E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

লিজ মানির আশায় নীরব উপজেলা প্রশাসন 

মইজ্জ্যারটেক গরুর বাজার মহাসড়কের ‘বিষফোড়া’

২০২২ মার্চ ২৬ ১৭:০৩:৫৫
মইজ্জ্যারটেক গরুর বাজার মহাসড়কের ‘বিষফোড়া’

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা মইজ্জ্যারটেক গরুর বাজারটি বছরের পর বছর প্রধান সড়কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের অভাবে মহাসড়কগুলো কার্যত মহাসড়ক হয়ে উঠতে পারছে না। উপজেলা প্রশাসনের বৈধ ইজারায় বিতর্কিত জায়গায় পশুরহাটটি মহাসড়কের ‘বিষফোড়ায়’ রূপ নিয়েছে। 

শহরের প্রবেশমুখের এই বাজারটিকে ঘিরে সড়কে পণ্য পরিবহণ, ত্রি-হুইলার, অটো সিএনজি, বাস-ট্রাক ও পথচারীদের গতি কমাচ্ছেন। যত্রতত্র মানুষের রাস্তা পারাপারে ঘটছে দুর্ঘটনা, মরছে মানুষও। শুধু তাই নয়, শুরুতেই অবৈধভাবে গড়ে ওঠা পশুরহাটটি প্রতিবছরে ইজারা দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল পটিয়া উপজেলা প্রশাসন। এতে মূখ্য ভূমিকায় ছিল উপজেলা পরিষদ। তবে, তৎকালিন পটিয়ার ইউএনও আবুল হাশেম কয়েকবার মইজ্জ্যারটেক পশুরহাটটি উচ্ছেদের চেষ্টা চালালেও সফল হননি।

যদিও কর্ণফুলী এখন স্বতন্ত্র উপজেলা। বিগত চার বছওে পটিয়ার মতো একই পথে হাঁটছে উপজেলা প্রশাসন। উচ্ছেদের কোন প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। যদিও জায়গাটি মূলত ব্যক্তিমালিকানাধীন ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় হলেও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন। বিশ^স্ত সূত্র বলছে, মইজ্জ্যারটেক গরুর বাজারের জায়গাটি একটি বেসরকারি ব্যাংকে নিলামে প্রক্রিয়াধীন।

যদিও অতীতে দেশের মহাসড়কসংলগ্ন বহু জায়গায় এসব গরুর বাজার উচ্ছেদ করা হলেও কিছুদিন পরই বিভিন্ন পক্ষের সমঝোতায় তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ কারণে মহাসড়কে সৃষ্ট যানজটে ১০ মিনিটের রাস্তা পার হতে পরিবহণগুলোর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে হাটের দিন একদিকে যেমন আর্থিক ভাবে ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে হচ্ছে সময়ের অপচয়।

মইজ্জ্যারটেকের ব্যবসায়ি মিরাজ হোসেন ও মিন্টু অভিযোগ করে বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের উচিত বাজারটি অতিসত্তর সরিয়ে দেওয়া। শিকলবাহা ক্রসিং থেকে আনোয়ারা অবধি ছয় লেইনের প্রশ্বস্ত সড়ক হচ্ছে। কিন্তু মইজ্জ্যারটেক সড়কের অবস্থা দিন দিন সরু। পশুরহাট বিষয়ে নিয়ম মানছে না উপজেলা পরিষদ। ফলে, ইজারাদারেরা ইচ্ছে মতন সড়কে হাট বসিয়েছেন। তাঁরা এলাকাবাসীর দুর্ভোগ নিয়ে কোনো চিন্তা করেনা।’

তথ্য সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার প্রশাসন বলে দিয়েছে যে স্থানীয় প্রশাসন যেন স্বনির্ভর হয়। তাদের আয় যেন তাঁরাই করতে পারে। তখনই প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদ লিজ মানি পাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশে এসব পশুরহাট বসলেও সেগুলোর ‘পেরিফেরি ডিক্লেয়ার’ করে দিচ্ছেন। ফলে, সহজেই একবার বসে গেলে হাট সরানোর কোন উদ্যোগ নেই তাঁদের।

