E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

 

গণমানুষের পিঠে ৩৭ লাখের ইজারা, সীমিত নৌযানে অসীম ভোগান্তি

২০২২ মার্চ ২২ ১৬:৩৪:২৬
গণমানুষের পিঠে ৩৭ লাখের ইজারা, সীমিত নৌযানে অসীম ভোগান্তি

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর নৌপথ ডাঙ্গারচর টু সল্টগোলা ঘাট। এ ঘাটে হঠাৎ করে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া ৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। রাতে পারাপারের সময় ভাড়া আরও তিনগুন বেশি। লোকও নেয় ধারণক্ষমতার অধিক। প্রতিবাদ করলে দুর্ব্যবহার করেন মাঝিরা। নেই  প্রশাসনের কোনো নজরদারি। এ ঘাটে রাম রাজত্ব চলে ইজারাদারের। এ কারণে মিডিয়ায় বারবার অতিরিক্ত টোল আদায় ও ভোগান্তি নিয়ে নানা খবর প্রকাশিত ও বিক্ষোভ সমাবেশ হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

এমন আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন ডাঙ্গারচরের ঘাট দিয়ে পারাপার হওয়া নিয়মিত যাত্রী নাসরিন বেগম (৪০)। চাকরীজীবি ওই মহিলা জানান, সরু গ্যাংওয়ে (তীর ও নৌকার সংযোগকারী সেতু) দিয়ে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে বোটে ওঠেন। গ্যাংওয়ে ভাটার সময় মারাত্মক খাঁড়া হয়ে থাকে। সাইকেল ও মাল বোঝাই করতে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঘটে নানা দুর্ঘটনা। এর কারণে বেশি কষ্ট হয় নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের।

ঘাটের ইজারাদার কতৃপক্ষ যাত্রীদের সেবা দেওয়ার তো দুরের কথা, উল্টো ব্যস্ত থাকেন কিভাবে ৩৭ লাখ টাকার ইজারা আদায় করা যায়, সে চিন্তায়। এ যেন ঘাট পারাপার নয়, যেন যুদ্ধ জয়। কেননা, সীমিত বোটে ঘাট পারপারে যাত্রীদের অসীম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ঘাট পারাপারের সময় একটি বড় ব্যাগ বা যাত্রীরা মালামাল সঙ্গে নিলেই বাড়তি টাকা গুনতে হয়।

সল্টগোলা ঘাট এলাকার আব্দুল মন্নান নামের অপর যাত্রী বলেন, ডাঙ্গারচর-সল্টগোলা ঘাটে নৌকার মাঝিরা নৈরাজ্য চালাচ্ছে। এই নৈরাজ্যের প্রতিবাদ করলে অনেক সময় যাত্রীদের অপমান হতে হয়। নৌকায় ২০ জন যাত্রী নেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানছেন না। এতে চরম আশঙ্কার মধ্যদিয়ে পার হতে হয় অসহায় যাত্রীদের।

যাত্রীদের অভিযোগ, এসব কারণে ঘাটে নারী যাত্রীদের বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। শত শত ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সরকারি-বেসরকারি, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নিয়মিত এসব ভোগান্তির শিকার হলেও প্রতিকার মিলছে না। দিন দিন ঘাটে নৈরাজ্য চললেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার কোন দৃশ্য চোখে দেখা যায়নি। আর এতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাঝি ও ইজারাদারেরা।

সামগ্রিক বিষয় জানিয়ে জুলধা ডাঙ্গারচর এলাকার মোঃ জামাল হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও মোঃ আব্বাসসহ অন্যান্যারা চট্টগ্রাম সিটি মেয়র, জেলা প্রশাসক ও কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, এই ফেরিঘাট দিয়ে জুলধা-ডাঙ্গারচরের বন্দরের কর্মচারী, সিইপিজেডের শ্রমিক, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, সবজি ও দুধ বিক্রেতা, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ নানান শ্রেণিপেশার দৈনিক ১০ হাজারেরও অধিক যাত্রী পারাপার হন। কিন্তু শুধমাত্র দুটি ইঞ্জিন চালিত ছোট বোট দিয়ে ঘাট পার হওয়া খুবই বিরক্তিকর ও ঝূঁকির। একটা পুরাতন নৌকায় ৫০-৬০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে নদী পার হন মাঝিরা।

