E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভেজাল টিএসপি সার নিয়ে ধূম্রজাল, অধিকতর তদন্তে কমিটি

চট্টগ্রাম থেকে যশোর গুদামে যেতে মাঝপথেই কীভাবে ভেজাল যোগ!

২০২২ মার্চ ২৮ ১৬:২৮:৫২
চট্টগ্রাম থেকে যশোর গুদামে যেতে মাঝপথেই কীভাবে ভেজাল যোগ!

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট এর রিপোর্টে ভেজাল হিসেবে চিহ্নিত সার বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) যশোর বাফার গুদামের সামনে ১৩ দিন ধরে পড়ে রয়েছে। তদন্ত কমিটি, পরীক্ষাগারের রিপোর্ট ও টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড নিজেরাও বলছেন পাঁচটি ট্রাকে ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সারে ভেজাল পাওয়া গেছে। এমনকি জব্দকৃত সারের ১০টি নমুনা পরীক্ষা করে বিসিআইসি। তার মধ্যে ৯টি নমুনা সম্পূর্ণ ভেজাল এবং একটি নমুনা ‘ভালো নয়’ বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।

কিন্তু ঘটনার পিছনে কারা? কিভাবে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স থেকে নেওয়া সার যশোরে যেতেই মাঝপথেই ভেজাল হয়ে যায়? কোন উৎস থেকে ভেজাল উপাদান যোগ করা হয়েছে? ভেজাল সার যোগে কারা জড়িত পরিবহণকারী ঠিকাদার সংস্থা, না ট্রান্সপোর্টের ড্রাইভার? এ রহস্য উদঘাটনে টিএসপি কমপ্লেক্স কিংবা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন!

যদিও পরিবহণকারী ঠিকাদার মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আহসান হাবীব জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, যশোরে ভেজাল সার সন্দেহে আটক পাঁচটি ট্রাকের সার নকল নয়। সার নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ের কোনো কারণ নেই। প্রয়োজনে অধিকতর তদন্ত টিম গঠন করে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পরীক্ষাগারে টেস্ট করে নিশ্চিত হতে পাওে বিষয়টি। কারখানা যেভাবে সার দিয়েছে, সেভাবেই সার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’

এ ঘটনায় পরিবহন ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরাপত্তা জামানত টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২৭ মার্চ টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড এ চিঠিতে বলা হয়েছে, টিএসপিসিএল থেকে উত্তোলনকৃত ৫টি ট্রাকের ৭৩ মেঃ টন টিএসপি সার জরুরী ভিত্তিতে তিন দিনের মধ্যে যশোর বাফার গুদামে পৌঁছানোর। তাঁতেই টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁদের সার ছিল ভেজাল মুক্ত। পরিবহণকালেই নয়-ছয় করা হয়েছে। প্রকৃত সার গুদামে পাঠাতে বলা হয়েছে।

গত ৯ জানুয়ারি যশোর বাফার গুদামে সার পরিবহন করার জন্য চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের পরিবহন ঠিকাদার মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেয় টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড। এরপর থেকে সার পরিবহন করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এর আগে যেসব সার যশোরে পৌঁছানো হয়েছে তাঁতে কখনো ভেজাল পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী সময়ে যশোর জেলার জন্য বরাদ্দ ৭০ মেট্রিক টন টিএসপি সার ১৭ মার্চ পাঁচটি ট্রাকে করে যশোর বাফার গুদামে আনা হয়। সার পৌঁছানোর পর বাফার গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ইনচার্জ) আকতারুল ইসলামের সন্দেহ হওয়ায় তিনি সার খালাস না করে ট্রাকগুলো গুদামের বাইরে রাখার নির্দেশ দেন। পরদিন ১৮ মার্চ বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান। এরপর থেকে সারবোঝাই ট্রাকগুলো বাফার গুদামের আঙিনায় রয়েছে। অভিযোগ সারগুলো ভেজাল।

এ ঘটনায় টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের উপপ্রধান রসায়নবিদ রেজাউল হককে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন বিসিআইসির উৎপাদন বিভাগের ব্যবস্থাপক শফিকুল কবীর ও বিসিআইসির উপপ্রধান হিসাব রক্ষক নির্মল কুমার দত্ত।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা যশোরে এসে ১৯-২০ মার্চ তদন্ত করেন। কমিটি চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রাকের কাগজপত্র, ট্রাভেল এজেন্সির কাগজপত্র পরীক্ষা করে। কমিটি সারের ১০টি বস্তা থেকে সারের নমুনা সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক গবেষণাগার, যশোরের পরীক্ষাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠায়।

গত বৃহস্পতিবার ওই পরীক্ষার প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় বিসিআইসির এক জরুরি বৈঠক বসে। বৈঠকে পরিবহন ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা এবং তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। রোববার এক চিঠিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের সহকারি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) মো. আউয়াল হোসেন বলেন, ‘তদন্ত কমিটি ওই সারের ১০টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়েছে। পরীক্ষায় ৯টি নমুনায় সম্পূর্ণ ভেজালের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় অবশিষ্ট নমুনাটি ভালোর কাছাকাছি, কিন্তু সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত নয় বলে প্রমাণ মিলেছে।’

এ ঘটনায় পরিবহন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, গতকাল ৪৬৩ নম্বর স্মারকে চিঠি দিয়ে আমরা পরিবহণকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজকে জানিয়ে দিয়েছি তাঁরা কি করবেন। এমনকি কার্যাদেশের শর্ত ভঙ্গ করে থাকলে অবশ্যই প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিষয়টির অধিকতর তদন্তে বিসিআইসির লেবার অ্যান্ড স্টাফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. জয়নাল আবেদীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নতুন তদন্ত কমিটির প্রধান মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে যশোরে গিয়ে তদন্ত শুরু করা হবে।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান টিএসপির উপপ্রধান রসায়নবিদ রেজাউল ইসলাম জানিয়েছেন, ল্যাব পরীক্ষায় সার ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। টিএসপি কারখানার নিজস্ব ল্যাব ও যশোর মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ল্যাবে ওই টিএসপি সারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দুটি ল্যাবের পরীক্ষায় সার ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

(জেজে/এসপি/মার্চ ২৮, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

১৪ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test