E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

চট্টগ্রামবাসীর দুঃখ

১০০ কোটি টাকায় কী ভুলিয়ে দেবে জলাবদ্ধতা?

২০২২ এপ্রিল ০৯ ১৭:১২:৩৪
১০০ কোটি টাকায় কী ভুলিয়ে দেবে জলাবদ্ধতা?

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচ বছর আগে হাতে নেওয়া প্রকল্পের অগ্রগতি থেমে থাকায় এবারও স্পষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আসবে না। কারণ জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া প্রকল্পের কাজের অংশ হিসেবে নগরীর খালগুলোর মধ্যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া খালগুলো খনন না করায় এতে জন্মেছে আগাছা। আটকে গেছে পানি চলাচলের পথ। ফলে, জলাবদ্ধতায় রবে নগরবাসী।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক সিডিএর প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক। সিডিএর ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়। ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে খালের আবর্জনা অপসারণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রকল্পের কার্যক্রম। ইতিমধ্যে নগরের ৩৫টি খাল থেকে ৩ হাজার ১৭৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা।

২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ উদ্বোধনের সময় তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেছিলেন, ‘এ বছর না হলেও আগামী বছর দৃশ্যমান পরিবর্তন হবে।’ ওই বছর ১২ আগস্ট সিডিএতে অনুষ্ঠিত জলাবদ্ধতা প্রকল্পের তদারকি কমিটির সভায় তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। পরের বছর ২০১৯ সালের ২ মার্চ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামও বলেছিলেন, ‘আশা করে যাচ্ছে, আগের মতো জলাবদ্ধতা হবে না।’ কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে সহজেই মুক্তি পাচ্ছে না নগরের বাসিন্দারা।

এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে চলতি বছর জুন পর্যন্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, এখন আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হচ্ছে প্রকল্পের মেয়াদ। এভাবে দুই দফায় মেয়াদ বাড়তে চললেও প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৫০ শতাংশ। গত বছর পর্যন্ত যা ছিল ৪০ শতাংশ।

এখনো খালের মুখে জলকপাটের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। খালগুলোর পাশে ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরোধ দেয়ালের মধ্যে ৫৮ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ৪২টি সিলট্র্যাপের (পাহাড়ি বালু আটকানোর ফাঁদ) মধ্যে মাত্র ১৫টির কাজ শুরু হয়েছে। খালের দুই পাড়ে ৮৫ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত দেড় কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। তবে সম্পন্ন হয়েছে ৫৪টি ব্রিজ-কালভার্টের নির্মাণকাজ।

মূলত জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় সব কাজ শুরু করা যাচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণসহ ভৌত কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় টাকা বরাদ্দ দিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছর ৭৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু সিডিএ কাটছাঁট করে বরাদ্দ রেখেছে ৪২৭ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৩৯৯ কোটি টাকা।

চাক্তাই খালপাড়ের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘এই খাল নিয়ে কী যে কষ্টে আছি, তা বলার মতো নয়। এখন খাল যেভাবে আছে, তাতে এবারও ড্বুবে।’ নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, ‘গত বছর চট্টগ্রামে বৃষ্টি কম হয়েছিল। তাই জলাবদ্ধতাও কম ছিল। এবছর যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। কারণ, অনেকগুলো খালে বাঁধ দেওয়া আছে।’

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে। এ বছরও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। শেষ হতে আরও দুই বছর লাগবে। এখনো প্রকল্পের অধীন কিছু ভূমি অধিগ্রহণের কাজ বাকি।’

চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘খাল-নালা পরিষ্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তবে এসব খাল পরিষ্কার করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। চসিকের কাছে রাস্তাঘাট পরিষ্কারের জন্য প্রকল্প আছে। কিন্তু খালা নালা পরিষ্কারের জন্য কোনও অর্থ বরাদ্দ নেই। জলাবদ্ধতা প্রকল্প থেকে ১০০ কোটি টাকা চসিককে দেওয়া হলে চসিক খালের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। তা না হলে মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ পাওয়া সাপেক্ষে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে পারবো।’

প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহ আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২২টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে যা দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের পানি নদীতে গিয়ে পড়ে। আমাদের প্রকল্পাধীন ৭টি খালের কাজ শেষ। জুনে আরও ১১টি খালের কাজ শেষ হবে। এছাড়া আরও অনেক খালের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আমরা শেষ করতে পারছি না।’

সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান। এ বছর পুরোপুরি জলাবদ্ধতা নিরসন না হলেও আগামী বছর জলবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন করতে পারবো। তবে শুধু খাল খনন করলে হবে না, কর্ণফুলীতে যদি ড্রেজিং করা না হয়, তাহলে কোনোভাবেই প্রকল্পের সুফল মিলবে না।’

তিনি আরো বলেন, স্লুইস গেট নির্মাণের কিছু সামগ্রী নেদারল্যান্ড থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য আসতে সময় লাগছে। তাই সেগুলোর কাজ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের সহায়তায় পরিকল্পনা কমিশনের ন্যাশনাল রিজিলিয়ান্স প্রোগ্রাম (এনআরপি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় গত এক দশকে ২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

(জেজে/এসপি/এপ্রিল ০৯, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

১৩ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test