এসময় যাত্রীদের নেই কোন নিরাপত্তা লাইফ জ্যাকেট। এ কারণে কিছু দিন পর পর নৌকা ডুবিতে সলিল সমাধি ঘটে স্থানীয়দের। তথ্যমতে, বিগত ১৫ বছরের এই ঘাটেই পাঁচ দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ১০-১২ জনের অধিক মানুষ। এতে ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৭ সালে ঘাটেই প্রাণ হারিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম, মোঃ ইব্রাহিম, মনোয়ারা বেগম,আক্কাছ বেগম, জরিনা বেগম, জাহাঙ্গীর আলম, স্কুলছাত্রী জেসমিন আক্তার, মোঃ আকবর ও হানিফ সহ আরও কয়েকজন।

এ ব্যাপারে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘জুলধা ডাঙ্গারচর ও সল্টগোলা ঘাট ঘাটের ভাড়া বাড়া ও যাত্রী হয়রানি বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। যা তদন্ত করে যাত্রী হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কিছু অসাধু ইজারাদার অতিরিক্ত মুনাফা লাভের লোভে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে অতিরিক্ত মূল্যে ইজারা নিয়ে যাত্রী হয়রানি করে আসছেন। এমনকি আগামী ১৪২৯ বাংলা সনের প্রথম দিন থেকে আবারও ভাড়া বাড়ানোর জন্য পাঁয়তারা শুরু করেছেন। যদিও সিটি কর্পোরেশনের ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ১০ টাকার বেশি ভাড়া নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ঘাটে যেকোন সময় সংঘর্ষ হওয়ারও আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যদিও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যাত্রী সাধারণ ও মালামালের ধরণে হার বসিয়ে দিলেন-প্রত্যেক ব্যক্তি লাইফ বোটে ভাড়া ১০ টাকা, রিজার্ভ ভাড়া ২২০ টাকা, যাত্রীর ব্যক্তি গাড়ি ৪ টাকা, গরু ও মহিষ প্রতি ৪ টাকা, ভেড়া ছাগল ও অন্যান্য প্রাণী ১ টাকা, প্রতি মণ বোঝা মাত্র ৫০ পয়সা। কিন্তু জানা যায়, ইজারাদার আদায় করছেন তাদের ইচ্ছে মতো পাঁচশত টাকারও উপরে।

চসিক রাজস্ব অফিস সূত্রে জানা যায়, এবারে ঘাটটি ভ্যাটসহ ৩৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় ইজারা পেলেন ডাঙ্গারচর সল্টগোলা ঘাট যাত্রী পারাপার পাটনী শ্রমজীবি সমবায় সমিতি। যা গত বছর ছিল ভ্যাটসহ ৩৩ লাখ ৬০ হাজার। গতবারে ইজারাদার ওসমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের শর্ত ভঙ্গ করে কালো তালিকাভুক্ত হন। ফলে, এবারেও ওসমান সিন্ডিকেটের পক্ষে কৌশলে ইজারা নেন মাহবুব, বাবুল, সালা উদ্দিন ও ইসহাক।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার গ্রুপের অংশীদার মোঃ ইসহাক বলেন, ‘ঘাটটি নেওয়ার পর আমি জেনেছি। ইজারাদারেরা আমার নাম ব্যবহার করেছেন। আসলেও আমি কিছুই জানিনা। ঘাট নিয়ে যে যাত্রী হয়রানি করবে তা তো ঠিক না। দরকার ঘাটের পরিবেশ আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা। যা ইজারাদার পারবে না। পারবে সিটি কর্পোরেশন।’ আপনারা কেন যাত্রীদের হয়রানি করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসবের সাথে আমি জড়িত নাই। যারা ঘাট পরিচালনা করে তারা বলতে পারবেন।’

নিয়মতি যাত্রী জুবায়ের আহমেদ বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ঘাট পারাপারের অপেক্ষা করা বড় ভোগান্তি। এ ঘাটে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা বোটের সংখ্যা বাড়ানো হলে কিছুটা হলেও ভোগান্তি কমতো।’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ জানান, ‘ঘাটে অনিয়ম হচ্ছে এমন কথা জানিয়ে মেয়র বরাবর একটি অভিযোগে দিয়েছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) মুখপাত্র ডিজিএম গোপাল চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘নৌযান কম থাকায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিষয়টি ইজারাদার সমাধান করতে পারেন। যাতে যাত্রী ভোগান্তি কমে। অধিক যাত্রী নেওয়া মানেই ঝূঁকি। এ বিষয়ে মাঝিদের সাবধান থাকতে হবে।’

(জেজে/এসপি/মার্চ ২২, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

১৪ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test