E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

প্রশাসনের নীরবতায় আইন মানার বালাই নেই

মোড়ে মোড়ে ৪১ বছরের পুরনো গ্যাস সিলিন্ডার, ঝুঁকিতে কর্ণফুলীবাসী

২০২২ মার্চ ১৭ ১৭:০০:৫৮
মোড়ে মোড়ে ৪১ বছরের পুরনো গ্যাস সিলিন্ডার, ঝুঁকিতে কর্ণফুলীবাসী

জে. জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় কর্ণফুলী উপজেলায় বেড়েছে এলপি গ্যাসের চাহিদা। বাড়ছেনা ব্যবহারের নিরাপত্তা। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছাড়াই ঘরে ঘরে এলপি গ্যাস ব্যবহার। মুদির দোকানেও গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি। অনেকেই নতুন করে এসবের নাম দিয়েছেন বোতল বোমা। ফলে, যানবাহন ও গৃহস্থালি জ্বালানির গ্যাস সিলিন্ডার ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

জানা যায়, নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, ৫ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহত এবং আগুন লাগার খবর কর্ণফুলীতে বাড়ছে। গতকাল ভোরেও কর্ণফুলীর সৈন্যেরটেক মোড়ে আগুনে পুড়ে গেছে দশটির অধিক দোকান।

জানা গেছে, উপজেলার কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছেই। ফায়ার সার্ভিস অনেকটা বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, সিগারেটের আগুন বলে ধারণা করলেও। যার গভীরে রয়েছে এসব গ্যাস সিলিন্ডার বোতল। এসব মৃত্যুসঙ্গী বোমা ঘরে বা দোকানে রেখেই বসবাস করছে উপজেলার প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ।

তথ্যমতে, কিছুদিন পুর্বেও পুরাতন ব্রিজঘাট চত্বরে ১৬টি দোকান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মূলত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এ আগুনের সূত্রপাত বলে খবর পাওয়া যায় ।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাংলাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন তারাই আবার এই সিলিন্ডার পরীক্ষার সনদ দিয়ে থাকেন। সিলিন্ডারের সমস্যার কারণ থেকেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তথ্যসূত্র বলছে, কর্ণফুলীতে ছোট বড় দু’শতাধিক ছোটবড় মিল ফ্যাক্টরীতে ব্যবহার হচ্ছে প্রচুর গ্যাস বোতল। আশেপাশে বসতবাড়ি। উপজেলায় নেই ফায়ার সার্ভিস। শহর হতে দমকল বাহিনী আসতে আসতে ৫০% পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এমনকি মহাসড়কে ও উপজেলায় চলাচল করা যানবাহনের একেকটিতে ২ থেকে ৬টি সিলিন্ডার পর্যন্ত সংযোজন করা হয়। যেন গ্যাস বোমা বহনকারী গাড়িতে আমরা চলছি প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতায়।

দেখা যায়, কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহার ক্রসিং, কলেজ বাজার, মাষ্টারহাট, মইজ্জারটেক বাজার, সৈন্যেরটেক বাজার, ফকিরন্নির বাজার, বোর্ড বাজার, ইছানগর বাজার, চরপাথরঘাটা পুরাতন ব্রিজঘাট বাজারের অর্ধশত দোকানে গ্যাসের বোতল বিক্রি করছে অবাধে। নেই কোন সংশ্লিষ্ট কতুপক্ষের নজরধারী।

সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়মবিধিতে খুচরা দোকানে ১০ টার অধিক বোতল না রাখার আইন থাকলেও বহু বোতল মজুত করছে বহু দোকানদার। মানছে না আইন, নিরাপত্তাহীনতায় জনগণ যেন বসবাস করছে বোতলজাত গ্যাস বোমার উপর।

সরেজমিনে আমাদের প্রতিবেদক ঘুরে দেখেন, উপজেলার শিকলবাহা কলেজ বাজার সংলগ্ন মহাসড়কের উপর বিসমিল্লাহ ট্রেডিং নামক দোকানে মজুত করা হয়েছে কয়েক হাজার গ্যাস বোতলের স্তুপ। প্রকাশ্যে প্রশাসনের নাগের ডগায় বসে এসব ব্যবসা পরিচালনা করার পিছনে রয়েছে নাকি অজানা কাহিনী। রয়েছে মাসিক লেনদেনও।

