E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ফরিদপুরে সরকারি রাস্তার পাশে থাকা ১৯টি গাছ কেটে বিক্রি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২১ ২৩:৪৫:১০
ফরিদপুরে সরকারি রাস্তার পাশে থাকা ১৯টি গাছ কেটে বিক্রি

রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : প্রশাসনের চোখ 'ফাঁকি' দিয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলায় একটি সরকারি রাস্তার পাশে থাকা ১৯টি ফলজ ও বনজ গাছ ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।  যার মধ্যে রয়েছে মুকুল সহ কিছু কাঁঠাল গাছ এবং ছোট, মাঝারি সাইজের রেন্ডিগাছ ও একটি তাল গাছ রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে সদর উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের উত্তর বাহিরদিয়া গ্রামের তিনরাস্তার মোড়ে এ গাছকাটার ঘটনা ঘটে।

জেলা সরদের চাঁদপুর ইউনিয়নে গাছ কাটার পর এলাকাবাসির মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর বাহিরদিয়া গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে ঢালু খাদের পাড়ের রাস্তাটি ভাঙার হাত থেকে রক্ষা করা গাছগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র কয়েকটি সজনে গাছ ছাড়া বাকি গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। এর পরিবর্তে লাগানো হয়নি কোনো গাছও।

এ প্রতিবেদক ঘটনাস্থল থেকে ফরিদপুর সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) মো. শফিকুল ইসলামকে কাছ কাটার ছবি সহ যাবতীয় তথ্য দিয়ে তাৎক্ষণিক অবগত করেন। পরে উপস্থিত জনসাধারণের সহযোগিতায় চাঁদপুর ইউনিয়নের স্থানীয় মেম্বার (৪নং ওয়ার্ড) মো. মুরাদ হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি ঘটনাস্থলে এসে দৈনিক বাংলা ৭১কে জানান, সরকারি রাস্তার এ গাছগুলো কেটে ফেলার ঘটনা আপনার থেকে জানলাম এবং ঘটনাস্থলে থেকে দেখলাম।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুরাদ মেম্বার জানান, 'আপনি ভুমি অফিসকে জানান তারা আমাকে ফোন দিলে আমি সরকারি সম্পদ রক্ষায় আমার যতোটুকু সহযোগিতা দরকার তাদের করবো। ততোক্ষণে ঘটনাস্থলে কর্তনকৃত ১৯টি গাছের অধিকাংশ নিয়ে গিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তথাপিও কিছু গাছের ডালপালা বা লাকড়ি জাতীয় কাঠের একটি স্তুপ ও কয়েকটি গাছের অল্পকিছু সাইজ করা কাঠ রাস্তায় পড়েছিলো। এর আগে স্থানীয় কোতয়ালি থানার সহকারি উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. আলী হাসান ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে দুর্বৃত্তরা ওইগুলো ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলো।

ফরিদপুর সদর উপজেলা এসিল্যান্ডকে অবগত করে ঘটনাস্থলের অদূরে অবস্থিত চাঁদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে ওই অফিসের অফিস প্রধান, ইউনিয়ন উপ-সহকারি ভুমি কর্মকতা মো. শাহজাহানকে বিষয়টি অবগত করার পর তিনি প্রথমে না শোনার ভান করেন। তাকে ছবি দেখিয়ে এসিল্যান্ড সাহেবকে অবগত করেছি জানালেও তিনি এ প্রতিবেদকের প্রশ্নে মেজাজ হারিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলে উঠেন, 'আপনি আপনার কথা শুনতে বাধ্য নই, আমাকে কেউ কমপ্লেইন করে নাই। কমপ্লেইন করলে আমি এসিল্যান্ড স্যারকে জানাবো, তিনি যা বলেন শুনবো। এরপর তাকে সুন্দর করে বুঝানো হয় যে, আপনি প্রজাতন্ত্রের চাকরি করেন, আমিও জনস্বার্থ রক্ষায় দেশের জন্য কাজ করি। আমি জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে শুধুমাত্র তথ্য দিয়ে হেল্প করতে পারি মাত্র, বাকি কাজটা আপনাদের।' পরে তিনি তৎপর হয়ে স্থানীয় মুরাদ মেম্বারকে ফোন করেন এবং বলেন, যে কাঠগুলো অবশিষ্ট রয়েছে আপনার জিম্মায় রাখেন, আমি ম্যাপ নিয়ে আসতেছি যদি সরকারি গাছ হয় তবে জব্দ করবো, না হলে য়ার গাছ তাকে দিয়ে দিবো'।

বৃহস্পতিবার বিকেলে ফরিদপুরের এসিল্যান্ড মো. শফিকুল ইসলামের নিকট এবিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তিনি জানান, আপনার থেকে তথ্য পেয়ে আমি চাঁদপুর ইউনিয়নের উপসহকারি ভুমি কর্মকর্তা শাহজাহান সাহেবকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। তার তথ্য মতে কয়েকটি গাছ মালিকানা জমিতে ও কিছুগাছ সরকারি রাস্তায় পড়েছে। গাছগুলো যে বিক্রি করেছে তার জমির পাশেই রাস্তাটি। তবে, কেটে সাইজ করে রাখা কিছু কাঠ ও কিছু লাকড়ি স্থানীয় মেম্বারের জিম্মায় রেখে দেওয়া হয়েছে।'

