি ছাপা হয়েছে একটি বিশেষ খবর হিসেবে।

আর একটি উদাহরণ

একবার সাইক্লোনে শাহজাদপুরে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। বহু ঘরবাড়ির টিন ও খড়ের চাল উড়ে যায়। বাড়ি ঘর ভেঙ্গে পড়ে। উপড়ে পড়া ঘর ও গাছচাপা পড়ে বেশ কিছু মানুষ মারা যায়।

খবরটি পাওয়া মাত্র মীর্জা শামসুল ইসলাম ছুটলেন শাহজাদপুরে। পরদিন ফিরে এলেন নোট ও ক্যামেরার অনেকগুলি ছবি নিয়ে।

অতপর শুরু হলো সাত দিন ধরে শাহজাদপুরের সাইক্লোনের উপর প্রতিদিন একটি করে সিরিজ রিপোর্ট। খবরতো একটি আইটেমেই শেষ করা যেত।সিরাজগঞ্জ এবং পাবনার সাংবাদিকেরা তাই করেছিল-কিন্তু মীর্জারতো ছিল খবর আবিস্কার ও তৈরির এক আশ্চর্য্য মুন্সিয়ানা। তিনি ঘরবাড়ি ভাঙা নিয়ে একটি প্রতিবেদন, গরু ছাগল মোরগ-মুরগী সহায় সম্বল প্রভৃতি হারানো নিয়ে অপর একটি প্রতিবেদন। গাছ গাছালি ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পড়ায় গ্রামীন সড়কপথে গাড়ি ঘোড়া চলাচলে নানা বিপত্তি নিয়ে অপর একটি প্রতিবেদন, নদীর জল কাঁদা সাইক্লোণে উড়ে পারশবরতী গ্রামের ঘরবাড়িতে লেপ্টে যাওয়া এবং নদীর চিহ্ন না থাকা নিয়ে আরোকটি প্রতিবেদন, কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন এবং সবশেষ প্রতিবেদনটি ছিল সাইক্লোন হাজার হাজার মানুষের জীবনে যে বিপযয় সৃস্টি করেছিল তা নিয়ে প্রতিবেদন। সবগুলি প্রতিবেদন দৈনিক বাংলায় বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল।

আরেকটি চমক সৃস্টি করেছিলেন মীর্জা শামসুল ইসলাম। পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিয়ে প্রায় তিনমাস ধরে একটি সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।এটি সপ্তাহে দুদিন করে প্রকাশিত হতো। হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসক ও সেবিকাদের কর্ম তৎপরতা ও তাদের দায়িত্ববোধহীনতা, রোগীর অসুস্থ্যতা জনিত ক্ষয় ক্ষতি, রোগীর বেড সংখ্যার স্বল্পতা, মানসিক রোগীদের নানাবিধ ধরন সে মোতাবেক কারযকর চিকিৎসার সুযোগ না থাকা, নারী রোগীদের বহুবিধ অসুবিধা, তারমধ্যে একশ্রেনীর পুরুষ নারস নারী রোগীদের অসুস্থতার সুযোগে তাদের অনেকের সাথে দৌহিক সম্পর্ক স্থাপন, সুস্থ্য হওয়ার পরে অভিভাবকদের খবর পাঠানো সত্বেও না নিয়ে যাওয়া জনিত মানবিক সমস্যা, রোগীদের পালিয়ে যাওয়া, হাসপাতালের ওষুধ চুরি হয়ে যাওয়া, একশ্রেনীর ডাক্তারদের চিকিৎসায় অবহেলা ও প্রাইভেট চিকিৎসার রমরমা ব্যবসা, হাসপাতাল এলাকায় আইন শৃংখলা রক্ষায় অব্যবস্থাপনাসহ বহুবিধ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তার লেখায় স্থান পেয়েছে। এগুলো সংরক্ষিত হয়ে থাকলে দিব্যি একটি পাঠক প্রিয় বই প্রকাশিত হতে পারে।

পাবনার সাংবাদিকদের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ছিলেন রংপুরের চারন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন। একদিন হঠাৎ গাইবান্ধা থেকে মীর্জার এক আত্মীয় ফোন করে জানালেন স্টিমার থেকে স্রোতস্বীনি যমুনায় পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন মোনাজাত উদ্দিন।সাথে সাথে টেলিফোনে বিটিভিতে খবর পাঠিয়েছিলেন ।গাইবান্ধার খবর পাবনা থেকে কিভাবে পেলেন প্রশ্ন করলেন নিউজ ডেস্ক। মীর্জা খোঁজ নিতে বললেন। পরে পাবনার বরাত দিয়ে প্রচারিত হল গাইবান্ধার খবর।

এমন আরো অনেক বিচিত্র ঘটনা আছে যা এই মুহুতে স্মরণে আনতে পারছিনা। মীর্জা যেদিন অকস্মাৎ মারা যান সেদিন আমি ঢাকায়। অনেক কাজ ফেলে রেখে পরদিনই পাবনায় ফিরে আসি। এসেই যায় তার বাসায়। তাঁর স্ত্রী দেখালেন কিভাবে হঠাৎ তিনি সকালের নাস্তার পর চা খেতে খেতে হার্র্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন।তার ছিল ডায়াবেটিক ও উচ্চরক্তচাপ। ওষুধ খেতে দিন কয়েক অনিয়ম করাতেই সম্ভাবত তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটলো।

তাঁর সন্তান উৎপল মির্জৃাও বাবার সাংবাদিকতার ধারাটি অব্যাহত রেখে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে।যার স্বকৃতিস্বরুপ সে এবার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দেশের বর্ষ সেরা ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য পেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার।যা কিনা পাবনার সাংবাদিকতার জন্যও একটা মাইলফলক।

লেখক : সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।