স্থানীয় লোকজন জানায়, ‘দুর্ঘটনা ও নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিতে এসব গরুরবাজার মুলোৎপাটন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কেননা, উপজেলায় খাস জমির কোন অভাব নেই। চাইলে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে যেকোন প্রশ্বস্ত জায়গায় এসব পশুর বাজার বসানো যায়।’

পটিয়া হাইওয়ে পুলিশের ওসি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘মহাসড়কের অবৈধ হাটবাজার উচ্ছেদে আমরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে আছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। কিন্তু মইজ্জ্যারটেক গরুরবাজারটি সিএমপির অধীনে মনেহয়। যদিও মহাসড়ক আইন বাস্তবায়নেও সকলের বদ্ধপরিকর হওয়া উচিত।’

সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আরিফুর রহমান খাঁন বলেন, ‘মহাসড়কের ন্যাচার (বৈশিষ্ট্য) অনুযায়ী সেখানে হাটবাজার থাকার কোনো সুযোগ নেই। মহাসড়কের পাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতেও দোকানপাট শোভনীয় হয় না। সেটি পাবলিক ইন্টারেস্টের (জনস্বার্থ) কারণে। হাটবাজার হলেই তাকে ঘিরে মানুষের সমাগম হয়, নানা ধরনের সমস্যা হয়। সড়ক ও জনপথের জায়গায় হাটবাজার থাকলে আমরা উচ্ছেদ করি।’

তিনি আরো বলেন, আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের প্রান্তসীমা থেকে ১০ মিটারের মধ্যে নিজের জমি হলেও স্থাপনা করা যাবে না। এক্ষেত্রে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে থেকে অনুমতি নিয়ে করতে হবে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা গেলে এই মহাসড়কের অবস্থার অনেকটা উন্নতি হবে।’

দোহাজারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, মহাসড়ক আইনে স্পষ্ট বলা আছে ‘২০২১-এর ৯ ধারায় মহাসড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের ১১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘মহাসড়কের সংরক্ষণ রেখার মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাইবে না।’ ১২ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতীত, মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ, হাটবাজার বসানো বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মহাসড়কের কোনো অংশ ব্যবহার করা যাইবে না।’

এই আইনে মহাসড়কের সংজ্ঞায় এর প্রান্তসীমা বা ‘রাইট অব ওয়ে’কে মহাসড়কের ভূমি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইনের দুই ধারার ১৬ উপধারায় মহাসড়কের উভয় পাশের ভূমির প্রান্তসীমা থেকে ১০ মিটার অথবা সরকার কর্তৃক গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত রেখাকে ‘সংরক্ষণ রেখা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনে সংরক্ষণ রেখা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। অথচ এই আইনের তোয়াক্কা না করেই চলছে মইজ্জারটেক গরুর বাজারটি। কিছু ইজারাদার গোপনে সিন্ডিকেটের সাথে আতাঁত করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে বারবার সমালোচিত ইজারা বা লিজ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন। যা শুধুমাত্র নিজেদের পকেট ভারি করতে বলে জানিয়েছে উপজেলার একাধিক জনপ্রতিনিধি।
কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনা সুলতানা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী’র মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও এ বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আমাদের দেশে যেসব রাস্তাকে মহাসড়ক বলা হচ্ছে, সেগুলোকে ভালো রাস্তা বলা গেলেও মহাসড়ক বলার সুযোগ নেই। এর প্রধান কারণ মহাসড়কের গরুরবাজার। বাধাহীনভাবে গাড়ি চলার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় এসব পশুরহাট, যা মহাসড়কের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব হাটবাজারকে কেন্দ্র করে বছরভেদে ২৮ থেকে ৩৪ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এতে গাড়ি চলাচল ব্যাহত হয়ে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

(জেজে/এসপি/মার্চ ২৬, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

১৪ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test