আজ শনিবার বিকেলে চাঁদপুর ইউনিয়ন উপসহকারি ভুমি কর্মকতা মো. শাহজাহানকে ফোন করা হলে তিনি জানান, কেটে ফেলা গাছগুলোর মধ্যে খাদের ভিতরের তালগাছটিসহ কয়েকটি গাছ মালিকানা জমিতে পরেছে। বাকী গাছগুলো সরকারি রাস্তার গাছ। কর্তনকৃত গাছগুলোর অবশিষ্ট গাছ ও লাকড়ি মুরাদ মেম্বারের জিম্মায় রেখে আশা হয়েছে। আমার উপরস্থ কর্মকর্তার সাথে পরমর্শ করে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়রা জানান, চাঁদপুর ইউনিয়নের স্থানীয় উত্তর বাহির দিয়া এলাকার বাসিন্দা, ৪নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার ও স্থানীয় রিয়াজুদ্দিন শেখের পুত্র নান্নু শেখ (নান্নু মেম্বার) ও গ্রামের শহীদ মৃধার ছেলে রবিউল মৃধার নিকট ওই কেটে ফেলা গাছগুলো বিক্রি করেন। পরে নান্নু মেম্বার সাথে থেকে রবিউলকে গাছগুলো কাটতে সহযোগিতা করেন। নান্নু মেম্বার এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকাবাসী বাধা দিয়েও গাছগুলো কাটা থেকে তাদের বিরত রাখতে পারেন নাই। পরে তারা বাধ্য হয়ে কোতয়ালি থানা পুলিশ ও সাংবাদিকদের অবহিত করেন। গাছ বিক্রেতা নান্নু মেম্বারের দাবি রাস্তার পাশের যায়গা তার তাই গাছগুলোও তার। রবিউল শেখ মনে করেন, তিনি টাকা দিয়ে কিনেছেন তাই কেটে ফেলেছেন। সরকারি গাছ কিনা সেটা যাচাই করেন না তিনি। তিনি নাকি হাইওয়ের একটা দুইটা করে গাছও নিয়মিত কিনেন এবং রাতের আধারে কেটে নিয়ে আসেন।

তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, 'আপনি বেচলে আমি কিনে কেটে নিয়ে আসবো, আমার সমস্যা হয় না, হবেও না'। সম্পূরক প্রশ্নে রবিউল শেখকে জিজ্ঞেস করা হয়, 'তাহলে ফরিদপুর মাগুরা মহাসড়কের পাশে যেসব গাছ রাতের বেলায় চুরি হয়, সেগুলো আপনি কিনেন? তিনি রাখঢাখ না রেখে বলেই ফেলেন, হা কিনি এবং কিনবো, আমরা সব ম্যানেজ করেই কিনি'। পরে তর্ক থামিয়ে তার সাথে তাল মিলিয়ে জানতে চাওয়া হয়, কারা বেঁচে? আর আপনার অবৈধ পন্থায় গাছ কিনে লাভ কি? রবিউল জানান, কারা বিক্রি করেন তা না জানালেও তিনি বলেন, এগুলোতেই লাভ ভাই। প্রায় অর্ধেক দামে কেনা যায়।'

এদিকে, ভাঙার হাত থেকে পিচঢালা ওই রাস্তাটিকে টিকিয়ে রাখা সরকারি গাছগুলো কেটে ফেলায় আগামি বর্ষায় রাস্তাটি ভেঙে যেতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করছেন গ্রামবাসী।

এছাড়া, রাস্তা থেকে সরকারি ওইগাছগুলো নান্নু শেখের জমির পাশে নয় বরং তার স্বামীর ক্রয়কৃত জমির পাশে বলে জানিয়েছেন সৌদি প্রবাসি আবুল শেখের স্ত্রী হালিমা বেগম। তার দাবি, যে জমির মালিক দাবি করে নান্নু শেখ গায়ের জোর খাটিয়ে রাস্তার গাছগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন, ওই জমিটুকু তার প্রবাসী স্বামী নান্নু শেখের দুই বউয়ের মধ্যে যে বউকে লিখে দিয়েছিলেন সেই বউয়ের থেকে ক্রয় করেছেন। তাই, গাছগুলোর মালিক সরকার অথবা তার স্বানীর বলে দাবি গৃহবধু হালিমা বেগমের।

এছাড়া, রাস্তার গাছগুলোর বেশিরভাগ সরকারি গাছ এটি নিশ্চিত করলেও গাছগুলো বন বিভাগের কিনা সেটি নিশ্চিত হতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে স্থানীয় সদর উপজেলা বন বিভাগের বলে জানিয়েছেন উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. জাহিদ হাসান। গাছগুলো বন বিভাগের বনায়ন প্রকল্পের হলে এ ঘটনায় বনসংরক্ষণ আইনে মামলা করা হবে বলেও জানান বন কর্মকর্তা জাহিদ।

(আরআর/এএস/ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬)













পাঠকের মতামত:

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test