E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বুয়েটে সুযোগ পেলেন দিনমজুর বাবার সন্তান মাহি

২০২২ জুলাই ৩১ ১৫:৩৮:৪০
বুয়েটে সুযোগ পেলেন দিনমজুর বাবার সন্তান মাহি

শাহরিয়ার খান সাকিব, মৌলভীবাজার সদর : বাবা একজন কৃষি শ্রমিক। দিনমজুরের কাজ করে চলে অভাবের সংসার, বাবা অন্যের জমিতে ট্র্যাক্টর চালিয়ে পরিবারের হাল টিকিয়ে রাখেন। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান মাহফুজুর রহমান মাহি।

একসময় মাহির এই সফলতার গল্প বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা সাফিয়া বেগম ও বাবা শামীম আহমদ।

ছোটবেলা থেকেই মা-বাবাকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে দেখে বড় হয়েছেন। কাজ করা ছাড়াও তাদের কোনো উপায়ও ছিল না। দিনমজুর বাবা-মায়ের সন্তান মাহফুজুর রহমান মাহি ৬হাজার জনের মধ্যে ৪৪৩তম স্থান অর্জন করে সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) -এ পড়াশোনা করার।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর তার গ্রামের বাড়িতে বইছে আনন্দের জোয়ার। মাহি তারা দুই ভাই ও এক বোন সে সবার বড়। মাহি জগন্নাথপুর প্রাথমিক ও মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। পরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এবার বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন।

বাবা-মায়ের মত মাহিও ছিল পরিশ্রমী। কিন্তু মাহি পড়ালেখায় বেশি মনযোগী হওয়ায় বাবা-মা তাকে কোনো কাজ করতে দেয়নি। প্রতিদিন পরিশ্রম করে সংসারের চাহিদা পূরণ করতেন মাহির বাবা-মা।

মাহির মা সাফিয়া বেগম বলেন, আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে মাহি। তাকে আমি অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি। এখন তিনবেলা খেতে পারছি। একটা সময় ছিল তিনবেলা খেতে পারতাম না। আমার স্বামী অন্যের জমিতে ট্র্যাক্টর চালিয়ে হাল চাষ দিনমজুরির কাজ করে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করি। ছেলেকে ঠিকমতো পড়াশোনার খরচ দিতে পারিনি। আজ সে বুয়েটে চান্স পেয়েছে, আমার কষ্ট স্বার্থক হয়েছে। আমি গর্বিত যে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি এতো খুশী, আমার আনন্দের শেষ নেই।

এদিকে কান্না জড়িত কন্ঠে মাহির বাবা শামীম আহমদ বলেন, আমি গর্বিত আমার ছেলে বুয়েটে চান্স পেয়েছে। আমার মতো দিনমজুরের ছেলে বুয়েটে চান্স পেয়েছে আমার আনন্দের কোন শেষ নেই। কিন্ত আমি রাত পোহালেই হয় ধান কাটি, মানুষের বাড়িতে কাজ করি আর তা না হলে গাছ কাটতে যাই। কিন্তু গ্রামের অনেক মানুষ আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু আজকে আমি নিজেই ধন্য দেই আমার ছেলে এই জগ্ননাথপুরের মাঝে বুয়েটে চান্স পেয়েছে।

অভাবের সংসারে পড়ালেখা করে বড় স্বপ্ন দেখা ছিল মাহির জন্য অনেক কঠিন। প্রকাশ করতে না পারলেও মনে মনে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলেন তিনি। এ স্বপ্ন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ- ৫ পাওয়ার পর। এরকম ফলাফল তাকে পড়াশোনার প্রতি আরও উৎসাহী করে তোলে।

গল্পটা সাফল্যে মুড়িয়ে রেখেছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের এই কৃতি সন্তান। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া মাহি এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

হার না মানা অদম্য এই শিক্ষার্থী এবার ভর্তির সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এদিকে মাহিকে সবধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা রহমান বলেন, মাহফুজুর রহমান মাহি মৌলভীবাজার সদর উপজেলা থেকে বুয়েটে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চান্স পেয়েছে। আমি এটা যেদিন জানতে পেরেছি, জানার পরপর তার বাসায় যাই। তার বাসায় গিয়ে একটা জিনিস খুবই ভালো লেগেছে যে একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে সে অনেক কষ্ট করে বাবা-মায়ের অনেক কষ্টের বিনিময়ে সে নিজে চেষ্টা করে এতো দূর এসেছে। আপনারা জানেন আমিও বুয়েটের স্টুডেন্ট সেক্ষেত্রে আলাদা ভালা লাগা কাজ করছে যে, আমারই বিদ্যাপীঠে সে যাচ্ছে। আমি আসলেই খুবই আনন্দিত হয়েছি তার ভেতরে আমার মনে হয় পড়াশোনাই নয় ছোটবেলা থেকেই কবিতা আবৃত্তি এবং এক্সট্রা কারিকুলাম যেগুলো আছে সেগুলোতেও একদম নিজেকে ঠিক রেখেছে, সেক্ষেত্রে তার পদচারণা ছিল বিভিন্ন সার্টিফিকেট দেখেছি।

তিনি আরও বলেন, মৌলভীবাজার জেলার প্রত্যেকটা বাচ্চা তাকে দেখে অনুসরণ করা উচিত। এখানে শিক্ষার হার কম ছেলে-মেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহও কম। কারণ সবাই বিদেশে চলে যেতে চায়। পড়াশোনা শেষ না করেই বিদেশে যেতে চায়। এই বিষয়গুলো আসলে আমাকে নাড়া দেয় যে এই বাচ্চাগুলো যেগুলো তাকে দেখে শিখবে। এবং সেভাবেই তার পাশে আমরা আছি। এবং আমাদের উপজেলা প্রশাসন তার পাশে আছে। যেকোনো ক্ষেত্রে আমি তাকে সহযোগিতা করবো।

বড় হয়ে দেশের সেবা করতে চান মাহি। এদিকে মাহির সাফল্যের গল্প এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মাহি বলেন, মা-বাবা আরও বেশি পরিশ্রম করেছেন। শিক্ষকরাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।

মাহির প্রতিবেশি ও সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, মাহি এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছে। আশা করি সে পড়ালেখা করে একজন ভালো ও দক্ষ আদর্শ মানুষ হবে। পরিবারসহ এলাকার এবং দেশের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেবে।

(এস/এসপি/জুলাই ৩১, ২০২২)

পাঠকের মতামত:

০১ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test