উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ ডেস্ক : ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল পাক বিমানবাহিনীর একটি জীপকে ডেমরার কাছে এ্যামবুশ করে। এই এ্যামবুশে জীপটি ধ্বংস হয় এবং ৪ জন পাক বিমানবাহিনী ও সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সৈনিক নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছ থেকে অনেক মূল্যবান কাগজপত্র, পরিচয়পত্র ও কয়েকটি রিভলবার দখল করে।

মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলাদল ঘোড়াশালের কাছে পাকবাহিনীর ঝিনারদি অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। আড়াই ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধে একজন পাকসেনা নিহত হয় ও ১৫ জন গেরিলাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের ক্যাম্প থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র,রসদ ও অন্যান্য জিনিসপত্র দখল করে।

মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর ভুরঙ্গামারী বাজার ঘাঁটি আক্রমণ করে। এই আক্রমণ অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রচন্ড সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে পাকবাহিনী ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সিপাহী কবির আহমদ শহীদ হন।

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু হলে সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভংঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পাকিস্তান সরকারের কোন অধিকার নেই বঙ্গবন্ধুর বিচার অনুষ্ঠানের। তিনি এ ব্যাপারে বিশ্বশক্তিবর্গের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব উ’ থান্ট বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রসঙ্গে জাতিসংঘ সনদে উল্লিখিত মানবিক বিষয়ের পরিপন্থী মন্তব্য করে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মামলা সম্পর্কে কোনো আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। কেননা, তাঁর বিচার প্রসঙ্গটি মানবিক উদ্বেগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবিরসমূহ পরিদর্শন শেষে নয়াদিল্লী পৌঁছান এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরির সাথে বৈঠকে মিলিত হন।

ঢাকা শহর শান্তি কমিটির আহ্বায়ক সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ রাজাকারে যোগ দিচ্ছে। রাজাকাররা দেশ থেকে দুষ্কৃতকারীদের উৎখাত করবেই।’

দিনাজপুরের সামরিক কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের সমম্বয়ে একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আগামীকাল রাজাকার ও পুলিশের র‌্যালী এবং প্যারেড অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সকল সরকারী কর্মচারীদের নির্দেশ দেয়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জেবুন্নাহার আইভি রচিত ‘কথিকা’ :

...........২৪ বছর আগেকার দিনটির কথা। সেদিন কী উজ্জ্বল ছিল বাংলাদেশ, আর প্রাণদৃপ্ত ছিল বাংলার মানুষ।
...........আমরা স্বাধীন হয়েছি, এবার আমাদের দুঃখ ঘুচবে। বিদেশী শাসন, জমিদারের অত্যাচার, মহাজনের শোষন আর সামাজিক অসাম্যের হাত থেকে রেহাই পাবে বাংলার মানুষ। সারাদেশের মানুষ অন্তরের সবটুকু ভালবাসা দিয়ে বরণ করে নিল ১৪ আগস্টের ভোরের লগ্নটি।
বাংলার মানুষ তাদের ন্যায় সঙ্গত প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিবছর ১৪ আগস্টের ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই ভুল ভেঙ্গে গেছে বাংলার মানুষের। বিদেশী শাসনের পরিবর্তে তার ঘাড়ে চেপে বসলো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন। তীব্রতর হলো শোষণ।
বাংলার বীর সন্তানেরা ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, ১৯৫২ সালে ভাষার দাবীতে, ১৯৬৬ সালে ছয়দফা প্রতিষ্ঠায় এবং ১৯৬৯ সালে বাংলার স্বাধীকারের দাবীতে, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার দাবীতে, প্রাণাপেক্ষা প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবীতে বুকের তাজা রক্তে বাংলার শ্যামল মাটি লালে লাল করে দিয়েছে।
...........প্রতিবারই বর্বররা বাংলার সংগ্রামী জনতার প্রতিরোধের সম্মুখে পিছু হটে চ’ড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারপর তারা চ’ড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করলো ২৫ মার্চের গভীর রাতে।
...........বাংলায় আজ রক্তের ¯্রােত বইছে। ঘরে-ঘরে মাঠে-মাঠে রাজপথে জমাট বাঁধা রক্ত। তাই আজ স্বাধীন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে শেকল ছেঁড়া বাংলার মানুষ অতীতের অপমান আর গ্লানি ভরা দিনগুলোকে স্মরণ করছে প্রচন্ড ঘৃণার সাথে।

তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
(ওএস/অ/আগস্ট ১৩, ২০১৪)