অনেক জায়গায় আবার রাতের আধারে গ্যাস বোতল ফুলিং করে দোকানদার। বড় বোতল হতে ছোট বোতলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে গ্যাস ভর্তি করে। ১২ কেজি বোতলে পরিমাণে ১০ কেজি। দাম নেওয়া হয় ১২ কেজির। অভিনব এ ব্যবসা উপজেলার বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যে বাজারজাত করলেও প্রশাসনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় চিন্তিত স্থানীয় জনগণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে তিন হাজার ২০০ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ঐ সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে, এ আশঙ্কা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি।

প্রতিটি সিলিন্ডারের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। ১০ থেকে ১৫ বছর। এরপর সেগুলো ধ্বংস করে ফেলতে হয়। কিন্তু দেশে গাড়িতে যেটা ১০ বছর বা ১৫ বছর আগে লাগানো হয় সেটা চলতেই থাকে। একই অবস্থা বাসাবাড়ির বোতল গ্যাসের। সেগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।

এ বিষয়ে স্থানীয় জনগণ কতৃপক্ষের নজর প্রত্যাশা করেছেন। সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা সংস্থা বিস্ফোরক অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়ম মতে খুচরা দোকানে ১০ বোতল গ্যাস এবং পরিবেশক বা ডিলার ২০০/৫০০ বোতন মজুদ রাখতে পারে। কিন্তু জনবলের অভাবে রিটেস্ট সম্ভব হয় না। ফলে, গ্রামের বাজারে যেমন ইচ্ছা তেমন বাজারজাত ও প্রক্রিয়াকরণ করছে বোতল গ্যাস। এসব চাইলে স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করতে পারে। অন্যদিকে যদিও জনবল কম, সেক্ষেত্রে নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কতৃক প্রজ্ঞাপন জারি কিংবা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার আবেদন জানিয়েছেন কর্ণফুলীর সাধারণ জনগণ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা সুলতানা বলেন, যেখানে সেখানে অরক্ষিত গ্যাস সিলিন্ডার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিস্ফোরক অধিদফতরকে কয়েকবার জানানো হয়েছে। অধিদফতরের বিস্ফোরক পরিদর্শক না আসায় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা প্রশাসন এবিষয়ে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করবে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বছরে ১৪ হাজার টন গ্যাস সিলিন্ডারে ভরে বোতলজাত করে বিপিসি। কর্ণফুলীর বিন হাবিব এলপি গ্যাস কোম্পানী বছরে ১০ হাজার টনের অধিক গ্যাস বোতল বাজারে ছাড়ে। এসব সিলিন্ডার বোতল অনেক পুরনো। এগুলোর মধ্যে ১৯৮১ সালের সিলিন্ডারও রয়েছে। বিশেষ করে সিলিন্ডারের মুখের ভাল্ব ৩০ বছরের পুরনো। এসব ভাল্ব দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে যায়। ফলে, কিছুদিন পুর্বে ইছানগরের বিন হাবিব প্লান্টে রক্ষিত সিলিন্ডারে গ্যাস ভরানোর সময় ও আগুন লাগে।

সচেতনতা ও অসতর্কতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারি ভাবে সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। গ্রাহকদের সচেতন করার বিষয়েও নেই কোনো কার্যক্রম ও তৎপরতা।

কোম্পানিগুলো যে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারে ভরে বিক্রি করছে তারও যাচাই-বাছাই করার সুযোগ কম। এলপি গ্যাস ব্যবহারের নতুন নীতিমালা তৈরি হয়েছে কিছুদিন অগে। তবে এ সমস্যার সমাধান হবে কিনা সেটাই এখন জনগণের প্রশ্ন। নাকি হঠাৎ হঠাৎ লিখতে হবে জনগণের সম্পদ ও মানুষ পুড়ার গল্প।

(জেজে/এসপি/মার্চ ১৭, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

১৩ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test