E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ফরিদপুরের চরে প্রথম আলো ট্রাস্টের কম্বল বিতরণ

‘আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে’

২০২৬ জানুয়ারি ০৭ ১৯:০৯:৪৩
‘আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে’

দিলীপ চন্দ, ফরিদপুর : “নদী ভাঙনের শিকার হইছি কয়েকবার। শীত নামলে আমাগেরে জীবন থাইমা যায়। রাইতে ঘুম অয় না, গাও ঠান্ডায় শক্ত হইয়া যায়। ঘরে আলো নাই, পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়া বাতাস ঢুইকে পড়ে। পুরান কাপড় দিয়া কত আর ঢাকমু? আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে।”

প্রথম আলো ট্রাস্টের দেওয়া কম্বল হাতে পেয়ে আবেগভরা কণ্ঠে এসব কথা বলেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাহেলা বিবি (৮৭)।

শুধু রাহেলা বিবিই নন—প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে বুধবার (আজ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা নদী দ্বারা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ২৩৫ জন হতদরিদ্র শিশু, নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধের হাতে কম্বল তুলে দেন প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা।

কম্বল পেয়ে কুদ্দুস মোল্লারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মুনছুরা খাতুন (৮৩) বলেন, “আমি তো এহন ঠিকমতো দাঁড়াইতেও পারি না। শীত আইলে হাঁটু ব্যাথা করে, বুক ধইরা আসে। আগুন জ্বালাইয়া গা সেঁকি, তাও ঠান্ডা যায় না। আজ কম্বলটা পাইয়া আল্লাহরে ডাক দিছি। যারা আইসা দিছে, আল্লাহ যেন তাদের সুস্থ রাখে।”

শিকদারকান্দি গ্রামের হালিমা বেগম (৫৪) বলেন, “এই চরে থাকলে অনেকেই মানুষরে মানুষ মনে করে না। আপনারা আগে আমাগো খোঁজ নিছেন, পরে ঠিক মতো কম্বল দিছেন। এই উপকার কোনোদিন ভুইলবো না।”

দর্জিকান্দি গ্রামের আমেনা বিবি (৮৯) বলেন, “শীত আইলে বুকডা ফাডে, রাইতে ঘুম অয় না। আইজ এই কম্বল পাইয়া চোখে পানি আইছে। মনে হইছে আমরা এখনো মইরা যাই নাই—কেউ আমাগো কথা ভাবে।”

খলিফাকান্দি গ্রামের মতলেব শেখ (৮১) বলেন, “শীত আইলে বুড়া শরীর একদম নরম অইয়া যায়। এই কম্বলডা অনেক কামে লাগবো।”

সরকারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা সোহেল ফরাজী (৪২) বলেন, “শীতে বাচ্চাগোর কষ্ট দেইখা বুক ফাইটে যায়। আজ কম্বল পাইয়া মনে হইতেছে এই শীতে অন্তত একটু শান্তি পাইমু। ফরিদপুর থেইকা আইসা আমাদের পাশে দাঁড়াইছেন—এইটা কোনোদিন ভুইলমু না।”

উল্লেখ্য, নুরুদ্দিন সরদারেরকান্দি, কুদ্দুস মোল্লারকান্দি, শিকদারকান্দি, দর্জিকান্দি, খলিফাকান্দি ও সরকারকান্দিসহ ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি, দাফাকান্দি, মাদবরকান্দি, নন্দলালপুর, আদু মোল্লার ডাঙ্গীসহ মোট ১৪টি গ্রামের বাসিন্দাদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়।

ভোরে ফরিদপুর শহর থেকে লেগুনায় করে কম্বল নিয়ে সদরপুরের শয়তানখালী ঘাটে পৌঁছান প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা। সেখান থেকে ট্রলারে করে পদ্মা নদী পার হয়ে নন্দলালপুর খেয়াঘাটে এসে কম্বল বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নটি পদ্মা নদী দ্বারা সম্পূর্ণভাবে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। নৌকা বা ট্রলার ছাড়া এখান থেকে যাতায়াতের কোনো বিকল্প নেই। প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মানুষের বসবাস এই দুর্গম চরাঞ্চলে।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “আমার ইউনিয়নটি ফরিদপুর জেলার অন্যতম দুর্গম এলাকা। সরকারি বরাদ্দের কম্বল দিয়ে এখানকার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। প্রথম আলো ট্রাস্ট এই ইউনিয়নকে বেছে নেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানাই। সবচেয়ে বড় কথা—এই কম্বলগুলো প্রকৃত অভাবী মানুষই পেয়েছে। এত দূরবর্তী চরাঞ্চলে সাধারণত কেউ কম্বল বিতরণ করতে আসে না।”

মানবিক উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম আলো ট্রাস্ট ও বন্ধুসভার এই কার্যক্রম চরবাসীর মাঝে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে।

(আরআর/এসপি/জানুয়ারি ০৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test